এখনো বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যার কারণ খুঁজছেন রামি পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবসে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

87

জনতার নিউজ

এখনো বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যার কারণ খুঁজছেন রামি

কবর জিয়ারত ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর ১৭ বছরের কিশোর তাহসিন রহমান রামি বলেন, ‘ঘটনার দিন বাবার সঙ্গে সকালে নাশতা করেছিলাম। এরপর তিনি বের হয়ে যান, আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি।’ রামির বাবা মেজর মিজানুর রহমান সেদিন বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) বিপথগামী জওয়ানদের হাতে নিহত হন। এর নয় মাস আগে রামির মা রেবেকা ফারহানা ব্রেন টিউমারে মারা যান। বাবা-মা হারানো রামি ও তার ছোট ভাই ফারদিন রহমান সামি নানা অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠছে। রামি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পড়ালেখা করছে। আর ১১ বছরের সামি গুলশানে নানার বাসায় থাকে। সে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র।

রামি বলেন, ‘আট বছর পরও আমরা জানি না কেন এ হত্যাকান্ড। এটা জানার অধিকার কি আমাদের নেই? একজন মানুষ তো এমনি এমনি শহীদ হয় না? এর পেছনে কোনো একটা কারণ থাকে। কিন্তু কেউ আমাদের এ প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।’  রামি ও সামির সঙ্গে গতকাল শনিবার বনানী সামরিক কবরস্থানে আসেন তাদের দাদি কোহিনূর বেগম। সেখানে তিনি ছেলের  কবরের সামনে বসে ছিলেন বেশ কিছুটা সময়। কাঁদলেন, দোয়া করলেন; তারপর ধীর পায়ে হাঁটতে লাগলেন প্রধান ফটকের দিকে। কাছে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতেই তার কান্নার যেন বাঁধ ভেঙে গেলো। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, ‘আমি এক দুঃখিনী মা, ৮ বছর ধরে বুকে কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছি। ৮ বছর আগে আমার নিষ্পাপ, নির্দোষ ছেলেকে ওরা মেরে ফেলেছে।’

পিলখানায় নিহত মেজর মোমিনুল ইসলাম সরকারের ছেলে সাদাকাত সাবরি বিন মোমিন এসেছিল বাবার কবরে শ্রদ্ধা জানাতে, যে বাবাকে সে কখনও দেখেনি। তার মা সোনিয়া আক্তার জানান, মোমিনুলের মৃত্যুর ১১ দিন পর জন্ম নেয় সাদাকাত। সে সবসময় তার বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু বাবার কিছু ছবি ছাড়া আর কিছুই তার জন্য নেই। বনানীর সামরিক কবরস্থানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। তার মতো স্বজন হারানো আরও অনেক মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন দুঃখ ভারাক্রান্ত হূদয় নিয়ে। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় নির্মম হত্যাযজ্ঞে তারা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন।

পিলখানা ট্র্যাজেডিতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। আট বছর আগের মর্মন্তুদ এ ঘটনার বার্ষিকীতে গতকাল সকালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের কবরে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এছাড়াও শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, বিজিবি প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।

পিলখানা ট্র্যাজেডিতে নিহত লে. কর্নেল গোলাম কিবরিয়ার ভাই জাফর উল্লাহ বলেন, ‘আট বছর ধরে বুকে চাপা কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছি। সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। আর সেই সাজা যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। সরকার খুঁজে বের করুক হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যের ইন্ধনদাতা কারা ছিল-এটাই আমাদের চাওয়া।’

কর্নেল কুদরত-ই-এলাহীর বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মানুষের বিচারে হয়ত প্রকৃত অপরাধীর সাজা না-ও হতে পারে। আমি তাই আল্লাহর কাছে এর বিচার চাই। আর কারো কাছে বিচার চাই না।’ তিনি জানান, তার একমাত্র নাতি সাকিব রহমান এখন নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক।

অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে থাকা মেজর ইউসুফ ইকবাল এসেছিলেন পিলখানায় নিহত ভাই মেজর ইদ্রিস ইকবালের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে। তিনি বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার কিছু এখনও বাকি আছে। সেটা দ্রুত শেষ হওয়ার পর প্রচলিত আইনে দোষীদের বিচার কার্যকর হলেই তিনি সন্তুষ্ট হবেন। নিহত ভাইয়ের তিন সন্তানের জন্য তিনি দোয়া চান।

গতকাল পিলখানায় নিহতদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন বীরবিক্রম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমেদ, বিমানবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, স্বরাষ্ট্র সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহম্মেদ, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন প্রমুখ। এছাড়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও শ্রদ্ধা জানান।

পিলখানায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, পিলখানা হত্যাযজ্ঞে জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের ব্যাপারে যত দূর সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, পিলখানা হত্যাকান্ডের রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। কে বা কারা এর মূল পরিকল্পনাকারী? কাদের অর্থায়নে জওয়ানরা বিপথগামী হয়েছিল তা প্রকাশ করা হয়নি। তিনি এ ঘটনার ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের দাবিও জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here