গাইবান্ধায় চাপা আতংক সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিহত ১০, জড়িতরা গ্রেফতার হয়নি, হুমকির মুখে অনেকেই

60

gaibandhaদশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গাইবান্ধায় জনজীবনে কিছুটা স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এলেও জামায়াত-শিবিরের অব্যাহত তাণ্ডবের কারণে জনমনে এখনও চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাম্প্রতিককালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির আন্দোলনের নামে জেলায় ব্যাপক সহিংসতা চালায়। সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালানো হয় জামায়াত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত সুন্দরগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলায়। এসব ঘটনায় চার পুলিশ সদস্য ও এক সংখ্যালঘুসহ ১০ জনকে হত্যা করে জামায়াত-শিবির। ওই দুইটি থানা ঘেরাও করেও তাণ্ডব চালানো হয়। হত্যার জন্য একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীর উপর হামলা করা হয়। ওই সময় অসংখ্য নেতাকর্মীর বাড়ি-ঘর, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

তবে নির্বাচনের পর বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও সেই তাণ্ডবের ক্ষত এখনও শুকায়নি, কাটেনি জনমনে আতঙ্ক। কারণ এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে শতাধিক। কিন্তু গ্রেফতার হয়েছে মাত্র দেড় শতাধিক। অবশ্য ভোটের পর জামায়াত-শিবির মাঠে না থাকায় জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে অজানা শঙ্কায় তাদের দিন কাটছে। কারণ ওই দলের (জামায়াত-শিবির) পালের গোদারা এখনও গ্রেফতার হয় নাই। এছাড়া জামায়াত নেতারা মাঠে না থাকলেও গোপনে প্রতিপক্ষ অনেককেই তারা হত্যার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে পুলিশের দাবি পালিয়ে থাকার কারণে আসামিদের গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। এদিকে আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে জেলা জামায়াতের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ মওলানা নজরুল ইসলাম পলাশবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ায় জনমনে ও খোদ পুলিশের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ও ভুক্তভোগীরা জানান, গত কয়েক মাসের হরতাল-অবরোধে জেলায় জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তারা ১০ জনকে হত্যা করা ছাড়াও অসংখ্য মানুষকে আহত করেছে। জেলার ২০ হাজার গাছ কেটে ফেলেছে। রাস্তা কেটে ও রাস্তার উপর মাটি দিয়ে ‘বাঁধ’ তৈরি করে সৃষ্টি করেছে যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা। ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে রেল স্টেশনে আগুন দিয়েছে। ট্রেন লাইনের ফিস প্লেট তুলে ফেলায় পদ্মরাগ এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়ে ৪ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক যাত্রী। তাদের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পায়নি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাও। নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন ও পরে জেলায় ১২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর ও পোড়ানো হয়েছে। ভোটের পর পরই জেলাজুড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা চালানো হয়েছে। এতে একজন নিহতসহ ২৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সর্বশেষ গত ১৮ জানুয়ারি রাতে যৌথবাহিনী পুলিশ হত্যা মামলার আসামি ধরতে জেলার রামভদ্র খানাবাড়ী গ্রামে গেলে জামায়াত-শিবির তাদের লক্ষ্য করে ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ এবং গুলি চালায়। এতে ২৪ জন পুলিশ ও আনসার আহত হন। অবস্থা এমন যে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযানে নামলে পুলিশরাও এখন আতঙ্কে থাকেন। আর জামায়াত-শিবির নাম শুনলেই আঁতকে উঠেন এখানকার সাধারণ মানুষ।

সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর বাজারে নির্বাচনের আগে জামায়াত-শিবিরের হামলায় গুরুতর আহত হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাহারিয়া খান বিপ্লব। তিনি বলেন, ‘তারা কি পরিমাণ হিংস্র, তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। আমাকে মারধরের পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা করে। সে যাত্রাই বেঁচে যাই। এখনও আমার শরীরের ক্ষত শুকায়নি।’ জামায়াত-শিবিরের হাতে নির্যাতিত সদর উপজেলার কুপতালা ইউনিয়নের বেড়াডাঙ্গা বাজারের ননী গোপাল কর্মকার জানান, ‘ভোট দিতে যাওয়ার অপরাধে তারা আমাকে মারধর করেছে ও আমার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করেছে। তারপরও কিছু বলার নেই। কিন্তু আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে তারা এখনও হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ফলে নিজ দেশে যেন পরবাসী হয়ে পড়েছি।’ জামায়াত-শিবিরের নির্যাতনে নিহত সুন্দরগঞ্জের কে কৈ কাশদহ গ্রামের সত্যেন সেনের স্ত্রী অনিমা রানী বলেন, ‘যে যাবার সে তো চলে গেছে। আবার মামলা করে নতুন করে কোন বিপদ ডেকে নিয়ে আসব নাকি? তাই মামলা করিনি।’

পলাশবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মোকছেদ চৌধুরী বিদ্যুত্ জানান, ‘তারা (জামায়াত-শিবির) আমাকে হত্যার জন্য বাড়িতে হামলা করে। আমাকে না পেয়ে ২টি গাড়ি ও বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। তারা মূর্তিমান (জামায়াত-শিবির) এক দানব।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বাজারপাড়া গ্রামের (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হল ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি) বাসিন্দা খলিলুর রহমান মামুনকে স্থানীয় ডোমেরহাট বাজারে হত্যার পর জামায়াত-শিবির বাজারের ১০টি দোকান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই বাজারের একাধিক দোকানদার জানান, ‘এখন তারা (জামায়াত-শিবির) চুপচাপ রয়েছে। কিন্তু আমাদের মন থেকে ভয় এখনও দূর হয়নি। কখন যে আবারো তারা (জামায়াত-শিবির) হামলা করে! এই আতঙ্ক এখন তাড়া করে বেড়ায়।’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওইসব হামলার সময় পলাশবাড়ী ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা শহরে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারেনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বরং হামলার ভয়ে স্থানীয় অনেক নেতাকর্মী গা ঢাকা দিয়েছিলেন। নেতৃত্বের অভাব ও নেতাকর্মীদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয় বলে তারা জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ কর্মী বলেন, নেতৃত্বের অভাবে নেতাকর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত। অনেক নেতাকর্মী নানা তদবির নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ফলে জামায়াত-শিবিরের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তারা দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে পারেননি।

ফলে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পলাশবাড়ী শহরে বেপরোয়া হয়ে উঠে জামায়াত-শিবির। প্রতি হরতাল-অবরোধে তারা উপজেলা শহরে যানবাহন ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, গাছ কেটে অবরোধ সৃষ্টিসহ ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। গত ১০ ডিসেম্বর পলাশবাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মোকছেদ চৌধুরীর বাড়ি, তার একটি সরকারি পাজেরোসহ দুইটি গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তোফাজ্জল হোসেনের বাড়ি, সহ-সভাপতি সাইফুলার রহমানের বাড়ি, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল মতিনের ভাই কাজল মিয়ার মাছের হ্যাচারি, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি তৌহিদুল ইসলামের বাড়ি এবং উপজেলা জাসদ সভাপতি সাংবাদিক নুরুজ্জামান প্রধানের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় জামায়াত-শিবির।

পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর প্রধান বলেন, নেতৃত্বের অভাব অভিযোগটি সঠিক নয়। আশপাশের গ্রামগুলো জামায়াত অধ্যুষিত। এছাড়া ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ধরে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের সাত জেলার লোকজনকে সড়কপথে ঢাকায় যেতে হলে পলাশবাড়ীর উপর দিয়ে যেতে হয়। এসব কারণে জামায়াত-শিবির পলাশবাড়ী শহরকে আন্দোলনের মূল ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে, নির্বাচনকালীন ও পরে বিএনপি, জামায়াত ও শিবিরের সহিংসতার ঘটনায় জেলায় ৬৭টি মামলা হয়েছে। এছাড়া গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্ধ-শতাধিক মামলা হয়েছে। সূত্র জানায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা তদন্ত কেন্দ্রে পিটিয়ে চার পুলিশ হত্যাসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় গত ৮ এপ্রিল পর্যন্ত থানায় মোট ৩২টি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় আসামি করা হয় ৫৯ হাজার ৮৪৫ জনকে। এরমধ্যে এক হাজার ৩৬৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে শতাধিক।

জেলা পুলিশ সুপার জানান, জেলার পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। তবে পালিয়ে থাকার কারণে আসামিদের (জামায়াত-শিবির) গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

সহায়তা:গত ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গাইবান্ধা সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে বিএনপি-জামায়াত-শিবির সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সাথে মতবিনিময় করেন। পরে ৩ পরিবারকে দশ লাখ টাকা করে, ৬৯ জন আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত তিন প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করে অনুদানের চেক প্রদান করেন। তিনি জেলার ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেরামতের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণেরও আশ্বাস দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here