দগ্ধ মাসুমাও চলে গেলেন না ফেরার দেশে

16

image_92735মাত্র তিন মাস পূর্বে বিয়ে হয়েছিল তরুণ ব্যাংকার মাসুমার। হাতের মেহেদীর রং না শুকাতেই রাজনৈতিক সহিংসতার আগুনে দগ্ধ হয়ে তাকে চলে যেতে হলো না- ফেরার দেশে। গত ২৮ নভেম্বর রাজধানীর শাহ-বাগে যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গুরু-তর ভাবে দগ্ধ হন রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার (৩০)। দীর্ঘ দুই সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গতকাল বুধবার সকালে এলিফ্যান্ট রোডের একটি ক্লিনিকে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

মাসুমার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রূপালী ব্যাংক এর প্রধান কার্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন শাখা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সহকর্মীর মরদেহ এক নজর দেখার জন্য ছুটে আসেন। আসেন তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরাও। মাসুমার লাশ ধরে অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তাদের বুক ফাটা কান্নায় এলিফ্যান্ট রোডের ঢাকা বার্ন ক্লিনিকে শোকের ছায়া নেমে আসে। শোকাহত ব্যাংক কর্মকর্তারা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, এ ধরনের নিষ্ঠুর বর্বরতার সঙ্গে জড়িতদের প্রকাশ্যে ক্রসফায়ার করা হোক। মানুষ হত্যা করে দলীয় স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টার তারা তীব্র নিন্দা জানান।

পারিবারিক সূত্র জানায়, দুই বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স পাস করে মাসুমা রূপালী ব্যাংকে যোগদান করেন। পুরনো ঢাকার শ্যামবাজার শাখার সিনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। ২৮ নভেম্বর ছুটি শেষে সন্ধ্যায় কর্মস্থল থেকে ফার্মগেটের বাসার উদ্দেশ্যে বের হন মাসুমা। সদরঘাট এলাকা থেকে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে তিনিও বিহঙ্গ পরিবহনের বাসে উঠেন। শাহবাগ শিশু পার্কের কাছে আসলে চলন্ত বাসে দুই তরুণ পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে গাড়িতে আগুন লেগে চালক মাহবুবসহ ১৯ যাত্রী দগ্ধ হন। তাদেরই একজন মাসুমা।

স্বজনরা জানান, বাসটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে অন্য যাত্রীরা জানালা দিয়ে লাফিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও মাসুমা বাসের ফ্লোরে বসে পড়েন। দগ্ধ অবস্থায় তিনি সবার পরে বাস থেকে বের হন। ততক্ষণে তার খাদ্যনালী পুড়ে যায়। ঘটনার পর পুলিশ ও আশপাশের লোকজন অগ্নিদগ্ধদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বার্ন ইউনিটে নিয়ে যায়। একদিন ভর্তি থাকার পর সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বজনরা বার্ন ইউনিট থেকে মাসুমাকে নিয়ে যান।

ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বলেন, মাসুমাকে স্বল্প সময় চিকিত্সা সেবা দেয়া হয়। ২০ ভাগ পোড়া ছিল তার দেহ। এখানে চিকিত্সা নিলে সে সুস্থ হয়ে যেত এমন আশাবাদী ছিলেন চিকিত্সকরা। কিন্তু সিঙ্গাপুরে উন্নতমানের চিকিত্সা পেলে মাসুমা দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে-এই আশায় তাকে বার্ন ইউনিট থেকে নিয়ে যান স্বজনরা। গতকাল ঢাকার একটি ক্লিনিকে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তিনি ব্যথিত হয়েছেন বলে জানান।

ঢাকা বার্ন ক্লিনিকের পোড়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দিন বলেন, মাসুমার দেহে ২০ ভাগ পোড়া থাকলেও চিকিত্সায় সে প্রায় সুস্থ হয়ে উঠে। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের সময় তার খাদ্যনালী পুড়ে যাওয়ায় তাদের আর কিছু করার ছিল না ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. শামন্ত লাল সেন বলেন, সম্প্রতিকালের হরতাল অবরোধে দগ্ধ হয়ে শতাধিক যাত্রীকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে মাসুমাকে নিয়ে গতকাল পর্যন্ত ১৪ জন মারা গেল। ৩৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে ৩০ জন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। এ সব পোড়া রোগীর চিকিত্সার ব্যয় প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, গতকাল বিকেলে মাসুমার লাশ নরসিংদী শহরের ভেলানগর মহল্লার নিজ বাড়িতে নিয়ে আসার পর এখানে এক হূদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। আত্মীয়-স্বজনদের চিত্কার-আহাজারিতে উপস্থিত লোকজনের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে। এখানে কিছুক্ষণ লাশ রাখার পর মাসুমাকে নিয়ে যাওয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর হোসেনপুর গ্রামে। বাদ এশা হোসেনপুর গ্রামের ঈদগাহে নামাজে জানাজা শেষে তাকে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।

জানা গেছে, মাত্র ৪ মাস পূর্বে গ্রামের মৃত সামসুল আলমের কন্যা মাসুমা আক্তারের বিয়ে হয় কুমিল্লার বুড়িচং থানার মাহবুবুল আলমের সাথে। তার স্বামী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন লেকচারার। নয় বোন এক ভাই এর মধ্যে মাসুমা ছিল সবার আদরের ছোট বোন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here