উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যার ঘটনায় মামলা, আটক ২৩ ফুলগাজীতে আজ হরতাল

14

 

ফেনীর ফুলগাজীতে উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক একরামকে গুলি করে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে নিহতের ছোট ভাই রেজাউল হক সেলিম বাদি হয়ে ফেনী মডেল থানায় মামলাটি করেন। নির্বাচনে একরামের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনারসহ মামলায় ৩৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ গতকাল বুধবার ভোর পর্যন্ত এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ২৩ জনকে আটক করেছে। এছাড়া ঘটনাস্থলের কয়েকশ’ গজ দূরে বিরিঞ্চি গ্রাম থেকে পরিত্যক্ত একটি লাল প্রাইভেটকার ও ১টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে।

এর আগে মঙ্গলবার সকালে ফেনীর জিএ একাডেমি রোডের বিলাসী সিনেমা হলের সামনে দুর্বৃত্তরা গাড়িতে হামলা চালিয়ে গুলি করে ও গাড়িসহ পুড়িয়ে একরামকে হত্যা করে। ফেনী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুব মোর্শেদ মামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ফেনীর পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ জানান, ঘটনাটি নিঃসন্দেহে পূর্বপরিকল্পিত এবং ঠাণ্ডা মাথায় ঘটানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হবে। হত্যাকারীদের গ্রেফতারের জন্য ফেনী জেলায় জোর পুলিশি অভিযান চলছে বলে তিনি জানান।

প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশকে জানিয়েছে- ‘এই কার এবং মোটরসাইকেলে করে কিছু বহিরাগত ও স্থানীয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।’ প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলটির মালিক কে এবং কিভাবে সেগুলো সেখানে গেল তা জানতে পুলিশ জোর তদন্ত চালাচ্ছে।

এটি রাজনৈতিক হত্যা, দাবি ভাইয়ের:মামলার বাদি ও নিহতের ছোট ভাই রেজাউল হক সেলিম বলেন, এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং উদ্দেশ্যমূলক। তিনি বলেন, তার ভাইকে সবসময় তিনি সাবধান করতেন- স্থানীয় সন্ত্রাসীরা যেকোন সময় তার উপর হামলা চালাতে পারে বা তাকে হত্যা করতে পারে। তিনি অবিলম্বে ভাইয়ের হত্যাকারীদের গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান।

জানাজা ও দাফন:গতকাল সকাল ৯টায় নিহত উপজেলা চেয়ারম্যান একরামের প্রথম নামাজে জানাজা স্থানীয় মিজান ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়। এখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, হাজী রহিম উল্যাহ, আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি আব্দুর রহমান বিকম, ফেনী জেলা পরিষদের প্রশাসক আজিজ আহম্মদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন নাসিমসহ আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলা নেতৃবৃন্দসহ কয়েক হাজার জনতা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শুরুর পূর্বে নেতৃবৃন্দ নিহত উপজেলা চেয়ারম্যানের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।

পরে ফুলগাজী পাইলট হাইস্কুল মাঠে একরামের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, একরামকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। তিনি হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। এসময় ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য শিরিন আক্তারসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। সর্বশেষ মরহুমের আনন্দপুর গ্রামের বাড়ির সামনে তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পিতার কবরের পাশে একরামকে সমাহিত করা হয়।

বিক্ষোভ-ভাংচুর:এদিকে নিহত উপজেলা চেয়ারম্যানের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মীসহ উত্তেজিত জনতা এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের ফাঁসি দাবি করে বিক্ষোভ করে। তারা আনন্দপুর বেইলী ব্রীজের লোহার পাটাতন তুলে নদীতে ফেলে দেয়। এতে ফেনীর সাথে ফুলগাজী ও পরশুরামের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এসময় কয়েকটি গাড়িও ভাংচুর করে জনতা।

ফুলগাজীতে আজ আওয়ামী লীগের হরতাল: পরশুরাম সংবাদদাতা জানান, উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার ফুলগাজী উপজেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। গতকাল বুধবার বিকেলে দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপজেলা আওয়ামী লীগের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলীম হরতালের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরো জানান, পরদিন শুক্রবার সকালে দোয়া মাহফিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে।

নানা আলোচনা:এদিকে চেয়ারম্যান একরামুল হকের নির্মম ও পৈশাচিক হত্যার ঘটনা নিয়ে গত দুই দিন ফেনীতে নানা ধরনের আলোচনা চলছে। স্থানীয় সূত্রমতে, হত্যার ঘটনার আগে থেকে ৪০-৫০ জন সন্ত্রাসী শহরের একাডেমি এলাকার বিলাসী সিনেমা হলের সামনে জড়ো হয়। হত্যাকাণ্ডের পর তারা পূুর্ব দিকের সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক দিয়ে ভাগ হয়ে দ্রুত চলে যায়। আওয়ামী লীগ বিগত উপজেলা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনারের ওপর এ হত্যাকাণ্ডের দায় চাপাতে চাইছে। অপরদিকে কেন্দ্রীয় বিএনপি এবং জেলা বিএনপি এ হত্যার ঘটনাকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বহি:প্রকাশ হিসাবে উল্লেখ করছে।

স্থানীয় লোকজনের মতে, যে স্থানে এ নির্মম হত্যার ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে সেটি আওয়ামী লীগ দলীয় একজন প্রভাবশালী পৌর কাউন্সিলরের এলাকা। একরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছাড়াও একজন বড় ঠিকাদার ছিলেন। বালুমহাল ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ফেনী ডায়াবেটিক সমিতির কর্তৃত্ব নিয়ে মাঝে মাঝে জেলার অন্য নেতাদের সাথে তার মন কষাকষির ঘটনাও ঘটেছে। তবে দলের অভ্যন্তরে কোন ধরনের কোন্দল নেই বলে দাবি করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী। তদন্তে যারাই চিহ্নিত হোক তাদের কোন ছাড় দেয়া হবে না বলে তিনি জানান।

উপজেলা পরিষদ ফাউন্ডেশনের নিন্দা

‘উপজেলা পরিষদ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ’ ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হকের হত্যাকাণ্ডে তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়েছে। গতকাল বুধবার সংগঠনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করার পথে অন্তরায়। আমরা অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে সই করেন সংগঠনের আহবায়ক মো. আতাউর রহমান আতা, নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খান হিরু, সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান মো. কফিলউদ্দিন, রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাঈদ চাঁদ প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here