চীনের সঙ্গে ৫টি চুক্তি স্বাক্ষর

14

বিদ্যুেকন্দ্র, অর্থ ও কৌশলগত সহযোগিতা দেবে চীন

বেইজিংয়ে শেখ হাসিনা-লি কেকিয়াং শীর্ষ বৈঠক

জনতার নিউজঃ

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রসহ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ে মোট পাঁচটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল সোমবার বেইজিংয়ের গ্রেট হলে শেখ হাসিনা-লি কেকিয়াং শীর্ষ বৈঠক শেষে এসব চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর মধ্যে দুটি চুক্তি হচ্ছে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং বিদ্যুত্ উত্পাদন ও জলবায়ু পরিবর্তনে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের। চুক্তিতে দুই দেশের সংশ্লি¬ষ্ট কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

বাসস জানায়, বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, স্বাক্ষরিত পাঁচটি চুক্তির মধ্যে দুটি চুক্তি হলো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং অন্যটি পত্রবিনিময় (ইওএল)। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি এ কে এম শামীম চৌধুরী এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, চুক্তিগুলো হলো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি এবং পটুয়াখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র স্থাপন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে চীনা ইকোনোমিক এন্ড ইনভেস্টমেন্ট জোন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ জোন কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং চীনের হারবার এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের বিষয়টিও দুই পক্ষের আলোচনায় উঠেছে। এক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে মতৈক্য হয়েছে।’

এদিকে, দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান লি কেকিয়াং। ছয় দিনের চীন সফরের দ্বিতীয় ভাগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কুনমিং থেকে রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছান। শেখ হাসিনা গ্রেট হল অব দ্য পিপলের পূর্ব প্লাজায় এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং তাঁকে স্বাগত জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী লি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের অন্য নেতৃবৃন্দ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পরিচয় করিয়ে দেন।

এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী অভিবাদন মঞ্চে ওঠেন। এখানে চীনের গণমুক্তি ফৌজ (পিএলএ)’র সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল ১৯ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিবাদন জানায়। এসময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। পরে চীনের গণমুক্তি ফৌজ (পিএলএ)’র একটি দল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড-অব-অনার প্রদান করে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংকে সাথে নিয়ে শেখ হাসিনা গার্ড পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। গার্ড পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেট হল প্ল¬াজার সামনে গণমুক্তি ফৌজ (পিএলএ)’র পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

সহযোগিতার ক্ষেত্র উন্মোচন

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চীনে তাঁর বর্তমান সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। তিনি বলেন, ‘আমার চীন সফর একটি বিরাট সাফল্য।’ এখন থেকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় অতীতের চেয়ে আরো বেশি গুরুত্ব পাবে। গতকাল বেইজিংয়ে ‘সামপ্রতিক বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সাফল্য এবং চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। চায়না ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিআইআইএস) বেইজিংয়ে তার নিজস্ব কার্যালয়ে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ এবং জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগসহ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কোন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এসময় সিআইআইএস সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষার বিপুল সংখ্যক সাবেক ছাত্র-ছাত্রী এবং উভয় দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ও চীনা ভাষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে চীনের যেসব ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করতে আগ্রহী আমরা তাদেরকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করবো। চীনও বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। চীনকে সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে উল্লে¬খ করে তিনি বলেন, কোনো আদর্শিক ও আঞ্চলিক পক্ষপাত ছাড়াই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থে কার্যকর যে কোনো ইস্যুকে পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৫ বছরে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ১৭টি চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষর করেছে। ফলে ২০০৭ সাল থেকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ও আমদানির উেস পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ বাণিজ্য খুবই ভারসাম্যহীন। বাংলাদেশ চীন থেকে ৬শ’ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করছে। বাংলাদেশ থেকে চীনে রফতানির পরিমাণ ৫০ কোটি ডলারেরও কম। বাণিজ্যিক ব্যবধান কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৯ সালের ২১ দশমিক ২৪ মিলিয়ন থেকে ২০১২ সালে ১৮১ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালে চীনের ৪৯টি কোম্পানি বাংলাদেশের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে ৩১ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ চীনের অনুদান ও সহায়তা পেয়েছে ২৬৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। একই সময় ঋণ পেয়েছে ১ হাজার ৭৩১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। চীনের এসব অনুদান, সাহায্য ও সহজ শর্তের ঋণ বাংলাদেশে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। এছাড়া আরও ৬টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ১৪টি অগ্রাধিকার প্রকল্প সহজ শর্তের ঋণ সহায়তা বিবেচনার জন্য চীন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি তাইওয়ান ও তিব্বত ইস্যুতে ‘এক চীন নীতি’র প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনরায় উল্লে¬খ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের জনগণ প্রগতিশীল এবং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচারের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর চীনে প্রথম সফরে শুক্রবার ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং পৌঁছান শেখ হাসিনা। ছয়দিনের সফর শেষে আগামী ১১ জুন শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here