কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের গ্রহণযোগ্যতার শুনানি চলছে

27

শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকর স্থগিত থাকবে

 
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের শুনানির জন্য গৃহীত হবে কিনা সেই প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানি চলছে। আজ বৃহস্পতিবার ফের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এই শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকরের কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ দেয়া হয়েছে।

প্র্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে গতকাল এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অপর বিচারকরা হলেন বিচারপতি এসকে সিনহা, বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নিয়েছিলো জেল কর্তৃপক্ষ। প্রস্তুতির মধ্যেই মঙ্গলবার রাত ১০টা ২০ মিনিটে কাদের মোল্লার আবেদনের প্রেক্ষিতে চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রায় কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। গতকাল সকাল সাড়ে নয়টায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে ফাঁসির রায় কার্যকরের স্থগিতাদেশের ওপর ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আবেদন উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম স্থগিতাদেশ বাতিলের আবেদন করেন।

শুনানিতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রিভিউ করার জন্য অন্য মামলায় যে সুযোগ রয়েছে, সেই একই সুযোগ এই মামলায়ও আমরা পাব আশা করছি। এটা ৪০ বছরের পুরনো ঘটনার মামলা। ফলে রিভিউ পিটিশন উত্থাপনের জন্য গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিসঙ্গত সময়ের প্রয়োজন। সকলের ন্যায় আমরাও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার চাই।

এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ঠিক আছে কিন্তু এই আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে কিনা সে প্রশ্নে বক্তব্য উপস্থাপন করুন। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, আমরা দুইদিন সময় চাই, আমাদের প্রস্তুতি শেষ হয়নি। আপনারা যে আদেশ দেবেন, আমরা মেনে নেবো। দয়া করে আমাদের ২ দিন সময় দিন। জবাবে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এই মামলায় রিভিউ চলে না। এ বিষয়ে সাংবিধানিক বাধা রয়েছে। এটা তারা জানেন। তার পরেও বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

এ পর্যায়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বলুন, রিভিউর উপাদান এবং যুক্তি সম্পর্কে আমরা পরে শুনবো। গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুনানির বিষয়টিতো খুবই সংক্ষিপ্ত। আপনি একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আপনি সেটা পারবেন। ‘উই আর নট ইন হারি, কিন্তু শুরু করতে দোষ কি?’ জবাবে রাজ্জাক বলেন, আমি পারবো না। এটর্নি জেনারেল পারতে পারেন, উনি আমার চেয়েও সিনিয়র।

প্রধান বিচারপতি বলেন, এই রিভিউ আবেদনের আপনিই তো সিনিয়র অ্যাডভোকেট। আপনি পারবেন। উভয়পক্ষই পারবেন। আমরা আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা আছে কিনা তার শুনানি আগে শুরু করি। ‘লেটস স্টার্ট।’

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক পুনরায় সময়ের আবেদন করেন। এ পর্যায়ে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে আপিল বিভাগ। এ সময় আদালত জানান, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত চেম্বার বিচারপতির স্থগিতাদেশই বহাল থাকবে।

পরে বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে শুনানি শুরু হলে এটর্নি জেনারেল বলেন, সংবিধানের ৪৭ (ক) (২) অনুচ্ছেদে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির রিভিউ আবেদন করার অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, এই সংবিধানের অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।’ এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাদের মোল্লার রিভিউ করার অধিকার নেই। কারণ ১৯৭৩ সালে ট্রাইব্যুনালস আইনে বলা হয়েছে, এ আইনের অধীনে দেয়া কোনো আদেশ বা সাজা দেশের কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এই আইনটি জাতীয় সংসদ প্রণয়ন করেছে। সুতরাং সংসদে প্রণীত এ আইন অনুযায়ী রিভিউ চলবে না। কোনো প্রতিকারও চাইতে পারবে না।

জবাবে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, রিভিউ কোনো প্রতিকার নয়। এটা সাংবিধানিক ও সুপ্রিম কোর্টের রুলস অনুযায়ী আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা। সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদের যে কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোন বিধি-সাপেক্ষে আপিল বিভাগের কোন ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে।’ এখানে সুনির্দিষ্টভাবে আপিল বিভাগের ক্ষমতা বুঝানো হয়েছে। প্রতিকারের কথা বলা হয়নি। এখানে ক্ষমতা হচ্ছে অন্তর্নিহিত। এই রিভিউ আবেদন গৃহীত না হলে আদালতের অন্তনির্হিত ক্ষমতাও থাকবে না। সংবিধানের কোথাও আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার উপর হস্তক্ষেপ করা হয়নি।

