কিলিং মিশনে ছিল র্যাবের ১৮ সদস্য তারেকের তত্ত্বাবধানে অপহরণের পর হত্যায় নেতৃত্ব দেন আরিফ ও রানা

28

 

আবুল খায়ের

 

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত জনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানা। আর র্যাব-১১ এর সাবেক সিও লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মাহমুদ পুরো হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তদারকি করেছেন। হত্যা মিশনে ছিল র্যাবের ১৮ জন সদস্য। এর বাইরে নূর হোসেনের দেয়া দুইজন চালকসহ পাঁচজন ছিল। রানার নেতৃত্বে ছিল র্যাবের ৮ জনের একটি টিম আর আরিফের নেতৃত্বে ছিল ১০ জনের একটি টিম। ঘটনার পরদিন সকালে অপহরণ ও হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হয় র্যাব সদর দফতর। এরপর পুরো ঘটনাটি প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে জানানো হয়। ফলে লাশ উদ্ধারের পর র্যাবের ওই তিন কর্মকর্তাকে নিজ নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠিয়ে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়।

পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে পুরো বিষয়টি বর্ণনা করেছেন আরিফ ও রানা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, র্যাব সদর দফতরকে অবহিত না করেই গোপনে এই মিশন বাস্তবায়ন করেছে র্যাব-১১। এই মিশনের জন্য এম এম রানা মাত্র ১২ লাখ টাকা পেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন আরিফ। তিনি গত এক বছর ধরে নূর হোসেনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। আর তারেক সাঈদের সঙ্গে গত ৭ এপ্রিল নূর হোসেনের পরিচয় করিয়ে দেন আরিফ। তবে তারেক সাঈদ কত টাকা পেয়েছেন তা নিশ্চিত করতে পারেননি আরিফ ও রানা। আরিফ বলেছেন, ‘৭ এপ্রিল স্যারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর নূর হোসেনই স্যারকে ম্যানেজ করেছেন। এরজন্য কত টাকার দেনদরবার হয়েছে তা নূর হোসেন বা স্যারই বলতে পারবেন। আমাদের কাছে স্যারও কিছু প্রকাশ করেননি।’

অপহরণের পর থেকে তারেক ও আরিফের মধ্যেই মোট ২৩ দফা কথোপকথন হয়। ওই সময়ের মধ্যে র্যাব সদর দফতরের কোন সিনিয়র কর্মকর্তার ফোনকল রিসিভ করেননি আরিফ।

তদন্তকারীরা জানান, ৭ এপ্রিল নূর হোসেনের সঙ্গে তারেক সাঈদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর থেকে এই হত্যা মিশন শুরু হয়। তারা দেখেছেন মোবাইল ফোনে নূর হোসেনের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো আরিফ ও রানার। এর বাইরে নূর হোসেনের বাসায় এবং অফিসেও অবাধে যাতায়াত ছিল তাদের। বিশেষ করে মেজর আরিফ ও নূর হোসেনের সখ্য পারিবারিক পর্যায়েও ছিল। তারা একে অপরের বাসায় বহুবার গেছেন। নূর হোসেনের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার পর মেজর আরিফ দ্রুত নজরুলের অবস্থান ও তাকে চেনাতে তাগাদা দেন নূর হোসেনকে।

তদন্তকারীরা জানান, র্যাব সদর দফতরকে আড়ালে রেখে কাজটি খুব দ্রুত শেষ করার জন্য আরিফ মাঝে মাঝেই নজরুলের সঠিক অবস্থান জানানোর জন্য নূর হোসেনকে চাপ দিতেন। এ কারণে নূর হোসেন এবং তার লোকজন ঢাকায় এসে নজরুলের অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য চেষ্টা করতেন। গত ১১ এপ্রিল মেজর আরিফ মোবাইলফোনে নূর হোসেনকে ২/১ দিনের মধ্যেই কাজ শেষ করার জন্য নজরুলের বাসা চিনিয়ে দিতে বলেন এবং সেই সঙ্গে তিনি নিজেই এ অপারেশন করবেন বলে জানান। দেরি হয়ে গেলে এ কাজে বাধা আসবে বলে তিনি নূর হোসেনকে অবহিত করেন।

তদন্তকারীরা জানান, গত ১৮ এপ্রিল নজরুল বাড়িতে আছে এমন তথ্য পেয়ে মেজর আরিফ তাকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে নজরুলের বাড়ির আশপাশে দুপুর থেকে অবস্থান নেন। নজরুল বাড়ি থেকে বের হয়ে ঢাকার দিকে রওয়ানা হলেই মাঝপথ থেকে তাকে অপহরণ করবেন। রাত ১২টা পর্যন্ত বাসার সামনে অবস্থানের পরও নজরুলের কোনো সাড়া-শব্দ না পাওয়ার পর নূর হোসেন আরিফকে অপেক্ষা না করে চলে যেতে বলেছিলেন। পরদিন সকাল থেকে পুনরায় মেজর আরিফ নজরুলের বাসার সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন। একইভাবে সারাদিন অপেক্ষা করে রাতে তিনি নূর হোসেনকে আশাহত হওয়ার বিষয়টি অবহিত করেন। নূর হোসেন এ সময় আরিফকে জানান, নজরুল বাড়ি থেকে চুপিসারে চলে গেছেন।

