দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খালেদা জিয়ার পূর্ণ বিবৃতি

14

আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতির হুবহু পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলো-

52a9ba5565535-khaledeদেশ-জাতি আজ সর্বগ্রাসী এক গভীর সংকটে নিপতিত। সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠন, সংবাদ মাধ্যম, সিভিল সমাজ, সচেতন ও গণতন্ত্রপ্রিয় দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত দীর্ঘদিন এমন আশঙ্কাই ব্যক্ত করে আসছিল। আমরা সকলেই এই সংকটের একটা শান্তিপূর্ণ ফয়সালার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু সরকার বরাবর সেই আহ্বানকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ভাষায় তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা আলোচনা ও যুক্তির পথ বেছে নিতে রাজি হয়নি। শানি্ত ও সমঝোতাকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেনি। বরং তারা কথা বলেছে অসে্ত্রর ভাষায়। তারা রাষ্ট্রীয় ও পেশী শক্তির মাধম্যেই সকল ভিন্নমত দমিয়ে দিতে ও প্রাধান্য বিস্তার করতে চেয়েছে।

‘দেশবাসী জানেন, বিরোধী দল হিসেবে আমরা ধৈর্য, সংযম ও সহষ্ঞিুতা বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আমাদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য আমরা যা কিছু সম্ভব তার সবই করেছি এবং সকল ফোরামেই গিয়েছি। দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আমাদের বক্তব্য ও দাবির প্রতি সমর্থন, একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় সরকার জনমতকে গ্রাহ্য করেনি। তারা আমাদের শানি্তর আহ্বানকে দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছে। তারা রাজপথে আমাদেরকে সংঘাতের প্রতিযোগিতায় আহ্বান জানিয়েছে এবং নির্মুলের হুমকি দিয়েছে।

‘বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা, ঔদার্য, সহনশীলতা, সংযম, সমঝোতা ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে বিরাজমান সংকট নিরসনের আহ্বান জানাবার পরেও সরকার তার জবাব দিয়েছে দমন-পীড়ন ও বলপ্রয়োগের নিষ্ঠুর পথে। ক্ষমতাসীনদের এই অনড় মনোভাব, এই ফ্যাসিবাদি আচরণ, এই নির্মম দমননীতি এবং জনগণের সমর্থনও অনুমোদন ছাড়াই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার উদগ্র আকাঙ্খাই আজ দেশকে এক চরম নৈরাজ্যকর ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করেছে। সরকারের চরম হঠকারিতার কারণেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতেও ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে গেছে।

‘আমি এ প্রসঙ্গে অভিনন্দন জানাই জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনকে। তিনি বাংলাদেশের বিরাজমান সংকট নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে আছেন। তিনি সর্বশেষে তৃতীয় দফায় তাঁর বিশেষ দূত হিসেবে রাজনীতি বিষয়ে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে পাঠিয়েছেন। আমি যুক্তরাষ্ট্র সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, গণচীন ও জাপান সরকারসহ বিভিন্ন বন্ধু দেশের সরকারকে ধন্যবাদ জানাই, তারাও এ সংকট নিরসনে সমঝোতার আহ্বান অব্যাহত রেখেছেন। প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশ ভারতের সরকার ও জনগণের প্রতিও আমার আহ্বান, তারাও যেন বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যক জনগণের অনুভূতি, দাবি ও মনোভাবের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের অবস্থানের সঙ্গে একাত্ম থাকেন।

‘বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্রের নাম-নিশানা মুছে দিয়ে চরম স্বৈরাচারী এক ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন জগদ্দল পাথরের মতো জাতির ওপর চেপে বসেছে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার স্বপ্ন বিলীন হয়ে গেছে। এর ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আজ উত্থাপিত হচ্ছে গুরুতর প্রশ্ন। সংবাদ মাধ্যম আজ শৃঙ্খলিত। সংবাদ, টকশো, মতামত নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বেআইনীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল। চলছে সরকারের পক্ষে প্রায় একতরফা প্রচারণা। বিরোধী দল ও জনগণের শানি্তপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের এবং প্রতিবাদ জানাবার সকল সুযোগ ও পথ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বিএনপিসহ প্রায় সকল বিরোধী দলের সদর দফতর এবং কার্যালয়গুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। মিথ্যা অভিযোগে বিরোধী দলের সিনিয়র নেতাদের আটক করে রাখা হয়েছে। সারাদেশে নেতাকর্মীদের ওপর চলছে হত্যা, গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়ন। সরকার নিজেই সারাদেশে এক চরম অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

‘প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আজ দলীয় ক্যাডারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। জনজীবনের শানি্ত ও স্বস্তি নিশ্চিত করার বদলে বিরোধী দল ও জনগণের প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও আন্দোলন দমনেই তাদেরকে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রাখা হয়েছে।

‘দেশের শিল্প-বাণিজ্য-অর্থনীতি আজ স্থবির। সুপরিকল্পিত চক্রান্ত ও নাশকতায় বিকাশমান তৈরি পোশাক খাত আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। সরকারের একগুঁয়েমি এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার উদগ্র বাসনার কারণেই আজ সর্বক্ষেত্রে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

