একুশে গ্রন্থমেলা শুরু কাল, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

12

21মহান একুশে চেতনালালিত মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হচ্ছে কাল। বিকাল ৩টায় মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধন শেষে গ্রন্থমেলা পরিদর্শন করবেন তিনি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি প্রফেসর এমিরিটাস আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুকাভিনয় শিল্পী ও প্রবাসী বাঙালি পার্থ প্রতিম মজুমদারকে এ অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করা হবে। এবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১৩ বিজয়ীদের হাতে তুলে দেবেন।

এবারের গ্রন্থমেলাকে ভাষাসংগ্রামী, লেখক-গবেষক, বাংলা একাডেমির ফেলো, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সদ্যপ্রয়াত মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে উর্ত্সগ করা হয়েছে।

লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের দীর্ঘ দিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার মেলার পরিসর বাড়িয়ে বাংলা একাডেমি চত্বরের পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটা বড় অংশকে যুক্ত করা হয়েছে। মেলার এ সম্প্রসারণ ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন পুলিশ, র্যাব, আনসার ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।

গ্রন্থমেলা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সেমিনার। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমকালীন প্রসঙ্গ এবং বিস্মৃতপ্রায় বিশিষ্ট বাঙালি মনীষার জীবন ও কর্ম নিয়ে হবে এ আলোচনা। এ ছাড়া, মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৪ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। শিশুদের জন্য মাসব্যাপী এ মেলায় এবার ৪ দিন শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হবে।

আজ শুক্রবার বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান—একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। এ সময় বক্তব্য দেন একাডেমির সচিব আলতাফ হোসেন, মেলা কমিটির সদস্য সচিব ও একাডেমির পরিচালক শাহিদা খাতুন এবং একাডেমির মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ।

শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাঙালির বৃহত্তম জাতীয় উত্সবে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে সৃজনশীলতার একটি স্থান হিসেবেও দাঁড়িয়ে গেছে এ মেলা। তাই বিশ্বের দীর্ঘতম এই বইমেলার পরিসর বাড়ানো সময়ের দাবি হয়ে উঠেছিল বলেই এবার মেলাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।’ এ সময় তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে এই মেলা সুন্দর ও সফল করতে সহযোগিতার আহ্বানও জানান।

শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বর্ধিত স্থানে থাকবে প্রকাশক সমিতি ও পরিবেশক সমিতির সদস্যদের স্টল। আর সরকারি, শায়ত্বশাসিত, মিডিয়া, ব্যাংক এবং লিটল ম্যাগ ও শিশুতোষ প্রকাশনার স্টলসমূহ থাকবে বাংলা একাডেমি চত্বরে। সেই সঙ্গে একাডেমি চত্বরের অভ্যন্তরে সম্ভব হলে এবার থেকেই শিল্পকর্ম প্রদর্শনীসহ লেখক-পাঠকের আড্ডার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আগামীবার থেকে এই গ্রন্থমেলার মাসে একাডেমি চত্বরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে সাহিত্য সম্মেলন, ফোকলোর উত্সব, নাট্য উত্সব বা অন্য যে কোনো আয়োজন যুক্ত থাকবে।’

শাহিদা খাতুন জানান, ‘গ্রন্থমেলায় মোট ২৯৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৫৩৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে ২৩২টি মূল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৪৩২টি ইউনিট, বাংলা একাডেমির অভ্যন্তরীণ অংশে ২৪টি শিশু-কিশোর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৩৩টি ইউনিট এবং সরকারি, শায়ত্বশাসিত, ব্যাংক, মিডিয়া এবং অন্য ৪৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৯টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এবার উন্মুক্তসহ ৫৫টি লিটল ম্যাগাজিনকে লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে জায়গা দেয়া হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন কর্নারটির লিটলম্যাগ আন্দোলনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব কবি প্রয়াত খোন্দকার আশরাফ হোসেনের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যারা বই প্রকাশ করেছেন, তারা বই বিক্রি ও প্রদর্শনের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে রাখতে পারবেন।

১৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ১ ইউনিট, ১০৮টি প্রতিষ্ঠানকে ২ ইউনিট, ৪৭টি প্রতিষ্ঠানকে ৩ ইউনিট এবং ১১টি প্রতিষ্ঠানকে ৪ ইউনিট করে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই ৩০ শতাংশ এবং অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি করবে। এবারের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ৬৫টি নতুন বই পাওয়া যাবে।

আলতাফ হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য বারের মতো এবারো গ্রন্থমেলার প্রবেশপথে আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাডেমির নিরাপত্তাকর্মীরা। পাশাপাশি, নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলাপ্রাঙ্গণে থাকবে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা। গ্রন্থমেলা থাকবে সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত।’

মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্তৃপক্ষ গ্রন্থমেলায় তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এবার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, তথ্য কেন্দ্রের সর্বশেষ খবরাখবর এবং মেলার মূল মঞ্চের সেমিনার প্রচারের ব্যবস্থা করবে।

এ ছাড়া, মেলা প্রাঙ্গণ থেকে চ্যানেল আই, বাংলাভিশন, গাজী টিভি, সময় টেলিভিশন, এস এ টিভি, চ্যানেল ৭১ মেলার তথ্যাদি প্রতিদিন সরাসরি সম্প্রচার করবে। এফ এম রেডিওগুলোও মেলার তথ্য প্রচার করবে। গ্রন্থমেলার খবরাখবর নিয়ে প্রতিদিন বেশ কয়েকটি বুলেটিন প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিদিন মেলার তথ্য প্রচার করবে। গ্রন্থমেলার প্রচারকার্যক্রমের জন্য তথ্যকেন্দ্র থাকবে বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে। সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য আদান-প্রদানের সুবিধার্থে মিডিয়া সেন্টার থাকবে তথ্যকেন্দ্রের উত্তর পার্শ্বে।

গ্রন্থমেলার সম্পূর্ণ প্রাঙ্গণকে ভাষাশহীদ চত্বর (সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত ও শফিউর) ছাড়াও রবীন্দ্র, নজরুল, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সোমেন চন্দ, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত্ হোসেন, সুফিয়া কামাল, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে স্বীকৃতি লাভের অন্যতম প্রস্তাবক প্রয়াত রফিকুল ইসলাম চত্বরে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০১৩ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং সর্বাধিক-সংখ্যক মানসম্মত বই প্রকাশের জন্য শ্রেষ্ঠ তিনটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here