চুরির টাকা ‘ব্ল্যাকহোলে’ ফিলিপাইনে ২০ দিন ঘুরেছিল রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া ৮০০ কোটি টাকা

23

জনতার নিউজ

চুরির টাকা ‘ব্ল্যাকহোলে’

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপাইনের ব্যাংক থেকে তোলার পরে সে দেশের জুয়ার টেবিলে ঘোরে ২০ দিন। সে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও ছিল নিশ্চুপ। এখন ওই অর্থের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। চুরি যাওয়া ৮১ কোটি ১০ লাখ ডলার (৮০০ কোটি টাকা) উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। এ বিষয়ে ফিলিপাইনের তদন্তকারী সিনেট কমিটি ব্লু রিবন সদস্য সের্গিও ওসমেনা বলেছেন, চুরি যাওয়া অর্থ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। আর কমিটির সভাপতি তেয়োফিস্তো গুংগোনা থ্রি বলেছেন, “চুরির টাকা ‘ব্ল্যাকহোলে’ (কৃষ্ণ গহ্বরে) চলে গেছে।” তবে ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের সিনেট এ বিষয়ে শুনানির আয়োজন করে। গতকাল বৃহস্পতিবার ও আগের দিন বুধবার এ শুনানি হয়। শুনানির পর এক প্রতিক্রিয়ায় দেশটির তদন্তকারী সিনেট কমিটি ব্লু রিবনের সদস্য সের্গিও ওসমেনা বলেছেন, চুরি যাওয়া অর্থ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। চুরি যাওয়া অর্থ এরই মধ্যে ফিলিপাইন থেকে অন্য দেশে পাচার হয়ে গেছে বলেও তার ধারণা। ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়ারার পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবেদন করা হয়েছে।

সিনেটর ওসমেনা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি যাওয়া অর্থের খোঁজ পাওয়ার ব্যাপারটি নির্ভর করছে ক্যাসিনোর সহযোগিতার ওপর। যদিও এখন পর্যন্ত ওই অর্থ কোথায় আছে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। ইনকোয়ারার পত্রিকার ১১ মার্চের খবরে জানা যায়, ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার দেশটির আরসিবিসি (রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন) হয়ে ক্যাসিনোতে (জুয়া খেলার স্থান) ঢুকে পড়েছে।

সিনেট সদস্য ওসমেনা সাংবাদিকদের বলেন, দেশের বাইরে থাকায় সোলোয়ার ক্যাসিনোর প্রেসিডেন্টকে তাঁরা এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেননি। ওই ক্যাসিনোর প্রেসিডেন্ট যে করপোরেট কনস্যুলারকে পাঠিয়েছেন, তিনি লেনদেনের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানেন না।

তবে ওসমেনা বলেন, চুরি যাওয়া অর্থ কোথায় গেল, তা তিনি ক্যাসিনোর রেকর্ড যাচাই করে দেখতে চান। তাঁরা ক্যাসিনোগুলোর কাছ থেকে ওই অর্থের ‘ইলেকট্রনিক ট্রেইল’ খোঁজার চেষ্টা করবেন। তবে এ ব্যাপারে আইনের অনেক ফাঁক রয়েছে।

 সেই ফাঁক দিয়ে ক্যাসিনো সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে।

ওসমেনা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফিলিপাইনের আইন সরকারের চেয়ে অপরাধীদের বেশি রক্ষা করে। এ প্রসঙ্গে তিনি ব্যাংকের গোপনীয়তা-বিষয়ক একটি আইনের উদাহরণ দেন।

জুয়ার বোর্ডে ২০ দিন ঘুরেছিল চুরির অর্থ

ফিলিপাইনে এ ঘটনা তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে সেখানকার সংবাদমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায়, ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি হয়। চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের আরবিসি’র জুপিটার রোডের মাকাতি শাখায় ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে অর্থের বড় অংশ চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে। আবার ক্যাসিনোতেও সেই অর্থ ছিল আরও ২০ দিন। পরে ২৯ ফেব্রুয়ারি সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। অর্থ চুরির পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশে গোপন রাখা হয়।

ব্যাংক ম্যানেজার দায়ী

ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়ারার গত বুধবার দেশটির সিনেট কমিটির শুনানিতে উপস্থাপিত তদন্ত প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আরসিবিসি’র অভ্যন্তরীণ তদন্তের ভিত্তিতে তারা নিজেরা তৈরি করেছিল ওই প্রতিবেদন। সেখানে ব্যাংকটির মাকাতি শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোকে চুরির অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী করা হয়।

ম্যানেজারকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল: সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনে দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে আরসিবিসির সাবেক কাস্টমার সার্ভিস প্রধান রোমুআল্ডো অগারাডো সিনেটরদের জানান, রিজাল ব্যাংকের জুপিটার শাখায় অর্থ হস্তান্তরের সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকার কথা জানিয়েছিলেন আরসিবিসি’র মাকাতি শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো। আর ৫ ফেব্রুয়ারি একটি কাগজের ব্যাগে করে দেগুইতোর গাড়িতে যে ২০ মিলিয়ন পেশো (৪ লাখ ৩১ হাজার ডলার) তোলা হয়েছিল সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি যাওয়া অর্থ বলে টাকা বলে তার ধারণা। কারণ ওইদিনই উইলিয়াম গো এর অ্যাকাউন্টে অর্থ ঢোকে। সিনেটর ভিসেন্তে সোতোর প্রশ্নের জবাবে অগারাডো বলেন, জ্যেষ্ঠ কাস্টমার রিলেশনস অফিসার অ্যাঞ্জেলা তোরেস তার সঙ্গে ছিলেন। ওই সময়ে দেগুইতো জুপিটার ব্যাংকের একটি কক্ষে ছিলেন, তাকে সে সময় খুব ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘দেগুইতো তখন তাদের বলেছিলেন, হয় আমাকে এ অর্থ ছাড় করতে হবে, না হয় আমি বা আমার বাবা খুন হব।’

দেগুইতোর সঙ্গে সিনেট কমিটির বৈঠক

দেগুইতোর সঙ্গে বৈঠক করেছে দেশটির সিনেট কমিটি। অগার্ডোর  সাক্ষ্য নেয়ার পরে সিনেট কমিটির কাছে বক্তব্য দেবেন বলে জানান আরসিবিসি’র মাকাতি শাখা ব্যবস্থাপক দেগুইতো। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে বিষয়টি জড়িত বলে বৈঠকের আলোচনা প্রসঙ্গে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

মানি এক্সচেঞ্জ কোম্পানির ক্ষমা প্রার্থনা: ফেরত দেবে লাভের পৌনে দুই কোটি টাকা

বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে ফিলিপাইনের বৈদেশিক মুদ্রা পরিবর্তনের (মানি একচেঞ্জ) ডিলার ফিলরেম সার্ভিসেস ইনকরপোরেটেড। গতকাল সিনেটে শুনানির সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে ক্ষমা চায় প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার পেসোতে পরিবর্তন বাবদ লাভ হওয়া অর্থ ফেরত দেবে ফিলরেম। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ এক কোটি ৭৬ লাখ এক হাজার ৪৭২ টাকা।

রাষ্ট্রদূতের আশাবাদ

ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ বলেছেন, অবশ্যই আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই। তিনি বলেন, ওই অর্থ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করা হোক, যাতে আমরা তা ফেরত পেতে পারি। রাষ্ট্রদূত টাকা ফেরতের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও তিনি জানাতে পারেননি কিভাবে ওই অর্থের সন্ধান পাওয়া যাবে এবং কিভাবে উদ্ধার হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here