একে অপরকে দুষছেন তিন র্যাব কর্মকর্তা গ্রেফতারের পর মাসুদ রানাও রিমান্ডে

15

Rab 3রিমান্ডে থাকা সামরিক বাহিনীর চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর আরিফ হোসেন দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী করেছেন অপর চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা র্যাবের নারায়ণগঞ্জের ক্যাম্প প্রধান লে. কমান্ডার এম এম রানাকে। আর রানা গতকাল রবিবার আদালতে বলেছেন, ‘অপহরণের স্থান ও যেখান থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছে এর কোনটিই আমার এলাকা নয়। এই এলাকার দায়িত্বে ছিলেন মেজর আরিফ হোসেন।’ ফলে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় কার? তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলিতে জড়িয়ে পড়েছেন র্যাবের সাবেক এই তিন কর্মকর্তা।

র্যাব-১১ এর সাবেক কমান্ডিং অফিসার তারেক সাঈদ মাহমুদ ও আরিফ হোসেনকে গতকাল ৫ দিনের রিমান্ডের প্রথমদিন নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা। জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিনে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোন জিজ্ঞাসাবাদই করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, প্রথম দিন তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

রানা ৭ দিনের রিমান্ডে

এদিকে র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা এম এম রানাকে গতকাল ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল বিকালে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে তুমুল হৈ চৈ ও বাইরে আইনজীবীদের চরম বিক্ষোভের মধ্যে এই রিমান্ড শুনানি হয়। একই আদালতে সেভেন মার্ডারের ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে গ্রেপ্তারকৃত মহিবুল্লাহ রতন নামের একজনকেও ৪ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। রিমান্ড শেষে নেয়ার সময়ে রানাকে লক্ষ্য করে অশালীন গালিগালাজ করেন বিক্ষুব্ধ আইনজীবী ও বিভিন্ন সময়ে অপহূত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা। তবে এদিন রানাকে আগে থেকেই হ্যান্ডকাফ পরিয়ে আদালতে আনা হয়।

এর আগে শনিবার রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থেকে রানাকে গ্রেফতার করে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রানাকে গ্রেফতারের পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাকে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরে পুলিশ লাইনে নেয়া হয়। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে মাথায় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে তাকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে জনাকীর্ণ আদালতে রিমান্ড শুনানি হয়। তখন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মামুনুর রশিদ মন্ডল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এম এম রানাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিকাল ৫টায় রানাকে আবারো কঠোর নিরাপত্তায় পুলিশ লাইনে নেয়া হয়।

তারেক সাঈদ মাহমুদ ও আরিফ হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদকারী একজন কর্মকর্তা জানান, প্রথম দিন জিজ্ঞাসাবাদে বেশ স্বাভাবিক ছিলেন তারা। মেজর আরিফ তেমন কোন কথাই বলেননি। তবে লে. কর্নেল তারেক তাদের ব্যর্থতার জন্য দুষছেন লে. কমান্ডার রানাকে। তিনি বলেছেন, এলাকাটি রানার। ওই এলাকার ক্যাম্প কমান্ডার রানা। ফলে ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল তার। সে কেন ব্যবস্থা নেয়নি তা সেই ভালো বলতে পারবে। তবে সাবেক কমান্ডিং অফিসারের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রানা। তার দাবি এলাকা তার নয়। এলাকা মেজর আরিফের। আজ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীদের একজন।

এদিকে গতকাল আদালতে হাজির করার পর রানা বেশ স্বাভাবিক ছিলেন। অপর দুইজনের মত রানাও নিজেকে একেবারে নির্দোষ দাবি করে নিজের পক্ষে বক্তব্য রাখেন আদালতে। আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় আইনজীবীরা ঘোষণা দিয়েছিল ৭ খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষে কোন আইনী সহায়তা দেবেন না। তাই ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল রানাকে আদালতে হাজির করা হলেও শুনানির সময়ে তার পক্ষে কোন আইনজীবী ছিলেন না।

আদালতে রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘ঘটনাস্থল (যেখান থেকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে) ও যেখান থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছে তার কোনটিই আমার এলাকা নয়। পাশাপাশি ঘটনার দিন আমি নারায়ণগঞ্জেই ছিলাম না। তাই এই ঘটনার কিছুই আমি জানি না।’ তবে তার ১০ দিন রিমান্ডের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন আইনজীবীরা। পরে ৭ দিন রিমান্ড দেন আদালত।

গতকাল বিকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, মামলাটি সুষ্ঠুভাবেই তদন্ত চলছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য যাকে প্রয়োজন তাকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে হাইকোর্টের আদেশ পালন করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ

এদিকে নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সেভেন মার্ডারের ঘটনায় র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে কেন গ্রেফতার দেখানো হয়নি তা জানতে চেয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন আদালত। আগামী ৪ দিনের মধ্যে এই শোকজের জবাব দিতে বলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক কে এম মহিউদ্দিন এই আদেশ দেন বলে জানান আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে একসঙ্গে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহূত হন। পরে ৩০ এপ্রিল বিকালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দু’টি করে বস্তায় বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র্যাব-১১ এর তিন জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন। এরপর থেকে নূর হোসেন পলাতক রয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here