জনগণের জানমাল রক্ষায় কঠোর হবে সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী

16

pm2আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, কিছু বলতে হলে কিংবা সমস্যা থাকলে আলোচনায় আসুন। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করি। কয়েকজন রাজাকার আর যুদ্ধাপরাধীকে নিয়ে মানুষের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে পারবেন না। জনগণের জানমাল রক্ষায় যত কঠোর হতে হয় ততো কঠোর হবে সরকার। প্রধানমন্ত্রী সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেন, সরকারের পাশাপাশি আপনারাও সন্ত্রাস ও নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।

গতকাল শুক্রবার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভায় তিনি এ কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ এই জনসভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।

বিএনপি নেত্রীর উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আপনি অনেক খেলা দেখালেন, আর না। এবার ক্ষান্ত দেন। জনগণকে আর যন্ত্রণা দেবেন না, মানুষ হত্যা করবেন না। নির্বাচনে না এসে যে ভুল করেছেন তার খেসারত আপনাকেই দিতে হবে। আপনার অন্তর্জ্বালায় বাংলাদেশের মানুষকে জালিয়ে পুড়িয়ে মারবেন, এটা হতে পারে না। আন্দোলনের নামে হরতাল-অবরোধ দিয়ে নাশকতা ও মানুষ হত্যা যদি বন্ধ না করেন তাহলে কীভাবে বন্ধ করতে হয় তা আওয়ামী লীগের জানা আছে। কিছুতেই আমরা পিছু হঠবো না। খালেদা জিয়া তাঁর ব্যর্থতার আগুনে দেশকে পুড়িয়ে ছারখার করতে চান উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচন বানচাল করতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। তবে দেশের মানুষ আর কত ধ্বংসযজ্ঞ সহ্য করবে? জবাব দিতে হবে সংখ্যালঘুদের কেন হত্যা করা হচ্ছে? তারা নৌকায় ভোট দিয়েছে এটাই কী তাদের অপরাধ? বাংলার মানুষের ভোট দিয়ে দেশের উন্নয়ন করতে চাওয়াটা কী অপরাধ? ২০০১ সালের নির্বাচনের পরেও সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মনে রাখতে হবে সেসময় আমরা বিরোধী দলে ছিলাম। কিন্তু এখন জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আছি।

আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের অব্যাহত সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়া নিজে এসি রুমে বসে মুরগির স্যুপ খান, আর জনগণকে ডাক দেন। কিন্তু উনার ডাকে কেউ সাড়া দেয় না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে চেয়েছে তারা চেয়েছিলো আবার কোন অসাংবিধানিক সরকার আসুক। তবে বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করেছে তারা অশান্তি চায় না, তারা সাংবিধানিক সরকার চায়। তারা আর দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। সেটাই তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দেখিয়ে দিয়েছে। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের ভোটের অধিকার ও সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন সেই আইন -শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনা, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব ও নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকর্তা সকলের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনের আগে তাকে বারবার আলোচনায় বসার আহ্বান জানাই। কিন্তু আমি যতবারই আহ্বান জানিয়েছি ততোবারই উনি আলটিমেটাম দিয়েছেন। বলেছেন আমি নাকি পালানোরও পথ খুঁজে পাব না। আমি নাকি প্রধানমন্ত্রী কেন বিরোধী দলের নেতাও হতে পারবো না। অথচ আজ এটি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়ে গেল। উনি যে অভিশাপ দেন তা উল্টো আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে।

শিগগিরই দেশের সব কিছু স্বাভাবিকভাবে চলবে দেশবাসীকে এমন আশ্বস্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, হরতাল-অবরোধ দিয়ে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার দিন আর থাকবে না। আবার মানুষ নিয়মিত সব কাজ করতে পারবে, এতে কেউ কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। ছেলে-মেয়েদের স্কুল চলবে। জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছি, এ বিচার সম্পন্ন করবো। সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে কলঙ্ক মুক্ত করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের পরিণত হয়ে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবো। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের পর যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার চেতনাকে ধ্বংস করেন জেনারেল জিয়া। সে সময় বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতেও দেয়া হয়নি। স্বাধীনতার চেতনাকে ধ্বংস করা হয়। তিনি বলেন, আজকের দিনে এই মাঠেই (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশ কীভাবে চলবে, তার দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। আমরা চাই, জাতির পিতার সেই অসমাপ্ত কাজ শেষ করে যেতে।

জনসভাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এবং ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসেন। বিকাল ২টার মধ্যেই পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও এর আশপাশ এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।

জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আহমদ হোসেন, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার, সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ, ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।

আমির হোসেন আমু বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাতির অগ্রযাত্রাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, যারা একবার পরাজিত হয়েছিল, তারা বারবার পরাজিত হয়। জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন না করে আপনি (খালেদা জিয়া) আবারো পরাজিত হয়েছেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আবারও (একাদশ নির্বাচন) শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন করতে হবে।

বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, লাদেন স্টাইলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমান সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিচ্ছেন। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি নেত্রী জামায়াতের ফাঁদে পা দিয়ে ভুল করেছেন। তাই তাঁকে মাশুল দিতে হবে।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, শুধুমাত্র জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী দল নয়। প্রধান স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল হলো খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। এদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, আমরা বারবার স্বাধীনতার শত্রুদের পরাজিত করলেও সম্পূর্ণ বিজয় আনতে পারিনি।

মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, সামপ্রদায়িকতার বিষবাষ্প কঠোর হাতে দমন করা হবে।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে বৃহত্ জনসমাগম নিয়ে ঢাকার জনসভায় যোগ দিয়েছেন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। দীর্ঘদিন পরে হলেও দলীয় এই কর্মসূচিকে ঘিরে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ছিল উত্সবের আমেজ। বিশেষ করে দীর্ঘ ১ যুগ পরে স্থানীয় এমপি হিসেবে শামীম ওসমানকে পেয়ে কর্মীদের মাঝে ছিল অন্যরকম উদ্বেলতা। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার প্রায় অর্ধশত স্পটে শুক্রবারের জনসভায় যোগ দেয়াকে কেন্দ্র করে চলে কর্মীদের খাওয়ার আয়োজন। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ আভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী প্রায় সাড়ে ৪’শ বাসযোগে নেতাকর্মীরা শামীম ওসমানের নেতৃত্বে ঢাকায় গেলেও পরিবহন সংকটের কারণে অনেক এলাকার কর্মীরা ট্রেন, ট্রাক, অটোরিক্সা ও ভ্যানে করেও জনসভায় গিয়েছেন। সরজমিনে দেখা গেছে, ফতুল্লার কুতুবপুর, পাগলাসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত নেতাকর্মী পরিবহন না পেয়ে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকে দল বেধে পায়ে হেঁটেও ঢাকার জনসভায় যোগ দিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here