২৩ মাসে ১শ’ ফুট সুড়ঙ্গ* কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংক লুটের মূল হোতা সোহেল ৫ বস্তা টাকাসহ ঢাকায় গ্রেফতার।

49

image_104843কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় সুড়ঙ্গ কেটে লুট করা ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার মধ্যে ১৬ কোটি ১৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা উদ্ধার হয়েছে। লুটের ঘটনায় জড়িত মূল হোতা হাবিবুর রহমান ওরফে সোহেল (৩৭) ও ইদ্রিস (৪০) নামে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর শ্যামপুরের বালুর মাঠের ৯ নম্বর প্লটের ‘তন্ময় ভিলা’ নামের একটি ছয়তলা ভবনের ষষ্ঠতলা থেকে ৫টি বস্তায় রাখা লুটের ওই টাকাসহ তাদের গ্রেফতার করে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট।

র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান জানান, গ্রেফতারের পর তাদের র্যাব সদর দফতরে আনা হয়। ৫টি বস্তায় কি পরিমাণ টাকা রয়েছে তা গণনা করার জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৩টি মেশিন আনা হয়। প্রাথমিকভাবে টাকার বান্ডিল ধরে গণনা করে সেখানে ১৬ কোটি ১৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা রয়েছে বলে জানা গেছে। লুট করা বাকি ২০ লাখ ৪৪ হাজার টাকার মধ্যে ৬ লাখ টাকা দিয়ে ৩০০ বস্তা চাল কিনে ফরিদপুরে আটরশির বিশ্ব জাকের মঞ্জিল-এর ওরস শরীফে পাঠিয়েছে বলে সোহেল র্যাবকে জানিয়েছে। এছাড়া কিছু টাকা পিকআপ ভ্যানের চালককে দেয়া হয়েছে। তবে ২০ লাখ ৪৪ হাজার টাকার পুরো হিসাব সোহেল র্যাবকে এখনও দিতে পারেনি।

র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জানান, ব্যাংক লুটের ৩ দিন আগে শ্যামপুরের ওই বাসাটি সোহেল সাড়ে ৮ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিল। কিশোরগঞ্জ থেকে টাকার বস্তাগুলো একটি পিকআপে করে সে ঢাকায় নিয়ে আসে। কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের পাশে তার ভাড়া করা টিনশেড বাসা থেকে টাকার বস্তাগুলো পিকআপে তুলেছিল শ্রমিকরা।

গ্রেফতারকৃত সোহেল ও ইদ্রিস এবং উদ্ধার করা টাকা নিয়ে র্যাব সদর দফতরে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান ও র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবিবুর রহমান।

র্যাবের মহাপরিচালক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, টাকা চুরির সাথে আরো কেউ জড়িত আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র্যাব নিশ্চিত হয়েছে যে, টাকা চুরির মূল পরিকল্পনাকারী হাবিবুর রহমান ওরফে সোহেল। চুরির সঙ্গে কিশোরগঞ্জের সোনালী ব্যাংক প্রধান শাখার কতিপয় কর্মচারী এবং সোহেলের মামা শ্বশুর সিরাজ জড়িত রয়েছে। চুরির সাথে বড় ধরনের কোন চক্র জড়িত কিনা তাও তদন্ত করা হচ্ছে।

র্যাব কর্মকর্তা উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরবে চুরির সাথে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে আটক করে চুরির মূল হোতা সোহেলের ব্যাপারে তথ্য পায় র্যাব।

র্যাবের একটি সূত্র জানায়, র্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে গোয়েন্দা ইউনিট দিয়ে দেশের বহু চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। জিয়াউল আহসান র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এই ইউনিটের কার্যক্রম সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন। তার নির্দেশনায় বেশ কয়েকটি বড় অভিযানে র্যাব সাফল্য অর্জন করে। এরপর অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্তির পর গতকালের অভিযানটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের টাকা লুটের ঘটনার তদন্ত শুরু হয়।

উল্লেখ্য, প্রায় একশ ফুট সুড়ঙ্গ খুঁড়ে গত শনিবার কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখার স্ট্রং রুমে ঢুকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরদিন ব্যাংকে গিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে টাকা লুটের বিষয়টি বুঝতে পারেন। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পুলিশের আট সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

এদিকে কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টাকা লুটের ঘটনা ধরা পড়ার পর ব্যাংকের ম্যানেজার, ২ জন যুগ্ম ক্যাশিয়ার, ৪ জন ক্যাশিয়ার, ৫ জন ব্যাংক গার্ড ও ১ জন ম্যাসেঞ্জারসহ ১৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আটক করে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা থানাতেই আটক ছিলেন। কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা গতকাল বিকালে জানান, আটককৃতদের জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়া গেলে তাদের ছেড়ে দেয়া হবে। গতকাল থেকে ব্যাংকের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম শুরু হয়। টাকা লুটের ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম শেখ আমানুল্লাহ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।

 

 যে ভাবে ২৩ মাসে ১শ’ ফুট সুড়ঙ্গ!

