খালেদা জিয়া ও হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততা তদন্ত করা হবে—শেখ হাসিনা

33

pmসংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার বিচারের সময় সাক্ষীদের সাক্ষ্য যেহেতু বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি চলে এসেছে, তাই এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দিতে একটি তদন্ত হওয়া দরকার। আমরা তদন্ত করবো। আন্তর্জাতিকভাবেও তদন্ত করা হচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার সংসদের অনির্ধারিত আলোচনায় তিনি একথা বলেন। চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় নিয়ে এ আলোচনার সূত্রপাত করে সিনিয়র সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। এ সময় বৈঠকে সভাপতিত্বে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চাঞ্চল্যকর চট্টগ্রামের দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারসহ অন্যান্য অস্ত্র চোরাচালানের ষড়যন্ত্রের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের শাস্তি প্রদানে নতুন করে তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, কীভাবে অস্ত্র এলো, কীভাবে খালাস হলো, কারা অর্থ দিলো- এসব কিছুর তদন্ত হবে। তদন্ত করে এক এক করে সব ষড়যন্ত্রের বিচার করা হবে, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুনিদের মদদ ও আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়ার কাজ জিয়াউর রহমান, এইচএম এরশাদ ও খালেদা জিয়া করেছেন।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে সরকার ও বিরোধী দলের সিনিয়র সংসদ সদস্যরা চাঞ্চল্যকর ওই অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দায়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে বিচারের দাবি জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এ আশ্বাস দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কেউ কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাবে তা বরদাস্ত করা হবে না। বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কাউকে অন্য দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত করতে দেয়া হবে না। বাংলাদেশের মাটিকে সন্ত্রাসীদের চারণ ও লীলাভূমি হতে দেয়া হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার বিচার শেষ হয়েছে। তবে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কারা জড়িত তার তদন্ত করা যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে বিএনপি জড়িত দাবি করে তিনি বলেন, সরকারের মদদ না থাকলে এতো বিশাল অস্ত্র চোরাচালান সম্ভব নয়। এখানে গোয়েন্দা সংস্থাদের জড়ানো হয়। তিনি প্রশ্ন করেন, যারা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, তাদের এ ধরনের অপকর্মে জড়ানো হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা থাকে কোথায়? ডিজিএফআই প্রধান নিজে এই অস্ত্র চোরাচালানের বিষয়টি তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীকে জানালেও ওই সময় খালেদা জিয়া নিশ্চুপ ছিলেন। মানে মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান আমল থেকেই তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সবসময় বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করে অন্যদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতো। বিষয়টি হচ্ছে ভারত বনাম পাকিস্তান। তিনি প্রশ্ন করেন, তবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হবে কেন? বাংলাদেশকে কেন অস্ত্র পাচারের জন্য ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে দেব? তিনি দাবি করেন, এসব সুযোগ দিয়েছে বিএনপি। বগুড়ার বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, চট্টগ্রামের চকোরিয়ায় ২ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একেক করে সব তদন্ত করবো। ছাড়বো না কোনোটা। এ ধরনের বহু ঘটনার সঙ্গে বিএনপি জড়িত। সবগুলোর বিচার করা হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইতিমধ্যে পুলিশ আইজিকে নির্দেশ দিয়েছি। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক, এরা সন্ত্রাসী। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব। মুখ চেয়ে নয়, যেই জড়িত তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের নীতি। আত্মরক্ষার অধিকারও সবার আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনকারীদের ভেতরে ছাত্র শিবির অনুপ্রবেশ করে ছেলেদের রগ কাটবে, হত্যা করবে- এটাও সহ্য করা হবে না। বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জড়িত ২২ ছাত্রলীগের বিচার করেছি, কাউকে কোনো ছাড় দেইনি।

