গার্মেন্টসে বিক্ষোভ থামছে না আশুলিয়া গাজীপুর ও টঙ্গীতে আহত ৭০, শতাধিক কারখানা ছুটি

20

Ashuliyaগতকাল মঙ্গলবার আশুলিয়া, গাজীপুর ও টঙ্গীতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ৮,১১৪ টাকা করা এবং পুলিশের গুলিতে নিহত দুই শ্রমিকের মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আশুলিয়ায় ৫০ জন, গাজীপুরে ১৫ জন এবং টঙ্গীতে ৪ শ্রমিক আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে শ্রমিকরা পুলিশের ওপর এবং বিভিন্ন কারখানায় হামলা চালায়। তারা যানবাহন ভাংচুর ও সড়ক অবরোধ করে। এ ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে।

আশুলিয়ায় আন্দোলনরত শ্রমিক-দের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে আহত হয়েছে কমপক্ষে ৫০ জন। শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট, টিয়ার সেল এবং লাঠিচার্জ করে। শ্রমিকরাও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, টায়ারে আগুন ও যানবাহন ভাংচুর করে।

সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ গতকালও শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকালে আশুলিয়ার বাইপাইল, জামগড়া, জিরাবো, ইউনিক, গোরাট, ৬তলা, শিমুলতলা, নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েক হাজার শ্রমিক সকালে কারখানায় এসে কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এক পর্যয়ে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তারা আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকরা কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে এবং মহাসড়কের পাশে কয়েকটি কারখানায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা গত সোমবার গাজীপুরে পুলিশের গুলিতে দুই শ্রমিকের মুত্যুর ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। পুলিশ তাদেরকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে এক পর্যায়ে পুলিশের সাথে জামগড়া ও নিশ্চিন্তপুরে তাদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে শুরু হয়। পুলিশ এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকরাও বিভিন্ন গলি থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এ ঘটনায় গোটা এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সড়কে আটকে পড়া যানবাহনের যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

পরিস্থিতি অবনতির আশংকায় এসময় জামগড়া এলাকার স্টারলিংক, এএম ডিজাইন, পলমল, হলিউড গামেন্টর্স, সেতারা ফ্যাশন, এনভয়, মেডলার, নেক্সট কালেকশন, দি রোজ, উইন্ডিসহ আশপাশের শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কে থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি গতকাল সকাল থেকেই বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গতকালও গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর সারদাগঞ্জ এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোনাবাড়ীতে বিজিবি মোতায়েন করা হলেও কাশিমপুর এলাকার সারদাগঞ্জে ফের শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকার প্রায় সব পোশাক কারখানা। দুই শ্রমিক নিহতের ঘটনায় অজ্ঞাত কয়েক হাজার শ্রমিকের বিরুদ্ধে গতকাল জয়দেবপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের গুলিতে দুই শ্রমিক নিহতের ঘটনার প্রতিবাদে এবং নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও দায়ীদের বিচারের দাবিতে গতকাল সকাল ৮টা থেকেই কাশিমপুর সারদাগঞ্জ ও বারেন্ডা এলাকার কয়েক হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। উত্তেজিত শ্রমিকরা কাশিমপুর-সারদাগঞ্জ সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে এবং টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় তারা পুলিশ বহনকারী একটি পিকআপ ভাংচুর করে। শ্রমিকরা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে । এসময় দফায় দফায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ চলতে থাকে। দুপুরের পর থেকে ওই এলাকা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এলাকাবাসীর মধ্যে আতংক ও এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সকাল ৯টার দিকে সারদাগঞ্জ এলাকার সুলতান মার্কেটসহ কয়েকটি মার্কেটে বেশ কিছু দোকানপাটে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিল্প এলাকা কোনাবাড়ী-কাশিমপুর সড়কে, জেলখানা ও জরুন রোডে বন্ধ কারখানা খুলে দেয়ার দাবিতে শ্রমিকরা মিছিল বের করার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। এক পর্যায়ে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। সহিংসতার আশংকায় কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকার অর্ধশত কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে সারদাগঞ্জ জিএমএস কারখানার শ্রমিক বাদশা মিয়া ও নুরেজা ওরফে রুমা আক্তার নিহতের ঘটনায় মঙ্গলবার জয়দেবপুর থানায় একটি মামলা হয়েছে। স্থানীয় চক্রবর্তী ফাঁড়ির এএসআই রাসেল আহম্মেদ বাদী হয়ে কয়েক হাজার অজ্ঞাতনামা উচ্ছৃংখল শ্রমিক ও সন্ত্রাসীকে আসামি করে ওই মামলাটি দায়ের করেন।

টঙ্গী (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান, গতকাল সকালে টঙ্গীর পাগার ও বিসিক এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানায় আবারো শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও ভাংচুর করে। এ ঘটনায় ওই সকল এলাকার প্রায় ১৫-২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের শর্টগানের গুলিতে ৪ নারী শ্রমিক আহত হন।

শ্রমিক, পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও কারখানা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সকাল নয়টায় পাগার অনন্ত ফ্যাশন কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করে। কর্তৃপক্ষ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করলে শ্রমিকরা পাগার ঝিনু মার্কেট এলাকার যাবের এন্ড যোবায়ের তৈরি পোশাক কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের বাইরে এসে তাদের সাথে আন্দোলনে যোগ দিতে বলে। এসময় একই এলাকায় অবস্থিত শিশির ও হামিদ গার্মেন্টসসহ প্রায় দশটি কারখানার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় যাবের এন্ড যোবায়ের ফেবব্রিকস কারখানা কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত ৪ জন শ্রমিককে কারখানায় আটক করেছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে কারখানাগুলোতে হামলা চালায়। শিল্প পুলিশ ও টঙ্গী থানা পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে শতাধিক রাউন্ড গুলি ও কাদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এসময় হামিদ ফ্যাশনের শ্রমিক সালমা আক্তার (২০), লাইজু বেগম (২৪) ও সোনালী আক্তারসহ (২০) ৪ জন গুলিতে আহত হন। সকলকে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। শ্রমিকদের নিক্ষেপ করা ইটের আঘাতে শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর সেলিম রহমান ও থানা পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক মোজাম্মেল হক আহত হন। এ সময় শ্রমিকরা পুলিশের একটি গাড়ি ভাংচুর করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here