দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য অর্জনে সরকার সংকল্পবদ্ধ

17

pm3প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতা-বিরোধীদের সব ধরনের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, আমরা তার স্বপ্নের বাংলাদেশের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য অর্জনে সংকল্পবদ্ধ। কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে।’ আজ শনিবার বিকালে রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ঐতিহাসিক সাতই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত ‘৭ মার্চের ভাষণ: বিশ্ব-ইতিহাসে স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ ভাষণ’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা-বিরোধী অপশক্তির ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক চড়াই-উত্ড়াই পেরিয়ে আমরা ক্ষমতায় এসেছি। দেশের মানুষের জন্য আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। শত ষড়যন্ত্র পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাঙালিদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ দেখেন, কথটা কত সত্যি! স্বাধীনতা-বিরোধী অপশক্তি সব সময় সক্রিয় ছিল, এখনো রয়েছে। কিন্তু দেশের অগ্রযাত্রা তারা ব্যাহত করতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণের তাত্পর্য ছাড়াও ওই ভাষণ প্রদানের আগে ও পরে তার কাছ থেকে দেখা বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা সব সময়ই সক্রিয় ছিল। এ কারণেই স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতার শত্রুরা। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ যাতে ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটাতে না পারে, স্বাধীনতার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে না পারে, সে জন্য স্বাধীনতার শত্রুরা মাত্র ১০ বছরের শিশু রাসেলকে পর্যন্ত বাঁচতে দেয়নি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে দিতে ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকেও তারা হত্যা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের অনেক সেক্টর কমান্ডারকেও হত্যা করা হয়েছিল।’

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণকে ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা ভাষণ’ আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ বাজানোই নিষিদ্ধ ছিল। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজাতে গিয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীকে জীবন দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম নিয়ে ক্ষমতা দখলকারীরা উল্টো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ধ্বংস করেছে, পরাজিত শক্তির পদলেহন করেছে। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের তাত্পর্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণেই মূলত বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। একটি মাত্র ভাষণে জাতির পিতা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ ২৩ বছরের লড়াই-সংগ্রামের সফলতা এনে দিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সাতই মার্চের ভাষণ বিশ্বের ইতিহাসে স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ ভাষণটি কখনো পুরনো হয় না। ৪৩ বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ ভাষণটি শুনছেন, কিন্তু ভাষণটির আবেদন এতটুকুও কমেনি। পৃথিবীর কোন ভাষণ বছরের পর বছর, ঘন্টার পর ঘন্টা এতো দীর্ঘ সময় বাজেনি, আবেদনও ধরে রাখতে পারেনি। দেশের মানুষ যখনই এই কালজয়ী ভাষণটি শুনেন, তখনই নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের প্রতিটি উচ্চারণ ও শব্দ আমাদের নতুন করে প্রেরণা যোগায়। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ভাষণ দিতে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তুতি সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ভাষণ দেওয়ার আগে অনেক নেতাই বঙ্গবন্ধুকে নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিভিন্ন বক্তব্যে লিখেও দিয়েছিলেন। অনেকে অনেক কথায় বলেছেন। কিন্তু ভাষণ দেওয়ার আগে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর সামান্য বিশ্রামের সময় আমার মা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, অনেকে অনেক কথা বলবে, পরামর্শ দেবে কিন্তু তোমার কাছে যেটা ঠিক সেটাই বলবে। কারণ জনসভায় লাখো বাঙালির হাতে লাঠি, আর পেছনে সশস্ত্র পাক হানাদাররা। সব মানুষের দায়-দায়িত্ব তোমার ওপর। তাই তোমার মনে যা আছে তাই বলবে, কারোর কথা শোনার দরকার নেই।

পিতার ঐতিহাসিক ভাষণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সত্যিই তত্কালীন রেডকোর্স ময়দানে লাখ-লাখ মানুষের সামনে কোনো লিখিত বক্তব্যে বা নোট ছাড়াই বঙ্গবন্ধু তার মনে কথা বলেছেন। কোনো লেখা বা নোট ছাড়াই এক মহাকাব্য রচনা করেন, একটি ভাষণেই গোটা জাতিকে স্বাধীনতার গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে এনে দিয়েছিলেন মহার্ঘ স্বাধীনতা।’

শেখ হাসিনা, ‘ভাষণ দেয়ার আগে বঙ্গবন্ধু জানতেন, এমন কিছু বলা যাবে না যাতে স্বাধীনতার সংগ্রামকে কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। কারণ, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া যায় না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চের মাধ্যমেই স্বাধীনতাযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। পুরো বাঙালি জাতি জাতির পিতার প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন।’

দেশের যুব সমাজসহ নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর এই ‘কালজয়ী’ ভাষণ শোনানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু বছরের পর বছর জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু কারো কাছে মাথা নত করেননি, স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোষ করেননি। নিজের জীবন বা পরিবারের কী হলো কখনো তিনি তা ভেবে দেখেননি। বঙ্গবন্ধুর এই মহান আত্মত্যাগের মহিমায় দেশের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে দেশের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।’

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য দেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউট অব লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড বাংলাদেশ স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান ও নির্বাহী কর্মকর্তা মাশুরা হোসেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক অনুপম সেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার ছোট-ছোট শিল্পীরা। এরপর একাত্তরের সাতই মার্চ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ডকৃত প্রমাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পুরো অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন খ্যাতনামা নাট্যশিল্পী লাকী ইমাম ও ড. শাহাদাত্ হোসেন নিপু। দেশের প্রথিতযশা বৃদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক অনুপম সেন বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণটি বিশ্ব-ইতিহাসে স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠতম ভাষণ। এ ছাড়া, বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়েকটি অসাধারণ বক্তৃতা আছে, বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণটি তার মধ্যে অন্যতম, সম্ভবত শ্রেষ্ঠতমও। মহাকাল ছাপিয়ে এই মহাকাব্যিক ভাষণটি তাই কোনো দিন অম্লান হবে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একাত্তরে বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষকে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী, বিত্ত-বৈভবের বিভাজন নির্বিশেষে এক মহাঐক্যে জাগ্রত করেছিলেন এক মহাভাষণের মাধ্যমে। আর এই মহাভাষণের পটভূমি বঙ্গবন্ধুই তৈরি করেছিলেন তার ২৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।’

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একটিমাত্র কালজয়ী ভাষণের মধ্য দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিলেন। এনে দিয়েছিছেন মহার্ঘ স্বাধীনতা। ইতিহাসের মহামানব বঙ্গবন্ধুকে সময় সৃষ্টি করেনি, বরং সময়কেই করতলে রেখে বাংলাদেশের ইতিহাসে কালজয়ী নেতা হয়েছিলেন তিনি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here