বামপন্থী কয়েকটি দলের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আপনাদের আন্দোলনের ভেতরে সুকৌশলে শিবির ক্যাডাররা প্রবেশ করে হত্যাকাণ্ড চালাবে, এ বিষয়ে আপনারা একটু সজাগ ও সতর্ক থাকুন। আমার কষ্ট লাগে, বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনের নামে শুধু সাতক্ষীরায় ১৭ এবং রাজশাহীতে ১৪ ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করলো, কিন্তু সংবাদ মাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মীরা তাদের সম্পর্কে কিছু বলে না। অসহায় পরিবারগুলোর পাশে গিয়ে কোনো কিছু বলেন না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর আগেও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ভারতের ৭টি রাজ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে তাদের ‘স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন’ বলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিলেন। বিএনপির অনেক নেতাও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিয়ে এদেশে তত্পরতা চালানোর সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি ২১ আগস্ট ভয়াল গ্রেনেড হামলার কথা তুলে ধরে বলেন, আল্লাহ নিজ হাতে আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। এই গ্রেনেড হামলার সঙ্গেও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া, তার পুত্র তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনের নাম উঠে এসেছে। এই গ্রেনেড হামলার অনেক আসামিও ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার আসামি হিসেবে শাস্তি পেয়েছে।

খালেদা জিয়ার বিচার দাবি করলেন সংসদ সদস্যরা

মাগরিবের নামাজের বিরতীর পয়েন্ট অব অর্ডারে সরকার ও বিরোধী দলের সিনিয়র সংসদ সদস্যরা দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও হাওয়া ভবনের কর্ণধার তারেক রহমানের বিচার দাবি করেন। একইসঙ্গে তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিচারেরও দাবি জানান। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বিতর্কের সূত্রপাত করেন। এই বিতর্কে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, আবদুল মান্নান, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ।

শেখ ফজলুল করিম সেলিম চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ারও বিচার দাবি করে বলেন, রাষ্ট্রের প্রধান তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জড়িত না থাকলে এতো বড় অস্ত্র চোরাচালান আনা সম্ভব হতো না। খালেদা জিয়া কোনভাবেই এর দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, এটি একটি রাজনৈতিক ঘটনা। বাংলাদেশকে ট্রানজিট করে কেউ অস্ত্র খালাস করবে- এটা তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খালেদা জিয়া অবশ্যই জানতেন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনাও জানতেন বিএনপি নেত্রী। আর মূল নায়ক ছিলেন হাওয়া ভবনের যুবরাজ তারেক রহমান।

কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, চোরাচালানকৃত অস্ত্র উদ্ধারের সময় প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না। সম্পূরক চার্জশীট হলে খালেদা জিয়ার নাম প্রধান আসামি হিসেবে আসবে।’

জাতীয় পার্টির (জাপা) কাজী ফিরোজ রশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় বিচার হলো, রায় হলো- গোটা জাতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ইঙ্গিত ছাড়া যদি এই অস্ত্র চোরাচালান না হয়ে থাকে, তবে তাকে কেন বিচারের আওতায় আনা হলো না? গোটা দেশই এখন তোষামদকারীদের দিয়ে ভর গেছে।

জাসদের মইনউদ্দীন খান বাদল বলেন, স্পর্শকাতর মামলাগুলো অগ্রগতি হয় না, তার কারণ অগ্রগতি হলেই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে দেখা যায়। উনাকে (খালেদা জিয়া) তো ‘সুপার সিটিজেন’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এই মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল- খালেদা জিয়া ও হাওয়া ভবনের রেফারেন্স।

সরকারি দলের সিনিয়র সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়। অস্ত্র উদ্ধার মামলায় কোনো সাধারণ সাক্ষী ছিলেন না, উচ্চ পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা সাক্ষী দিয়েছেন। আর সেসব সাক্ষীতে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যে এই অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত ছিলেন, তা প্রমাণ হয়েছে। খালেদা জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় এ চোরাচালান হয়েছে।

বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ছাত্রলীগ নামধারী অস্ত্রবাজদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু বহিষ্কার করে নয়, উপযুক্ত বিচার করতে হবে।

খালেদা জিয়ার ‘নীরবতা’ ছিল রহস্যজনক

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় বিচারকের পর্যবেক্ষণ

চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ে বিচারক তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নীরবতাকে রহস্যজনক বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া তিনি ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের তত্কালীন উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়ী করে বলেন, তারা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিনষ্ট করার চেষ্টা করেন।

দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় দু’টি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রস্তুত করা হয়েছে। রায় হাইকোর্টে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বেঞ্চ সহকারি ওমর ফুয়াদ গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। দু’টি রায়ের মধ্যে চোরাচালান মামলার রায় ২৬০ পৃষ্ঠা এবং অস্ত্র আটক মামলার রায় ২৫৬ পৃষ্ঠার। ওমর ফুয়াদ জানান, রায়ের অনুলিপির জন্য সকল আসামির আইনজীবী আবেদন করেছেন। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আজ বুধবার রায়ের অনুলিপি সরবরাহ করা হবে। গত ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বিশেষ আদালত-১-এর বিচারক এস এম মুজিবুর রহমানের আদালত দু’টি পৃথক মামলার রায় ঘোষণা করেন। এর মধ্যে চোরাচালান মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর ও উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়াসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া অস্ত্র আইনে দায়ের করা অপর মামলায় ওই ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

বিচারকের পর্যবেক্ষণ

রায় ঘোষণার শুরুতে চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান ৫ পৃষ্ঠার একটি পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন। এতে তিনি অস্ত্র আটকের পর তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নীরবতাকে রহস্যজনক বলে অভিহিত করেন। তিনি পরেশ বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগ রেখে বিশ্বের সর্ববৃহত্ অস্ত্র চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিনষ্টকরণের জন্য ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের তত্কালীন উচ্চপদস্থ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে দায়ী করেন। ভ্রাতৃপ্রতীম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে অব্যাহত সম্পর্ককে বিনষ্ট করার দুরভিসন্ধি নিয়েই আসামিরা উলফা নেতার সাথে হাত মিলিয়ে ছিলেন। মামলার আসামিরা দেশের গৌরবোজ্জ্বল পররাষ্ট্রনীতিকে কলঙ্কিত করেছেন বলেও বিচারক মন্তব্য করেন।

পর্যবেক্ষণের এক পর্যায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, আসামিদের বিরুদ্ধে যে সাক্ষ্য প্রমাণ আমার সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে বোধগম্য হয় যে, উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া ও অন্য আসামিদের সাথে পারস্পরিক যোগসাজশের ভিত্তিতে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ঘটনা সংঘটন করা হয়েছে। তা না হলে ডিজিএফআই’র তত্কালীন প্রধান মেজর জেনারেল সাদেক হাসান রুমি তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে গোলাবারুদ আটকের ঘটনা অবহিত করলে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ঘটনাটি অবগত আছেন এবং কমিটি করে দিবেন বলে ডিজিএফআই প্রধানকে জানান। এতো বড় ঘটনার বিষয় অবহিত হয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে তত্কালীন সরকার প্রধানের এই রূপ নীরব ভূমিকা পালন রহস্যজনক বলে প্রতীয়মান হয়।

পর্যবেক্ষণে বিচারক আরো বলেন, আমি অত্যন্ত বিস্মিত, স্তম্ভিত ও মর্মাহত যে, ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের মত দেশের দু’টি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা উল্লে¬খিত আসামিরা উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগ রেখে উলফাকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে বিশ্বের সর্ববৃহত্ অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালান আনয়নপূর্বক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহ অবস্থানের ব্যত্যয় ঘটার আশঙ্কার প্রতি উল্লে¬খিত আসামিরা কোনো গুরুত্বই দেননি।

