চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় ঘোষণা, যা ঘটেছিল সেদিন

88

10

 

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল, রাত ১১টা। সব কিছুই আগে থেকেই ‘ম্যানেজ’ করা ছিল। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সিইউএফএলের সংরক্ষিত জেটিঘাটে উপস্থিত ছিল অস্ত্রের বাক্স ভর্তি দুটি ট্রলার, সাতটি ট্রাক ও একটি ক্রেন। জেটিঘাটে অতি গোপনে ক্রেন দিয়ে ট্রলার থেকে নামিয়ে বাক্সগুলো তোলা হচ্ছিল ট্রাকে। হঠাত্ সেখানে উপস্থিত হন কর্ণফুলী থানার বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির সে সময়ের হাবিলদার গোলাম রসুল, ফাঁড়ির ইনচার্জ সার্জেন্ট মো. আলাউদ্দিন ও পতেঙ্গা থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট হেলালউদ্দিন। ঘটনাস্থলে পুলিশের এই তিন সদস্যকে দেখে ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান রেগে ওঠেন। এই পুলিশ সদস্যদের ধমক দিয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো অস্ত্র ও গোলাবারুদ। সরকারের সকল এজেন্সি এ বিষয়ে অবগত আছে। তোরা (পুলিশ) এখান থেকে চলে না গেলে তোদেরই ক্ষতি হবে।’ পরক্ষণেই হাফিজুর এনএসআইয়ের ডিজির মোবাইলে কল দিয়ে বলেন ‘স্যার, এখানে কিছু পুলিশ আছে, তাদের চলে যেতে বলেন।’ এরপর তার ফোনটি সার্জেন্ট হেলালের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘কথা বল, তোর বাবা।’ সার্জেন্ট হেলাল এনএসআইয়ের ডিজির সঙ্গে কথা বলার সাহস না পেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের ঘটনাটি জানান। এরই মধ্যে গোপনীয়তা ভেঙ্গে যায় চোরাচালানকারীদের। আটক হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র।

আদালতে পুলিশের এই তিনজনই ওই রাতে অস্ত্র আটক হওয়ার ঘটনাটি তাদের জবানবন্দিতে বর্ণনা করেন। জবানবন্দিতে কর্ণফুলী থানার বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির সে সময়ের হাবিলদার গোলাম রসুল বলেন, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নদীর উত্তর পাড়ে বন্দর পুলিশ ফাঁড়ি। রাত পৌনে ১১ টার দিকে তিনি ছিলেন ফাঁড়িতে। এসময় হঠাত্ ফাঁড়ির টেলিফোনটি বেজে ওঠে। তিনি ফোন ধরে নিজের পরিচয় দেন। ‘তখন অন্য প্রান্ত থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তিটি বলেন, ‘হাবিলদার সাহেব, সিইউএফএল জেটিঘাটে গিয়ে দেখেন ক্রেনের দিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ট্রাকে লোড করা হচ্ছে।’ কে কথা বলছে নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে সে কিছু না বলে ফোন রেখে দেয়।’ এরপর তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি টেলিফোনে সার্জেন্ট আলাউদ্দিনকে জানান। হাবিলদার রসুল ফাঁড়ি থেকে বেরিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হওয়ার পর পথেই সার্জেন্ট আলাউদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয় এবং তিনি আলাউদ্দিনের মোটর সাইকেলে চড়েই এগিয়ে চলেন ঘাটের দিকে। তারা দুজন জেটিঘাটে পৌঁছে দেখেন অনেক লোকজন, বাক্স ভর্তি দুটি ট্রলার, সাতটি ট্রাক ও একটি ক্রেন। ক্রেন দিয়ে ট্রলার থেকে নামিয়ে বাক্সগুলো তোলা হচ্ছিল ট্রাকে। এসময় তারা শ্রমিকদের কাছে জানতে চান বাক্সে কি আছে? শ্রমিকরা জানান, ‘এগুলো মেশিনারি পার্টস। মালিক আশপাশেই আছে।’

কিন্তু রসুল আর আলাউদ্দিন অনেক খুঁজেও জেটিঘাটে মালামালের মালিককে পাননি। মালিককে খুঁজে না পেয়ে তিনি ফোন করেন পুলিশের তত্কালীন উপ-কমিশনার (ডিসি, বন্দর) আবদুল্লাহ হেল বাকীকে। তিনি ডিসি আবদুল্লাহ হেল বাকীকে বিস্তারিত জানালে ডিসি নির্দেশ দেন, ‘কোনো ট্রাক যেন মালামালসহ ঘাট থেকে বের হতে না পারে। কয়লার ডিপো ফাঁড়ির সার্জেন্ট হেলালউদ্দিন ও কর্ণফুলী থানার ওসি আহাদুর রহমানকে ঘটনাস্থলে পাঠাচ্ছি।’

