ক্ষমতাসীনদের দুর্ব্যবহারে মাঠ প্রশাসনে চাপা ক্ষোভ

12

তুচ্ছ কারণে গালমন্দ করা হচ্ছে ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসিকে *  হয়রানিমূলক বদলিসহ ওএসডি করার হুমকিতে কাজে উত্সাহে ভাটা

বিশেষ প্রতিনিধি

 

দেশের প্রায় সব জায়গাতেই প্রশাসনের ওপর ক্ষমতাসীনদের দাপট দেখানোর প্রতিযোগিতা চলছে। ঠিকাদারী নিয়ন্ত্রণ, ছোটখাট চাকরি-বাকরি, প্রকল্প গ্রহণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এমপি, মন্ত্রী এমনকি দলীয় নেতারাও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হচ্ছেন। মন্ত্রী-এমপি বা প্রভাবশালী নেতাদের কারো আত্মীয়-স্বজনকে প্রশাসন কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে না দিচ্ছে তা নিয়ে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহারের মুখে পড়তে হচ্ছে। একাধিক জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

তবে এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কারো কারো সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরকারি দলের সবার ঐকমত্য নাও হতে পারে। তবে প্রশাসনের ওপর খবরদারি বা তাদেরকে অকারণ গালমন্দ করা হলে তারা কাজে উত্সাহ হারাতে পারেন-যা সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

জানা যায়, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠনের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা, এমপি এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তেমন বনিবনা হচ্ছে না। ডিসি-এসপি, ইউএনও, ওসি ছাড়াও মাঠ পর্যায়ে থাকা অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও ঝগড়া-বিবাদে জড়াচ্ছেন ক্ষমতাসীন পক্ষ।

এ বিষয়ে কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি এবং দলীয় নেতা নাম প্রকাশ না করে ইত্তেফাককে বলেছেন, মাঠ প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। তাদের মতে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিতিয়ে আনার পিছনে প্রশাসনের ছক বা কৌশল কিংবা কসরতই একমাত্র উপায় ছিল বলে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন। এ কারণে তারা মন্ত্রী-এমপি এমনকি দলের মাঠ পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সামান্য সম্মানও করতে চাচ্ছেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে মাঠ প্রশাসনের কাজকর্মে অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে বলেও আশংকা তাদের। একাধিক মন্ত্রী-এমপি নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, প্রশাসন বিশেষ করে পুলিশ প্রায় প্রকাশ্যেই এ দাবি করছে যে, বর্তমান সরকার তাদের কৌশলের বা পরিশ্রমের ফসল। এখন তাদের কথায় চলতে হবে সবাইকে।

পক্ষান্তরে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। বর্তমান সরকার গঠনের পর সরকারের মাঠের নেতাদের কথাবার্তায় প্রকাশ পাচ্ছে যে, সবকিছু শিগগির শেষ হয়ে যাবে। যা করার এখনি করো। যা সাধারণভাবে কোনো সরকারের মেয়াদের শেষভাগে হয়। এরকম মনোভাব থেকে ঠিকাদারী, চালগম কেনা-বেচা, কাবিটা-কাবিখার ভাগাভাগি, ভূমি দখল, এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন অনেকে। এসব কাজে ক্ষেত্রবিশেষে মন্ত্রী-এমপিরাও সমর্থন যোগাচ্ছেন। এসব কাজে প্রশাসনকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছেন তারা। কিন্তু অনেক জায়গায় প্রশাসন নিয়মনীতি উপেক্ষা করে এ ধরনের কাজে সহায়তা না করায় বিরোধ বাঁধছে জনপ্রতিনিধি বা ক্ষমতাসীন মহলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে।

সমপ্রতি দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় জেলার একজন ডিসি একজন মন্ত্রীর আত্মীয় উপজেলা চেয়ারম্যানকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে যথাযথ সম্মান দেখাননি-এই অভিযোগ তুলে তাকে যথেচ্ছ ভাষায় গালি দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে ওই ডিসি প্রত্যাহারের শংকায় আছেন। ঘটনাটি সচিবালয়ে পৌঁছানোর পর সচিব থেকে শুরু করে সচিবালয়ের সব স্তরের কর্মকর্তাদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতির বাস্তবতা এমনই যে, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম এবং আইন-শৃংখলার উন্নয়ন কিংবা সুরক্ষা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতাসীনদের দাপটে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা কার্যত এখন গা-ছাড়া দিয়ে চলার নীতি গ্রহণে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঝগড়া-ফ্যাসাদ এড়িয়ে নিজেরাই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছেন।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানসম্মান নিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমলারা স্বাভাবিক কাজ করতে পারছেন না। নেতা-পাতি নেতাদের দৌরাত্ম্যে মাঠ প্রশাসনে কার্যত নাভিশ্বাস উঠেছে। কথায় কথায় হয়রানিমূলক বদলি, ওএসডি, সংযুক্তির যাঁতাকলে ফেলবার হুমকি রয়েছে তাদের মাথার ওপর।

সূত্র নিশ্চিত করেছে, অনেক সময় ক্ষমতার মূল কেন্দে র কোন কোন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়েও হুমকি-ধামকি চলছে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর। সমপ্রতি উত্তরবঙ্গীয় এক জেলার জেলা প্রশাসক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে আমলাদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধির আচরণ কেমন হবে-সেটি নির্ধারণ করে নীতিমালা জারির প্রস্তাব করেছেন। আগামী জুলাই মাসে শুরু হতে যাওয়া ডিসি সম্মেলনে তার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি করেছেন ওই জেলা প্রশাসক।

সূত্র বলছে, আমলারা যদি আইন-কানুন বিধিবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হতে না পারেন তবে প্রশাসনে বিশৃংখলা দেখা দিতে বাধ্য। আর আজ যে অবস্থা বিরাজ করছে, সেটি বিগত কুড়ি বছর ধরে চলে আসা অপশাসনের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের উত্তরাধিকার।

সুত্রঃ ইত্তেফাক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here