তদন্তকারীরা বলছেন, আরিফকে ঘটনার পরদিন ভোর রাতে এবং তারেককে ২৯ এপ্রিল সকালে তলব করেছিল র্যাব সদর দফতর। সেখানে প্রথমদিকে তারা অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করলেও কিছু তথ্যপ্রমাণাদি হাজিরের পর একপর্যায়ে তারা স্বীকার করেন। চারদিকে অপহরণের বিষয়টি নিয়ে হৈচৈ ও খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে যাওয়ায় তারেক মেজর আরিফকে ফোন করে অপহূতদের দ্রুত ‘ক্লিয়ার’ করার নির্দেশ দেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৭ এপ্রিল সকাল থেকেই দফায় দফায় মোবাইলে কথোপকথন হতে থাকে তারেক, রানা ও আরিফের মধ্যে। প্রতিটি মুহূর্তের চিত্র তারা একে অপরকে ফোনে অবহিত করতে থাকেন। ঐদিন আরিফের সঙ্গে তারেকের সর্বমোট ২৩ বার কথা হয়। ঐদিন নারায়ণগঞ্জ আদালতে নজরুলের হাজিরা দেয়ার কথা আছে বলে তারা জানতে পারেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আরিফ আদালত প্রাঙ্গণের বাইরে নজরুলের জন্য অবস্থান নেন। সকালে তিনি রানাকে জানান, নজরুল কোর্টের দ্বিতীয় তলায় আছেন। রানা যেন সিভিল টিম নিয়ে মুভ করেন। নজরুলের সঙ্গে ঐ সময় প্রচুর লোক থাকায় কাজটা ভালো সমন্বয়ের মাধ্যমে করতে হবে। এ সময় আরিফ আরো বলেন, বিষয়টি সিও (লে. কর্নেল তারেক) জানেন। পরবর্তীতে আরিফ পুনরায় রানাকে তাড়াতাড়ি আসার তাগাদা দিয়ে বলেন, সিও বলেছেন কোর্টের আশপাশে অপহরণ না করে সামনে অন্য কোথাও করতে। পরবর্তীতে রানা অপহরণে ব্যবহূত গাড়ির নম্বর প্লেট বদলানোর জন্য আরিফকে বলেন। আরিফ কোর্টে নজরুলের অবস্থান পুনঃনিশ্চিত করার জন্য নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসা করলে কোর্টে নজরুল নিশ্চিত আছেন বলে জানান।

তদন্তকারীদের আরিফ বলেছেন, তিনি পুনরায় রানাকে আসার জন্য তাগাদা দেন এবং বলেন, সিওকে সব বলা হয়েছে। অভিযানটি জটিল বলে রানার জরুরি সাহায্য দরকার। দুপুরে আরিফ নজরুলকে দেখতে পেয়ে আবার নূর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন নূর হোসেন জানান, নজরুলের পরনে সাদা পাঞ্জাবি। আরিফ তখন নূর হোসেনের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করেন, গাড়িতে ওঠার পর যারা নজরুলের সঙ্গে থাকবেন তাদের সবাইকেই তিনি অপহরণ করবেন। এ সময় রানা টহল কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলে তাদের শিবু মার্কেটের একটু পেছনে থাকতে বলেন। একই সঙ্গে আটজনের আরেকটি দল প্রস্তুত করার জন্য আদেশ দেন। এর একটু পরই তিনি শিবু মার্কেটে অবস্থানরত টহল পার্টিকে সাবধানে কাজ করার জন্য ও ধাক্কাধাক্কি না করার জন্য উপদেশ দেন এবং তিনিও আসছেন বলে জানান। নতুন দলটিকে পাঠানোর জন্য ক্যাম্পে কোনো গাড়ি নেই জানানো হলে রানা ওদের র্যাব পিকআপে করেই চাষাঢ়া মোড়ে পাঠাতে নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে দুপুরে রানা পুনরায় শিবু মার্কেটের দলটিকে স্টেডিয়ামের কাছে ময়লার ডিবির কাছে লিঙ্ক রোডে চেকপোস্ট বসাতে বলেন এবং আদেশ দিলে গাড়ি থামানোর কাজ শুরু হবে বলে জানান। নজরুলের গাড়ি কোর্ট থেকে বের হয়ে লিঙ্ক রোড ধরে ঢাকার দিকে রওয়ানা হলে রানা লিঙ্ক রোডের চেকপোস্ট পার্টিকে জানান, দুটি প্রাইভেট কার আসছে, একটি কালো আর তার পেছনে সাদা কার। ঢাকার দিকে যাচ্ছে এবং ৩১ সিরিয়ালের গাড়ি। চেকপোস্টে যেন গাড়ি দুটোকেই থামানো হয়। নজরুলের গাড়ির পেছনের গাড়িতে এ্যাডভোকেট চন্দন সরকার ও তার চালক বিষয়টি দেখে ফেললে তাদেরও জোরপূর্বক অন্য গাড়িতে তুলে নেয়া হয়। এ সময় রানাও টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে ছিলেন। অপহরণের পর সাতজনকে নিয়ে মেজর আরিফ দুটি মাইক্রোবাসে করে নরসিংদীর দিকে চলে যান। এ সময় আরিফ লে. কমান্ডার রানাকে নজরুল ও চন্দন সরকারের গাড়ি দুটি দ্রুত অন্য চালক দ্বারা টঙ্গীর দিকে নিয়ে যেতে বলেন। ঘটনার পরপরই নূর হোসেনকে আরিফ নিশ্চিত করেন, তার সঙ্গে অপহরণকৃত সবাই আছেন। দুপুরের দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে নরসিংদী যাওয়ার পর পুনরায় মাঝরাতের দিকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার ফেরিঘাটে ফিরে আসেন। ঐখান থেকে নৌপথে তারা কাঁচপুরে যান। সেখান থেকে লাশগুলো নৌকায় তুলে ইটের বস্তা বেঁধে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here