এ সময় বিচারপতি এসকে সিনহা বলেন, আদালতের এ ক্ষমতা হচ্ছে শর্তযুক্ত। আর এই শর্ত আইনে (ট্রাইব্যুনাল) বেঁধে দেয়া শর্ত। আপিল আদালত কোন দণ্ড দিলে সেটা আলাদা কোন রায় নয়। এই রায় বিচারিক আদালতের রায়ের সঙ্গে যুক্ত হবে।

জবাবে ব্যারিস্টার রাজ্জাক ঢাকা ল’ রিপোর্টের ৫৬তম সংখ্যায় প্রকাশিত আপিল বিভাগের একটি রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপিল বিভাগ যতটুকু সাজা দিবে ততটুকু কার্যকর হবে। সেক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের বা ট্রাইব্যুনালের দেয়া সাজা থাকবে না। মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আপিল বিভাগ। সুতরাং আপিল বিভাগের রায় নিয়ে রিভিউ হবে। এ পর্যায়ে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, এ অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কি সংবিধানের ঊর্ধ্বে?

জবাবে রাজ্জাক বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইনে রিভিউ করা যাবে না সেটা কোথাও বলা নেই। এছাড়া সংবিধানের ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩১, ৩৫ ও ৪৪ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয় বলে উল্লেখ রয়েছে। এ তিনটি অনুচ্ছেদকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদের বিধান ১০৫ অনুচ্ছেদের ক্ষেত্রে কোন বাধা নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলেন, কোন ব্যক্তির হাজিরা কিংবা কোন দলিলপত্র উদ্ঘাটন বা দাখিল করিবার আদেশসহ আপিল বিভাগের নিকট বিচারাধীন যে কোন মামলা বা বিষয়ে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের জন্য যেরূপ প্রয়োজনীয় হইতে পারে, উক্ত বিভাগ সেইরূপ নির্দেশ, আদেশ, ডিক্রি বা রিট জারি করিতে পারিবেন। এখানে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার বলতে আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার প্রয়োগকে বুঝানো হয়েছে। আপিল বিভাগের বিধিমালায়ও রিভিউর বিধান রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আপিল বিভাগ, ট্রাইব্যুনাল দেয়নি। সুতরাং ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে রিভিউ নয়। আপিল বিভাগের রায় নিয়ে রিভিউ আবেদন গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নেই শুনানি চলে। শুনানিকালে কাদের মোল্লার পক্ষে অ্যাডভোকেট শিশির মো. মুনির, ব্যারিস্টার এমরান ই সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমিন, অ্যাডভোকেট এম তাজুল ইসলাম এবং রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এমকে রহমান, অ্যাডভোকেট মুরাদ রেজা ও অ্যাডভোকেট মমতাজউদ্দিন ফকির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রিভিউ পিটিশনের শুনানিকালে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ছাড়াও কয়েকশ আইনজীবী আপিল বিভাগে উপস্থিত ছিলেন। সাধারণত হরতাল বা অবরোধে আইনজীবীদের উপস্থিতি থাকে খুবই কম। কিন্তু এক শুনানিতে আওয়ামী পন্থী এবং বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মত।

সকালে জনাকীর্ণ এ আদালতে চলছিলো রিভিউ পিটিশনের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে শুনানি। তখন বাইরে ছিলো কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সকালেই আপিল বিভাগের এক নম্বর এজলাশের প্রবেশ দরজায় বসানো হয় আর্চওয়ে। এছাড়া প্রতিদিনের তুলনায় ছিলো অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন। শুনানির শুরুতেই প্রধান বিচারপতি উপস্থিত আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে কোন ধরনের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস থাকলে তা ব্যবহার না করার বিষয়ে সকলকে সতর্ক করে দেন। শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবন প্রাঙ্গণে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা সরকার বিরোধী নানা শ্লোগান দেন।

এটর্নি জেনারেলের ব্রিফ্রিং

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্যই সংবিধানে প্রথম সংশোধনী আনা হয়েছিলো। তাই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পরেও আসামিদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয়। তবে সেগুলো উচ্চ আদালত খারিজ করে দিয়েছে।

অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোন উপায় নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here