কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে

17

52a44c4dbbc0a-kader-mulott

 

 

 

 

রিভিউর না হলে ১৪ ডিসেম্বরের পর কার্যকর

ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুপরোয়ানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ রবিবার বিকালে লাল কাপড়ে মোড়ানো এই পরোয়ানা কারাগার ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়েছে। তাকে রিভিউর আবেদনের সুযোগ দেয়া না হলে ১৪ ডিসেম্বর পর যে কোনো মুহূর্তে ফাঁসি কার্যকর করতে পারবে জেল কর্তৃপক্ষ।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান সমন্বয়ক ও অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এম কে রহমান জানিয়েছেন—রিভিউর আবেদনের কোনো সুযোগ নেই। তবে তিনি (কাদের মোল্লা) রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ-ভিক্ষার আবেদন করতে পারবেন। জেল কোডের ৯৯১-এর বিধান অনুযায়ী প্রাণ-ভিক্ষার জন্য ৭ দিনের সময় পাবেন কাদের মোল্লা। ইতিপূর্বে কাদের মোল্লার বড় ছেলে হাসান জামিল জানিয়েছিলেন—তার বাবা প্রাণ-ভিক্ষার কোনো আবেদন করবেন না। তথাপি আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—প্রাণ-ভিক্ষার জন্য নির্ধারিত ৭ দিনের আগে ফাঁসি কার্যকর করা যাবে না। সেই হিসাবে আগামী ১৪ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটের পর যেকোনো মুহূর্তে ফাঁসি কার্যকর করা যাবে। অন্য দিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন—রিভিউর আবেদনের শুনানির সুযোগ না দিয়ে ফাঁসি দেয়া হলে তা হবে একটি ‘জুডিশিয়াল কিলিং’। দেশে ‘জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য’ এ ধরনের ‘অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক’ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত বৃহস্পতিবার কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডাদেশ-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে।

আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ রায়ের অনুলিপি ট্রাইব্যুনালে পাঠায় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রাার দফতর। ট্রাইব্যুনাল ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইজি প্রিজন, ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, কনডেম প্রিজনার (আসামি) ও রাষ্ট্র্রপক্ষকে এ অনুলিপি দেয়া হয়। আপিল বিভাগের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পরই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, সদস্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও মো. শাহিনূর ইসলাম মৃত্যুপরোয়ানা জারি করেন।

এ প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসির উদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী তাতে লেখা আছে যে, তার (কাদের মোল্লার) মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশনা রয়েছে।’

ট্রাইব্যুনালের ৩ বিচারপতির স্বাক্ষরের পর ওই নির্দেশনা দুই পৃষ্ঠার একটি পরোয়ানা খামে করে এবং ৭৯০ পৃষ্ঠার নথিসহ রায়ের কপি লাল কাপড়ে মুড়ে ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী কারাগারে নিয়ে যান। মৃত্যুপরোয়ানা পাওয়ার পরই ফাঁসি কার্যকরের কার্যক্রম শুরু করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।

প্রচলিত আইনে ফৌজদারি কার্যবিধি ও জেল কোডের বিধান অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জেল কোডের বিধান অনুযায়ী—মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ের কপি পাওয়ার পর রাস্ট্রপতির কাছে প্রাণ-ভিক্ষার জন্য আসামিকে ৭ দিনের সময় দেয়া হয়। এই সময় অতিবাহিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি যদি ফাঁসি কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ বা দণ্ড মওকুফ বা হরাস না করেন, তাহলে কারা-কর্তৃপক্ষকে ২১ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করতে হয়। কিন্তু প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও জেল কোডের বিধান যুদ্ধাপরাধের দণ্ডাদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কেননা, আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ ট্রাইব্যুনালস (আইন)-১৯৭৩ একটি বিশেষ আইন। প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ আইনের চেয়ে বিশেষ আইন প্রাধান্য পাবে। ওই আইনের ২০(৩) ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের অধীন প্রদত্ত দণ্ডাদেশ কার্যকর হইবে সরকারের আদেশাবলী অনুযায়ী।’ অর্থাত্ রাষ্ট্রপতি প্রাণ-ভিক্ষার আবেদন যে দিনই নাকচ করবেন, সেদিন থেকে যে কোনো দিন মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হবে। তিনি প্রাণ-ভিক্ষার আবেদন না করলে যে দিন রায়ের কপি জেল কর্তৃপক্ষের হস্তগত হবে, সে দিন থেকে ৭ দিন পর অর্থাত্ আগামী ১৪ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর ফাঁসি কার্যকর করা যাবে। কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আসামি-পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে—সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিভিউ পিটিশন দাখিলের সুযোগ কাদের মোল্লার রয়েছে।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদের যেকোনো আইনের বিধি-বিধানাবলী সাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যেকোনো বিধি- সাপেক্ষে আপিল বিভাগের কোনো ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে।’

