কী বলেছিল দুই দল ’৯৬ ও ’০১-এর তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে

11

‘সূক্ষ্ম কারচুপি নয়, এবার নির্বাচনে পুকুরচুরি করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় প্রতিপক্ষ (আওয়ামী লীগ) ইচ্ছেমতো কাজ করেছে। জনগণের রায় পরিবর্তন করা হয়েছে। বিএনপির ফল অন্যরা নিয়ে গেছে।’
১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় নির্বাচনের একদিন পর ১৪ জুন প্রথম সাংবাদিক সম্মেলন করে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে উপরোক্ত মন্তব্য করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি সংসদে শপথ গ্রহণ না করারও হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।
শুধু খালেদা জিয়াই নন, নির্বাচনের পরদিন অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের ১৩ জুন বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনে তৎকালীন দলটির মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ১১১টি আসনের ফল গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যাপক কারচুপি করে বিএনপির প্রার্থীদের হারানো হয়েছে। তিনি এসব আসনে পুনর্নির্বাচনের দাবি করেন। তিনি আরও মন্তব্য করেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিরপেক্ষ ছিল না।
একই সাংবাদিক সম্মেলনে তৎকালীন বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বর্তমানে বিকল্পধারার সভাপতি) বলেন, নির্বাচনে পূর্বপরিকল্পিত, ষড়যন্ত্রমূলক ও ইতিহাসের নজিরবিহীন কারচুপি সংঘটিত হয়েছে। জনগণ এ নির্বাচন মানে না।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনের পর খালেদা জিয়াসহ বিএনপির সকল শীর্ষ নেতাই তৎকালীন বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সোমবার সাংবাদিক সম্মেলন করে তার ঠিক উল্টো কথাটিই বললেন খালেদা জিয়া। তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজের অভিযোগ নিজেই খ-ন করে বলেন, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। উপদেষ্টারা তাঁদের নিরপেক্ষতার জন্য সকল মহলে প্রশংসিত হয়েছিলেন।’
এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই কিছু বিতর্কিত কর্মকা-ের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর হোন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ ও আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে নানা চক্রান্তের অভিযোগে নির্বাচনের আগেই নির্বাচন বয়কটেরও হুমকি দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনের একদিন পর ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ তুলে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিএনপি জোট একজোট হয়ে সিন্ডিকেট করে নীলনকশার নির্বাচন বাস্তবায়ন করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা না করে জাতির কাছে মহাঅপরাধ করেছে। তাদের মধ্যে এত শয়তানি ছিল আগে বুঝতে পারিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ ও জাতির সঙ্গে বেঈমানী করেছে। সেনাবাহিনীকে তারা ‘মিসহ্যান্ডেল’ করেছে। জনগণ এ নির্বাচন গ্রহণ করেনি, জনগণ নির্বাচনের ফল দেখে হতভম্ব হয়েছে। ফলে আমরাও নির্বাচন গ্রহণ করতে পারি না।
পরদিন ৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের এক জরুরী সভায় শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে প্রমাণসহ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করে বলেন, বিশাল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিজয় কেড়ে নেয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কারোর কাছ থেকে আমরা নিরপেক্ষ আচরণ পাইনি। যেখানে আওয়ামী লীগের ভোট ছিল, সেখানে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনে ভোট গণনা নিয়েও কারচুপি হয়েছিল। যোগ-বিয়োগ করে নির্বাচন পাল্টে ফেলা হয়েছিল। তাদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের হারিয়ে দিয়ে বিএনপি জোটকে ক্ষমতায় বসানো। জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু জনগণের সেই প্রত্যাশায় চরম আঘাত হানা হয়েছে।
শুধু বক্তৃতা-বিবৃতিই নয়, পুরো পাঁচটি বছর ধরেই আওয়ামী লীগ বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নানা অভিযোগ জাতির সামনে তুলে ধরে। একপর্যায়ে সারাদেশের মানুষের মুখে মুখে ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাম উচ্চারিত হতো ‘সালসা’ (রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ সাঈদের) সরকার বলে।
অথচ সোমবার সাংবাদিক সম্মেলন করে ১৯৯৬ সালের মতো ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও সাধুবাদ জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, এ দুটি সরকারের অধীনেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে!
এ প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ প্রস্তাব দিয়ে খালেদা জিয়া তাঁর নিজের বক্তব্য নিজেই খ-ন করেছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টাদের প্রশ্নবিদ্ধ করে তিনি বলেছিলেন, উপদেষ্টারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ খালেদা জিয়া এসব ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ উপদেষ্টাদের নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা কী ভাবে বলেন? আসলে তাঁর প্রস্তাবটি লোক দেখানো ছাড়া আর কিছুই নয়।

একতরফা নির্বাচনে ১৮ দল অংশ নেবে না: খালেদা জিয়া
একতরফা নির্বাচনে ১৮ দল অংশ নেবে না: খালেদা জিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here