উল্লে¬খিত কতিপয় বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তা এই মামলার ঘটনায় নিজেদের জড়িত করে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল পররাষ্ট্রনীতিকে কলঙ্কিত করে দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মরত সদস্যরা জাতিসংঘের মিশনের সদস্য হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত থেকে কোনো ক্ষেত্রে নিজের জীবন উত্সর্গ করে আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। জাতিসংঘ ও গোটা বিশ্ব তাদের এই অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। অথচ আসামিগণ দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অর্জিত সুনাম ও সুখ্যাতির প্রতি কোনরূপ ভ্রূক্ষেপ না করে মামলার ঘটনার মতো একটি বড় ধরনের অপরাধের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন যা অত্যন্ত হতাশাজনক ও দুঃখজনক। আসামি মতিউর রহমান নিজামী ও লুত্ফুজ্জামান বাবর যথাক্রমে শিল্প ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে এই বিশাল অস্ত্র মামলার ঘটনাটি সংঘটিত হয়। বিশ্বে এতোবড় অস্ত্রের মামলা আর কোন দেশে হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। এই মামলার জব্দকৃত অস্ত্র-শস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে একটি ছোটখাট ক্যান্টনমেন্ট খুব ভালোভাবে পরিচালনা করা যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তথাপি আসামি লুত্ফুজ্জামান বাবর এতোবড় একটি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত অথবা ন্যূনতম কোন ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যাপারটিকে ছলেবলে কৌশলে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন এবং তারা নিজেরাও সরকারের উচ্চপর্যায়ও ঘটনা সম্পর্কে জানে না এবং এতে সরকারের তথাকথিত ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ জড়িত রয়েছে বলে উল্লেখ করার কথা সাক্ষ্যপ্রমাণে পাওয়া গিয়েছে।

একইভাবে তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর ঘটনার প্রায় এক বছর পর ঘটনার চাক্ষুস সাক্ষী পিডাব্লিউ ৯ সাজেন্ট আলাউদ্দিন, পিডাব্লিউ ১০ সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিনকে মামলায় জড়িয়ে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছেন বলে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদেরকে এই মামলার অস্ত্র চুরি করে হেফাজতে রাখার দায়ে অভিযুক্ত করা হলেও তাদেরকে একে-৪৭ টাইপের অস্ত্র রাখার সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এই মামলার আলামতের মধ্যে একে-৪৭ টাইপের কোন অস্ত্রই ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে আনিত উক্ত অস্ত্র মামলা হাজতে থাকাকালীন তাদেরকে এই মামলার ট্রাইব্যুনালে এনে এই মামলার ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে সাক্ষ্য দেয়ার আরেকটি নজিরবিহীন ঘটনা তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন বলে সংক্ষুব্ধ পিডাব্লিউ ৯ সাজেন্ট আলাউদ্দিন, পিডাব্লিউ ১০ সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন তাদের সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন। তাদের মতো চাক্ষুস সাক্ষীদের উপর অমানুষিত নির্যাতন করার পরপরই তাদের অধীনস্থ সদস্যদের ঘটনার সাথে জড়িত না করা, ঘটনাস্থলে কয়েকজন ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া, পরিদর্শনের পর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে মিটিং করে পুলিশ কমিশনার ও ডিসি পোর্টকে স্পর্শকাতর ঘটনা বিধায় প্রকৃত ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার আশংকায় সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাত্কার প্রদান করতে নিষেধ করা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির তদন্ত রিপোর্টে এনএসআই’র সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ না করার জন্য নির্দেশ দেয়ায় ধরা যায় যে, তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর এই ঘটনার সাথে পুরোপুরি জড়িত ছিলেন।

বিচার বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ

রাষ্ট্রপক্ষের সাবেক কৌঁসুলি সাবেক মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার বর্তমান মহানগর পিপির বিরুদ্ধে বিচার বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ এনেছেন। তিনি চাঞ্চল্যকর এ মামলায় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সিভিল আদালতে বিচার করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার পর বর্তমান পিপি ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহাম্মদ আওয়ামী লীগের একটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও হাওয়া ভবনকে জড়িয়ে আপত্তিকর বক্তব্য রেখেছেন। তার এ বক্তব্য বিচার বিভাগ এবং রায়ের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি আরো বলেন, মামলায় কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার বিচার করা হয়েছে। অথচ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৯ ধারা অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিচার সামরিক আদালতেই হওয়া উচিত ছিল।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, সামরিক কর্মকর্তারা সামরিক কাজ করার দায়ে দণ্ডিত হননি। সিভিল অপরাধের জন্য তারা দণ্ডিত হয়েছেন। এছাড়া উক্ত কর্মকর্তারা অপরাধ সংঘটনের সময় সামরিক বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here