১৯৮৮ সালে প্রণীত আপিল বিভাগের বিধিমালার ষষ্ঠ অধ্যায়ে রিভিউ পিটিশন দাখিলের জন্য ৩০ দিনের সময়ের কথা বলা আছে। এ প্রসঙ্গে আসামি-পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, ‘রিভিউ কাদের মোল্লার সাংবিধানিক অধিকার। এই সুপ্রিম কোর্টও সৃষ্টি হয়েছে সংবিধানের দ্বারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে এই সুপ্রিম কোর্ট সৃষ্টি হয়নি। আসামি-পক্ষের আইনজীবীরা মনে করেন—রায়ের কপি হাতে পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ পিটিশন দাখিলের সাংবিধানিক অধিকার তাদের রয়েছে। সংবিধানেও আসামির রিভিউর সুযোগ রয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই—সংবিধানের ৪৭(ক)(১) ও (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসামির রিভিউ করার সাংবিধানিক অধিকার নেই, তার পরও রিভিউর সুযোগ রয়েছে। কেননা, আপিল বিভাগের রায় ভুল না শুদ্ধ হয়েছে, তার পুনর্বিবেচনার এখতিয়ার তার বিচারকদের রয়েছে। তারা বলেন—এই প্রথম কোনো আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিল। মানবিক আইনের বিজ্ঞান ও দর্শন (জুরিসপ্রুডেন্স) হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের রায় একটি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায় না। এ কারণেই বিচারকদের তাদের রায় পুনবির্বেচনার সুযোগ দিতে হবে। সংবিধানের কোনো বিধানের বিচারকদের এই অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়নি। কিন্তু জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য সরকার রিভিউ পিটিশনের সুযোগ না দেওয়ার কূটকৌশলে লিপ্ত রয়েছে। তারা একটি পরিস্থিতি চায়, যাতে জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে জাতীয় সংসদের মেয়াদ বাড়ানো যায়।’

অন্য দিকে, আইন উপদেষ্টাসহ সরকারের আইন কর্মকর্তারা মনে করেন—যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না। সংবিধানের ৪৭ক(১)(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসামির রিভিউ আবেদন দাখিলের সুযোগ নেই। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইন প্রযোজ্য হয়, সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীন নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য হইবে না।’ (২) ‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইন প্রযোজ্য হয়, এই সংবিধানের অধীন কোনো প্রতিকারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করিবার কোনো অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।’

এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম কে রহমান বলেন, ‘কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সংবিধানে যা-কিছুই থাকুক না কেন, রিভিউ করার অধিকার তার নেই।’

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম কে রহমান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০(৩) ধারা অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর হবে। ওই ধারায় বলা রয়েছে—এই আইনের অধীন প্রদত্ত দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে সরকারের আদেশাবলি অনুযায়ী। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন-১৯৭৩ একটি বিশেষ আইন। ফলে এই আইনে কাদের মোল্লা রিভিউ আবেদন করতে পারবেন না। তবে আসামি-পক্ষ যদি রিভিউ আবেদন নিয়ে যান, তাহলে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে সর্বোচ্চ আদালত।

প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুম বলেন, ‘জেল কোডের ৯৯১ ধারা অনুযায়ী—কারা-কর্তৃপক্ষ আসামিকে জিজ্ঞাসা করবেন, তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ-ভিক্ষা চাইবেন কি না? যদি প্রাণ-ভিক্ষা চান, তাহলে দ্রুত রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত দেবেন। না চাইলে ৭ দিন পর ফাঁসি কার্যকর করতে বাধা নেই।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here