এরপর রাত ১২টা ১০মিনিটে ওয়্যারলেস মারফত আবদুল্লাহ হেল বাকীর নির্দেশ পেয়ে ঘটনাস্থলে যান সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন। তারা তিনজন বাক্সগুলোর মালিকদের খুঁজতে থাকেন। ঘাটের কাছেই এক চায়ের দোকানের সামনে সাত-আট জনের জটলা দেখতে পেয়ে এগিয়ে যান তিন পুলিশ সদস্য। সে সময় ওই জটলার মধ্য থেকে দুই ব্যক্তি এগিয়ে এসে সার্জেন্ট আলাউদ্দিনের সাথে কথা বলেন।

আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে আলাউদ্দিন বলেন, ওই দুইজনের মধ্যে একজন নিজেকে হাফিজুর রহমান বলে পরিচয় দেন। কিন্তু এনএসআইয়ের সাবেক উপ-পরিচালক (টেকনিক্যাল) মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন নিজের পরিচয় গোপন করে উলফা নেতা আবুল হোসেন বলে পরিচয় দেন। কোনো ভনিতা না করেই তারা স্পষ্ট জানান, ‘ট্রলার দুটিতে অস্ত্রশস্ত্র আছে। প্রশাসনের সবাই বিষয়টি জানে।’ এসব অস্ত্রের কোনো বৈধ কাগজপত্র আছে কি না, তা জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান খেপে যান। উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, ‘কিসের কাগজ, এই অস্ত্র আসার খবর সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবার জানা আছে। তোরা এখান থেকে চলে না গেলে তোদের ক্ষতি হবে।’ এরপর হাফিজুর মোবাইলে কোনো এক ব্যক্তিকে ফোন করেন এবং স্যার সম্বোধন করে বলেন- ‘এখানে কিছু পুলিশ আছে, তাদের চলে যেতে বলেন।’ সার্জেন্ট আলাউদ্দিন বলেন, ‘এরপর আমার দিকে মোবাইল এগিয়ে দিয়ে হাফিজুর বলেন, ‘কথা বল, তোর বাবা এনএসআইয়ের ডিজির সাথে’।’ আলাউদ্দিন কথা বলতে রাজি না হলে আবুল হোসেন বলেন, ‘তোরা এখান থেকে চলে যা। পরে জানতে পারবি আমি কে?’

হাফিজুর ও আবুল হোসেনের হুমকিতে ‘বিচলিত’ হয়ে একটু দূরে গিয়ে আবার উপ-কমিশনার আবদুল্লাহ হেল বাকীকে ফোন করেন সার্জেন্ট আলাউদ্দিন। বাকী তাকে জেটিঘাট থেকে যাতে কোনো ট্রাক বের হতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখার নির্দেশ দেন।

এর কিছুক্ষণ পর আরো পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হন কর্ণফুলী থানার ওসি আহাদুর রহমান। হাফিজুর ও আবুল হোসেন ওসির সঙ্গে কথা বলে নিজেদের অস্ত্রের মালিক বলে দাবি করেন। ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের দেখে ঘাটের শ্রমিকরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে। এরপর আবদুল্লাহ হেল বাকীর নেতৃত্বে পুলিশের আরো একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এদিকে হঠাত্ করে হাফিজুর রহমান ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। তবে ‘আবুল হোসেন’ পুলিশের কাছে ছিলেন। এসময় সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন ও সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ‘আবুল হোসন’কে ডিসি’র কাছে নিয়ে যান। তখন ‘আবুল হোসেন’ ইশারা করে ডিসিকে একটু দূরে নিয়ে কথা বলেন এবং মালামাল ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ দেন।’ ‘আবুল হোসেনের’ সঙ্গে কথা শেষ করে ডিসি আবদুল্লাহ হেল বাকী আবার পুলিশ সদস্যদের কাছে এসে কথা বলতে থাকেন। এর কিছুক্ষণ পর আবুল হোসেনও সরে পড়েন। পরে পুলিশ সদস্যরা কয়েকটি বাক্স খুলে দেখতে পান, বাক্সের মধ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ। ভোরের দিকে পুলিশ সদস্যরা দশ ট্রাক সমপরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটক করে নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনে নিয়ে যান।

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কামাল উদ্দিন আহাম্মদের অভিযোগের ভিত্তিতে ‘আবুল হোসেন ওরফে লিয়াকতকে’ গ্রেফতার করা হয়। পরে চট্টগ্রাম কারাগারে করা টিআই প্যারেডে মেজর (অব.) লিয়াকতকে ওই রাতের ‘আবুল হোসেন’ বলে শনাক্ত করেন দুই পুলিশ সদস্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here