গ্রেফতার কার্যক্রম চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্

11

গুজব থাকলেও র্যাবের চাকরিচ্যুত তিন সেনা কর্মকর্তা গতকাল বুধবার আদালতে হাজির হননি। আইনগত চেষ্টাও করা হয়নি হাইকোর্টের গ্রেফতার সংক্রান্ত আদেশ স্থগিতের। আর হাইকোর্টের নির্দেশের চার দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেনি। গ্রেফতারের কার্যক্রম চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, কয় দিনের মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে হাইকোর্ট তার কোন সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। তবে নিশ্চয়ই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, হাইকোর্টের আদেশ পালনের ক্ষেত্রে কোন দীর্ঘসূত্রতা করা হচ্ছে না। আদালতের নির্দেশ আনুযায়ী সবকিছু হচ্ছে। আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে সবকিছু হচ্ছে, এ জন্য একটু সময় লাগছে। মানবাধিকার আইনজীবী জেডআই খান পান্না বলেছেন, হাইকোর্ট গ্রেফতারের জন্য কোন সময়সীমা বেঁধে না দিলেও সবকিছুরই একটি যৌক্তিক সময় থাকে।

এদিকে হাইকোর্টের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি গতকাল তাদের তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন এটর্নি জেনারেলের দপ্তরে জমা দিয়েছে। এছাড়া র্যাবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পক্ষ থেকেও আলাদা প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপহরণের পর তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিলে হয়ত অপহূত সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো। এক্ষেত্রে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রতিবেদন ও র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের বিষয় নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে শুনানি হবে।

বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চে সরকারের আইন কর্মকর্তারা এসব প্রতিবেদন আজ দাখিল করবেন। সরকারি তদন্ত কমিটি তদন্ত কাজ শেষ করতে আরও চার সপ্তাহ সময় চেয়েছে।

কমিটির সদস্য আইন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মিজানুর রহমান খান এটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশে আমাদের কমিটি গঠিত হয়েছিল। আমরা অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেছি। এখন পর্যন্ত যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট।’

সাত খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠার পর সশস্ত্র বাহিনী থেকে অবসরে পাঠানো তিন কর্মকর্তা, যাদের এরইমধ্যে গ্রেপ্তারের জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো উদ্যোগ নেই। গত ৭ মে গঠিত এই প্রশাসনিক কমিটি নারায়ণগঞ্জ গিয়ে অপহরণ এবং লাশ উদ্ধারের স্থান পর্যবেক্ষণের পর নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে। এরপর এক দফায় গণশুনানিতে ছয়জনের বক্তব্য শুনেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। আরও এক দফায় গণশুনানি হবে।

গত ১১ মে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের ডিভিশন বেঞ্চ এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে অবিলম্বে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিল। হাইকোর্টের ওই নির্দেশ চারদিনেও কার্যকর হয়নি। হাইকোর্টের আদেশের পর তা প্রতিপালনের জন্য আইজিপি চিঠি দিয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে বলেন। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয়া হয়।

জানা গেছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ওই চিঠি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠাবে। তারপর চিঠি যাবে সেনা ও নৌ-বাহিনীর হাতে। ফলে গ্রেফতারের কার্যক্রম চিঠি চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে গুজব ছিলো তিন কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জের আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন। কিন্তু গতরাত পর্যন্ত তাদের কেউই নারায়ণগঞ্জে যাননি। শোনা গিয়েছিল, হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছে তা স্থগিতের জন্যও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজের আদালতে যাওয়া হবে। কিন্তু সে ধরনের কোন চেষ্টার খবরও পাওয়া যায়নি।

তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন :

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে কোনো সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করা হয়নি। আদালদের নির্দেশ অনুযায়ী কমিটির একটি প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনে কমিটি গঠনের পর থেকে কী কী কার্যক্রম করা হয়েছে তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কমিটি ঘটনা সম্পর্কে গণশুনানি নিয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য গ্রহণ করেছে। সকলের বক্তব্যে গুম ও খুনের জন্য র্যাবকে দায়ী করার কথা উল্লেখ আছে প্রতিবেদনে।

কমিটি গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে এ কথার উল্লেখ করলেও এ বিষয়ে কমিটি কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। এজন্য সময়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিটি এখন র্যাব এবং তত্কালীন ডিসি ও এসপির বক্তব্য গ্রহণ করবে। কমিটির সদস্যরা সিদ্ধিরগঞ্জ পরিদর্শন করবেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

কমিটির প্রতিবেদনে গণশুনানিকালে গৃহীত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে শহীদ চেয়ারম্যানের বক্তব্যও উল্লেখ করা আছে। সকলের বক্তব্যেই র্যাব ও প্রশাসনকে দায়ী করা হয়েছে।

আদালত অবমাননা হবে না

এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারে পুলিশের আইজিকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও তাদের গ্রেফতারে দেরি হওয়ায় আদালত অবমাননা হবে না। কেন হবে? আদালত তো কোনো সময় বেঁধে দেয়নি। তাদের গ্রেফতারে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কি হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। গতকাল নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এসএম নাজমুল হক উপস্থিত ছিলেন। এ ধরনের আদেশে গ্রেফতারে কতদিন পর্যন্ত সময় গ্রহণযোগ্য-এমন প্রশ্নের জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সেটা আমি জানি না। আদালত বলতে পারে।’ তিন কর্মকর্তা গ্রেফতার এড়াতে চাইলে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ কি হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা আমি বলবো না। আমি তাদের আইনজীবী না।’ এটর্নি জেনারেল বলেন, নারায়ণগঞ্জের ঘটনাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ঘটনার পর তিন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টি তা প্রমাণ করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here