দুই দলের সমঝোতা হলে নির্বাচন পেছাতে পারে ।

16

52a4d2331c71c-60জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধি অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ঢাকা সফরের তৃতীয় দিনেও রাজনৈতিক সংকট সমাধানের ইঙ্গিত মেলেনি। তিনি নির্বাচন পেছানোর কথা বললেও সরকার ও নির্বাচন কমিশন থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব তারানকো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার আশা নিয়ে ঢাকা এসেছেন গত শুক্রবার। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, নাগরিক সমাজ ও কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। আজ ও কাল রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আরও বৈঠক করে তিনি নিউইয়র্ক ফিরে যাবেন।

নির্বাচন কমিশন বলছে, রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছালে তফসিল পরিবর্তন করার বিষয়টি বিবেচনা করবে তারা। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনের তফসিল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইনগত বাধাগুলোও খতিয়ে দেখছে কমিশন। বিশেষ করে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ইতিমধ্যে সাতজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে চলেছেন। এ অবস্থায় তফসিল পরিবর্তন হলে আইনি জটিলতায় পড়বে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন মনে করে, দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হবে, এমনটা ধরে নিয়ে তফসিল পেছানো হলে কোনো লাভ হবে না। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের সংকট নিরসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেই কেবল বর্তমান পরিস্থিতিতে তফসিল পেছানো সম্ভব। তা না হলে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্বপ্রণোদিত উদ্যোগ নিলে কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘ প্রতিনিধিকে তফসিল পেছানোর সমস্যাগুলো বলেছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল রোববার দুপুরে তারানকো নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন। নির্বাচনী তফসিল পিছিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না, তা জানতে চান তারানকো। জবাবে সিইসি বলেন, কেবল প্রধান দুটি পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে তফসিল পরিবর্তন সম্ভব। অন্যথায় বর্তমান তফসিল অনুযায়ী তাঁরা নির্বাচন করবেন। সিইসি বলেন, তারানকোর সফরে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হলে তফসিল পেছানো যেতে পারে।

তারানকোর সঙ্গে বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, সব দলের মধ্যে সমঝোতা হলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। এটাই জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। সমঝোতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিলতর হয়ে গেছে। আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তবে সিইসি বলেন, ‘যেহেতু জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল সকলের সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ বের করার চেষ্টা করছে, তাই এ মুহূর্তে বেশি কিছু বলা সমীচীন হবে না। আমরা সবাই আশায় থাকি।’

কমিশন মনে করে, আইনি বাধা থাকলেও সব দলের মধ্যে সমঝোতা হলে তফসিল পরিবর্তন সম্ভব। এ বিবেচনায় কমিশন জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট ১৮৯৭ নিয়েও পর্যালোচনা করেছে। এই আইনের ২১ ধারায় বলা আছে, কোনো প্রতিষ্ঠান নোটিশ বা প্রজ্ঞাপন জারি করলে প্রয়োজনে তা বাতিল করার ক্ষমতা সেই প্রতিষ্ঠানের থাকবে। এই আইনের অধীনে ২০০৭ সালের নির্বাচনের তফসিল বাতিল করা হয়েছিল।

দিনভর বৈঠক: অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদল বলেছে, সব দল নিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের তফসিল পেছানো যায়।

জাতীয় পার্টি মনে করে, সব দল নিয়ে নির্বাচন না হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং বর্তমানে যে সহিংসতা চলছে, তা থামবে না। আর নাগরিক সমাজ ‘একতরফা নির্বাচনের ট্রেন’ থামানোর কথা বলেছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে তাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

সকালে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারানকো। এরপর তিনি সিইসি কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদল, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ সরন ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন।

জাপার সঙ্গে বৈঠক: এরশাদের সঙ্গে বৈঠকের পর জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদের বলেন, ‘জাতিসংঘ আমাদের মতামত জানতে চেয়েছে। আমরা বলেছি, এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন বাঞ্ছনীয় নয়। নির্বাচন পিছিয়ে দিতে হবে। পিছিয়ে দেওয়া নির্বাচনে যেন সবাই আসতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। সব দলের আসা নিশ্চিত না হলে এই মুহূর্তে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে পরিবেশ সুষ্ঠু হলে সব দল অংশ নিলে আমরা নির্বাচনে অংশ নেব।’

নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়: তারানকোর সঙ্গে এক ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠকের পর ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের জানান, বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব তাঁদের মতামত নিয়েছেন। নির্বাচনের তফসিল পেছানোর ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কামাল হোসেন বলেন, ‘তফসিল আইনত পেছানো সম্ভব, আমি তো মনে করি, এখনো সম্ভব।’

এ সময় তাঁর পাশে উপস্থিত সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে উদ্ধৃত করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে নির্বাচন পেছানো যায়।

তারানকোর সঙ্গে আলোচনায় নাগরিক সমাজ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নাকি বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল বলেন, ‘সবার কাছে যেটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটাই হওয়া উচিত। একতরফা নির্বাচন যেটা এখন হতে যাচ্ছে, তার ফলে যে ঘটনাগুলো হচ্ছে, সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং এতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। সংঘাত-সংঘর্ষ বন্ধ হোক। একতরফা নির্বাচনের রেলগাড়িটা থামানোর কথা আমরা বলেছি।’

শাহদীন মালিক বলেন, ‘জাতিসংঘ সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনে চায়, সারা দুনিয়া চায়। এ বিষয়ে আমরা আমাদের জায়গায়, ওরা ওদের জায়গায় কাজ করছে। বারবার ওনারা (জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল) বলছেন, ওনারা কোনো ফর্মুলা নিয়ে নিউইয়র্ক থেকে আসেননি।’

গওহর রিজভীর সঙ্গে বৈঠক: সিইসির সঙ্গে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য গওহর রিজভীর সঙ্গে বৈঠক করতে যান তারানকো। সিইসির সঙ্গে তাঁর দপ্তরে বৈঠক শেষে তারানকো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান। কূটনৈতিক সূত্রগুলো এই প্রতিবেদককে জানায়, তাঁদের এ বৈঠকটি ছিল অনির্ধারিত এবং প্রায় এক ঘণ্টা তাঁরা একান্তে আলোচনা করেন।

শমসের মবিনের বাসায় নৈশভোজ: গওহর রিজভীর সঙ্গে অনির্ধারিত বৈঠকের মতো সন্ধ্যায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন তারানকো। জানা গেছে, ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ সরনের সঙ্গে তাঁর দপ্তরে বৈঠকের পর তারানকো সরাসরি শমসের মবিনের বনানীর বাসায় যান।

নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতা: গতকাল রোববার জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আর দিনের প্রথম ভাগে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে একাধিক আলোচনা করেছেন। সকালে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ সরনের সঙ্গে তাঁর বাসায় দেখা করেন। এক ভারতীয় কূটনীতিক বৈঠকের খবর নিশ্চিত করলেও আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে মন্তব্য করতে অপারগতা জানান।

তাঁদের দুজনের ওই আলোচনার পর ড্যান মজীনা যান ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনের বাসায়। এ সময় ওই আলোচনায় যোগ দেন ঢাকায় জার্মান রাষ্ট্রদূত আলব্রেখট কনজে, কানাডার হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা। কূটনীতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট, জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের ঢাকা সফরসহ প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here