‘গত ২৩ মাস ধরে একটু একটু করে মাটি খুঁড়ে একশ’ ফুট সুড়ঙ্গ তৈরি করি। এক সময় পৌঁছে যাই অভীষ্ট লক্ষ্যে’- এ কথাগুলো বলছিলেন গ্রেফতারকৃত সোহেল। র্যাবের কাছে সোহেল তুলে ধরেন অভিযানের কাহিনী।

গ্রেফতারকৃত সোহেলের বাড়ি পটুয়াখালীতে। কিশোরগঞ্জে ফাইন ক্যাবলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সূত্র ধরে গত ১৫ বছর ধরে তার এই জেলায় বসবাস। কিশোরগঞ্জের সাদিয়া আক্তারকে বিয়ে করে ২০০৮ সালে ফাইন ক্যাবলসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে সোহেল দুবাই যান। ২০১১ সালে দুবাই থেকে ৭ লাখ টাকা নিয়ে ফিরে আসেন। এই ৭ লাখ টাকার মধ্যে ২ লাখ টাকা দিয়ে তার বাড়ির জিনিসপত্র কিনেন।

কিশোরগঞ্জের নঘুয়ায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সোহেল সপরিবারে বসবাস করতে থাকেন। তার কাছে থাকা ৫ লাখ টাকা গাজীপুরের আনোয়ার ইস্পাতের ফোরম্যান সিরাজকে দেন। সিরাজ তার সম্পর্কে মামা শ্বশুর। ব্যবসার জন্য ঐ টাকা নিয়ে পরে ফেরত দিতে টালবাহানা করেন। পরে সোহেলকে টাকা ফেরত না দিয়ে ব্যাংক ডাকাতির অভিনব কৌশল শেখায়। হাবিব সোহেল নাম ধারণ করে কিশোরগঞ্জের রথখোলায় সোনালী ব্যাংকের পাশে মৃত আমিনুল ইসলামের টিনশেড বাড়ির একটি ঘর আড়াই হাজার টাকায় ভাড়া নেন। ঐ এলাকায় তিনি কাঠের কাজ করেন বলে প্রচার করেন। বাসা ভাড়া নেয়ার ১ মাস পর সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করেন। দিনের বেলা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে রাতে তিনি নঘুয়ার বাসায় চলে যান।

দিনে যানবাহনের শব্দের কারণে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার শব্দ পাওয়া যেত না। ঐ বাসার ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতেন তার মামা শ্বশুর সিরাজ। বর্ষাকালে মাটি ধসে পড়তে পারে বলে ঐ সময় সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ বন্ধ থাকে। প্রতিদিন কোদাল, শাবল ও বেলচা দিয়ে অল্প অল্প করে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে থাকেন। অক্টোবরে কোরবানি ঈদের এক সপ্তাহ পরে খোঁড়ার কাজ শেষ করেন। ব্যাংকের বারান্দার নিচে এই সুড়ঙ্গ পথ তৈরি হয়। বারান্দার নিচে সুড়ঙ্গ পথ তৈরি হয় বলে তিনি ভয় পেয়ে যান। বারান্দার মেঝে ধসে পড়লে সে ধরা পড়তে পারে।

বারান্দা থেকে ব্যাংকের ভিতরে কিভাবে সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করা যায়- তা নিয়ে সোহেল দায়িত্ব দেন তার মামা শ্বশুরকে। মামা শ্বশুরের পরামর্শে ব্যাংকের এমএলএসএস আবু বক্করের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে সোহেল। জানার চেষ্টা করেন ব্যাংকের ভল্টটি কোথায়। তার কাছ থেকে ব্যাংকের ভল্ট থাকার তথ্য নিয়ে বারান্দার নিচ থেকে আবার সুড়ঙ্গ খোঁড়া শুরু করেন। এক পর্যায়ে ব্যাংকের ভল্ট রুমের নিচে গিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শেষ হয়। এবার ব্যাংক খোলা ও বন্ধ রাখার তথ্য নেন আবু বক্করের কাছ থেকে। এরপর মামা শ্বশুরের কাছ থেকে ভল্ট ভাঙ্গার জন্য ড্রিল মেশিন ও কাটার মেশিন নেন। সিদ্ধান্ত নেন শনিবার টাকা লুট করবে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে সোহেল ভল্ট রুমে প্রবেশ করেন। ভল্ট রুমের টেবিলে রাখা ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ৫টি বস্তায় ভরে নেন। বস্তাগুলো একেকটি করে নিজেই বহন করে ঘরে এনে রাখেন। শনিবার সকালে কিশোরগঞ্জ থেকে একটি পিকআপ ভ্যান ভাড়া করে ঢাকার শ্যামপুরে আসার জন্য। পিকআপ ভ্যানের চালককে জানান যে, ঢাকায় বাসা বদল করবে। শনিবার দুপুরে তিনি শ্যামপুরের বালুর মাঠের তন্ময় ভিলা বাড়ির ছয় তলার বাসায় আসে। রবিবার ফরিদপুরের আটরশি ওরস শরীফে ৩শ বস্তা চাল কিনে দেন। এজন্য প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ করেন এই লুট করা টাকা থেকে। এই বাসাটি বুধবার সাড়ে ৮ হাজার টাকা ভাড়ায় ঠিক করেন তি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here