‘বিরোধী দলের নিয়মতানি্ত্রক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করা হলেও সরকারি দলের সশস্ত্র ক্যাডাররা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় রাজপথে প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে বেড়াচ্ছে। কাজেই দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ, পৈশাচিক হত্যা, নাশকতা ও অন্তর্ঘাতের যেসব মর্মানি্তক ঘটনা ঘটছে, তার দায় পুরেপুরি সরকারকেই নিতে হবে। আমরা বারবার বলেছি, আজ আবারো বলছি, আমাদের আন্দোলন ও কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক। নিরপরাধ কোনো সাধারণ নাগরিক কোনোক্রমেই যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে আমাদের প্রতটি নেতা-কর্মীকে সবসময় সচেতন থাকতে হবে। জনগণই আমাদের শক্তির উত্স। তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে হবে।

‘বাংলাদেশের মানুষ কত বিপুলভাবে আমাদের সমর্থনে রয়েছে, তা আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এখনো শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিলে ও নিষ্ঠুর নির্যাতন বন্ধ করলে মানুষের যে ঢল রাজপথে নামবে তা সৃষ্টি করবে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। সরকার তা জানে এবং তারা একথাও জানে যে, সকল দলের অংশগ্রহণে একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে দেশবাসী তাদেরকে কিভাবে প্রত্যাখ্যান করবে। সে কারণেই তারা সমঝোতার পথ এড়িয়ে সংঘাত ও বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। সকল দলকে বাইরে রেখে একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক নির্বাচনী প্রহসনের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে তারা। মহাজোটের শরীক এরশাদের জাতীয় পার্টিও এই তথাকথিত নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ইতোমধ্যেই সরে দাঁড়ানোর ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি আজ এক হাস্যকর প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

‘নির্বাচন মানেই হচ্ছে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা। যে নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সেটা কোনো নির্বাচন নয়। অথচ সংবিধানের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর দোহাই দিয়ে সরকার সেই প্রহসনের মাধ্যমেই তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে চাইছে। আর এর প্রতিবাদে সারাদেশে মানুষ আন্দোলন করছে। তাদেরকে নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে মারা হচ্ছে। প্রতিদিন ক্ষমতার লোভে রঞ্জিত হচ্ছে সরকারের হাত। সরকারের পৈশাচিক দমন পীড়ন এবং এর বিরুদ্ধে জনগণের নিয়মতানি্ত্রক আন্দোলনে জনজীবন আজ স্থবির হয়ে পড়েছে। মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। অচলাবস্থার কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ সরকার নির্বিকার ও অনড়। দেশের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সকলে অনুভব করলেও সরকার বলছে, সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে। এটা কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মনোভাব হতে পারে না।

‘আমাদের আহ্বান ও দেশবাসীর আকুতিতে সাড়া না দিলেও জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের মধ্যস্থতায় সরকারী দল আলোচনায় বসতে সম্মত হওয়ায় দেশবাসীর মথ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। আমি আশা করি, বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশাকে তারা বিবেচনায় নেবেন এবং একগুঁয়েমি প্রত্যাহার করে শানি্ত ও সমঝোতার পথে এগুবেন।

‘সমঝোতার পথ প্রশস্ত করার জন্য সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা খুবই অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের এখনো মুক্তি দেয়া হয়নি, প্রত্যাহার করা হয়নি মিথ্যা মামলা। আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন এখনো প্রহসনের নির্বাচনের তফশীল স্থগিত করেনি। বিরোধী দলের অবরুদ্ধ অফিস ও বন্ধ সংবাদ-মাধ্যমগুলো এখনো খুলে দেওয়া হয়নি। এখনো শানি্তপূর্ণ সমাবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি। এখনো আন্দোলনকারীদের প্রাণসংহার ও রক্ত ঝরানো বন্ধ হীন। এই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করে সংলাপ ও সমঝোতার পথ প্রশস্ত করার জন্য আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

‘দেশবাসীকে আমি বলবো, জনগণের দাবিকে পাশ কাটাতে সরকার উস্কানি, অন্তর্ঘাত, নাশকতা ও অপপ্রচার অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ওপর হামলা, আলেম সমাজের ওপর নিপীড়ন এবং নিরপরাধ মানুষকে অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে হত্যা করে পরিস্থিতির মোড় ঘুরাবার অপচষ্টো তারা বারবার করছে। এ ব্যাপারে সকলকে সজাগ থাকতে হবে। হঠকারিতার আশ্রয় নিয়ে উস্কানিমূলক বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে আমাদের গণতানি্ত্রক সংগ্রামের উদ্দেশ্য নিয়েও তারা অপপ্রচার করছে। অতীতেও এভাবে গণআন্দোলনকে বিপথগামী করার অপচষ্টো সফল হয়নি। বর্তমান সরকারও সফল হতে পারেব না ইনশাল্লাহ।
‘আজ লক্ষ্মীপুরে যাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যারা ইতেমধ্যে আত্মাহুতি দিয়েছেন আমি সেই সকল শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। তাদের স্বজনদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমবেদনা জানাচ্ছি। আহত ও নির্যাতিত হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতি জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সহমর্মিতা। অন্তর্ঘাতে যেসব নিরপরাধ নাগরিক প্রাণ দিয়েছেন, অসহ্য যন্ত্রণা সয়ে এখনো যারা চিকিত্সাধীন রয়েছেন তাদের জন্য আবারো গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

‘সংকট থেকে দেশ-জাতির মুক্তির জন্য, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের সুরক্ষা এবং শানি্ত ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা আন্দোলন করছি। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শানি্তপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও জনগণের পছন্দসই একটি সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এ সংগ্রাম তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে। আমি শান্তপূর্ণ এই আন্দোলন সকল দেশবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করছি।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here