দেশে জঙ্গিবাদ উত্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর আপসকামিতা দায়ী। সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আলোচনা সভা

20

rashidগতকাল শনিবার রাজধানীতে ‘জঙ্গিবাদের হুমকি :বাংলাদেশ ভাবনা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা বাংলাদেশে জঙ্গিদের উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘আপসকামিতাকে’ দায়ী করে বলেছেন, পৃথিবীতে কোনো ধর্ম জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না। তাহলে কিভাবে জঙ্গিবাদের সঙ্গে ধর্ম আসে, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

বক্তারা জঙ্গিদের দমনের পাশাপাশি জঙ্গিবাদ নির্মূলে সব ক্ষেত্রে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সামপ্রতিক অভিযোগগুলো ধরে বক্তারা বলেন, এতে সমস্যার সমাধান হবে না। আইনের শাসন মেনে জঙ্গিবাদ নির্মূলে উদ্যোগী হতে হবে।

শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। সমপ্রতি আল কায়েদা প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরির এক কথিত অডিও টেপে বাংলাদেশ নিয়ে বক্তব্য দানের প্রেক্ষাপটে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সরোয়ার আলী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক সেনাপ্রধান কেএম সফিউল্লাহ, আইন-সালিশ কেন্দ্রের প্রধান সুলতানা কামাল ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ।

আলোচনায় আরো অংশ নেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক এলাহী চৌধুরী, সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার, খুশি কবির, সাদেকা হালিম, রোকেয়া কবীর, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, এডভোকেট জেয়াদ আল মালুম, ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান, মাওলানা ফরিদউদ্দীন মাসউদ প্রমুখ। ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর সভা সঞ্চালনা করেন।

সভার শুরুতে নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ জানান, বাংলাদেশে ৪০টির মতো জঙ্গি সংগঠন সক্রিয়। জঙ্গিবাদের কারণে এই পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ২২ হাজার ৭শ’ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত কয়েক বছরে হিন্দুদের ৩০০টি মন্দির, ৫০০টি বাড়ি এবং ২০০ দোকান ভাংচুর করা হয়েছে বলে তিনি তুলে ধরেন।

বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, পৃথিবীতে কোনো ধর্ম জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না। তাহলে কিভাবে জঙ্গিবাদের সঙ্গে ধর্ম আসে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বাস্তবতা স্বীকার করে তা সমাধানে নিজেদেরই পথ খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা নয়, আইনের শাসন মেনে জঙ্গিবাদ নির্মূলে উদ্যোগী হতে হবে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, জঙ্গিবাদের উত্থানের কারণে বাংলাদেশের মানবাধিকার হুমকির মধ্যে রয়েছে। তাই জঙ্গিবাদকে নির্মূল করাই এখন দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক সেনাপ্রধান কেএম সফিউল্লাহ বলেন, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানো হয়।

জামায়াতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত আলাদা কিছু নয়। এটি অনুধাবন করতে হবে। তিনি জাওয়াহিরির হুমকিতে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে। জঙ্গি উত্থানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আপসকামিতাকে দায়ী করে সুলতানা কামাল বলেন, ৭৫ পরবর্তী সময়ে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে জঙ্গিবাদী শক্তির সঙ্গে আপস করেছে।

ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, জঙ্গিবাদের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে না জানলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ব্যাপ্তির ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানা যাবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী থাকলে ‘জঙ্গিবাদের চাষ’ হবে। এই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ জঙ্গিবাদ নির্মূলে সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধীদের সরকারি চাকরিতে ঢোকা বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই ডেপুটি গভর্নর বলেন, বর্তমানে প্রশাসনের যে দুরবস্থা তা থেকে জঙ্গি দমন তো দূরের কথা, সুশাসন নিশ্চিত করাও কঠিন। তিনি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে আরো দক্ষ করার জন্য সরকারের প্রতি পরামর্শ দেন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সরোয়ার আলী বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে ধ্বংস করে দিতে এখন ইসলামের উগ্রবাদী ব্যাখ্যা তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি এ থেকে উত্তরণে শুধু সরকারের দিকে চেয়ে না থেকে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে তা মোকাবেলার আহ্বান জানান ।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ দেশের দুই থেকে তিন শতাংশের বেশি মানুষ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন করে না। তবে ক্ষমতার রাজনীতির সুযোগ নিয়ে তাদের উত্থান হচ্ছে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে যে বিজয় অর্জিত হয়েছে, তা ধ্বংস করে দিতে যুদ্ধে পরাজিতরা বসে নেই। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পারবে না উল্লেখ করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মান্না সুশাসন নিশ্চিতের ওপর জোর দেন। সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন জঙ্গিবাদকে জাতীয় সমস্যা অভিহিত করে তা নির্মূলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here