আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেট পেশ অর্থমন্ত্রীর

12

 

২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এটি তার ৮ম বারের মতো বাজেট পেশ হচ্ছে। জাতীয় সংসদে স্পিকারের উপস্থিতিতে এ বাজেট ঘোষণা করলেন তিনি। এবারের ৪৪তম বাজেটের আকার হবে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে অর্থমন্ত্রী এ বাজেট পেশ শুরু করেন।

এর আগে সংসদে উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট।

আজ দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সংসদের কেবিনেট কক্ষে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক বসে। পৌনে ২ ঘণ্টার এই সভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা অংশ নেন।

বাজেট বক্তৃতায় সম্ভাবনাময় আগামীর পথ নির্দেশনা দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রী আজ উপস্থাপন করলেন তার জীবনের অষ্টম ও বর্তমান মেয়াদে শুরু হওয়া সরকারের প্রথম বাজেট। এবারও তিনি শোনালেন সম্ভাবনার কথা।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস আগামী অর্থবছরের প্রাস্তাবিত বাজেট আমাদের করণীয় কাজগুলো সম্পন্ন করার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশ হিসেবে কাজ করবে। আমি কর্মব্যস্ত আশি বছর অতিক্রম করেছি। অর্জন ও ব্যর্থতার দোলাচলে আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে আমি কখনো আশাবাদ ব্যক্ত করতে এবং রাখতে কার্পণ্য করিনি। আমি আগেও বলেছি যে কালো মেঘের আড়ালে আমি সোনালি রেখা দেখতে পাই। বাংলাদেশের অপরিমেয় সম্ভাবনায় এ দেশের তরুণদের মতো আমিও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। অর্থনীতির চালিকা শক্তি হবে উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি আর উচ্চতর প্রবৃদ্ধি।’

‘অগ্রগতির ধারাবাহিকতা সম্ভাবনাময় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী যেমন আগামীর পথ নির্দেশনা দিলেন তেমনি অর্থনীতির স্বার্থে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকেও গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

প্রারম্ভিক বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতহািসে এই প্রথমবার একটি নির্বাচিত সরকার পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন শেষে আবার পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছে। জনগণের এ রায় আমাদের সরকারের ওপর তাদের বিপুল আস্থারই এক অনন্য নজির। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন।’

মুহিত বলেন, ‘অত্যন্ত দুখের বিষয় যে, একটি বড় রানৈতিক দল এই নির্বাচনকে অহেতুক বয়কট করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার চেষ্টা করে। আমরা মনে করি—সরকারে এ ধারাবাহিকতা দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে উচ্চতর এক সোপানে নিয়ে যাবে।’

বাজেট বক্তৃতার শুরুতে অর্থমন্ত্রী বিনম্র চিত্তে স্মরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্বরণ করেন মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-বিরোধী অগণতান্ত্রিক উগ্র সাম্প্র্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির হাতে অগণিত শহীদদের স্বরণ করে বলেন, ‘এই আত্মত্যাগ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পথে আমাদের অগ্রযাত্রায় চিরন্তন অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে থাকবে।’

মুহিত বলেন, ‘রূপকল্প ২০২১ কে সামনে রেখে ২০০৯ সালে উন্নয়নের যে অভিযাত্রা শুরু করেছিলাম এ মেয়াদেও তা অব্যাহত থাকবে। গত মেয়াদে আমাদের মুল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুদৃঢ় ভিত রচনা করা। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত মেয়াদের শেষ দিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা দেশের অর্থনীতিকে অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৪৫ দিন হরতাল পালন করা হয়েছে। এবারের হরতাল-অবরোধ ১২ বা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, কোনো কোনো সময়ে এর কার্যকাল ছিল সপ্তাহ ব্যাপী। এর ফলে যোগযোগ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কেনা-বেচা নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোঠায় আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের ওপর। এবারের হরতাল-অবরোধের আরেটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের মহোত্সব।’

অর্থমন্ত্রী দাবী করেন, ‘নির্বাচনোত্তর সময়ে অর্থনীতি অতি দ্রুত তার গতি ফিরে পেয়েছে।’

গত মেয়াদে অর্জনের ফিরিস্তি তুলে ধরে বলেন, ‘সরকারের অন্যতম প্রধান সাফল্য হলো দক্ষতার সাথে বিশ্ব মন্দার অভিঘাত মোকাবিলা করা। অন্য দিকে, জাতির পিতা ও তার পরিবারবর্গের হত্যার বািরের রায় কার্যকর, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ সম্পন্নকরণ এবং একজনের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। সেই সাথে জীবনমান উন্নয়ন, জ্বালানি খাতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য।’

বিভিন্ন খাতে সাফল্য উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ‘এ মেয়াদে আমাদের আর্থ-সামাজিক অর্জনকে সুসংহত করতে চাই এবং পূর্বমেয়াদে গৃহীত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে দ্রুত অগ্রসর হতে চাই। রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সকল স্তরে জনগরেণর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই। এ লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ আমাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। সর্বস্তরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে অধিকতর শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পণা গ্রহণ করা হবে।’

অর্থমন্ত্রী দাবী করেন, ‘চলতি অর্থবছরের শুরুতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.২ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও ধারাবাহিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চলতে থাকায় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। তবে আগামী অর্থবছরে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন। সর্বোপরি অনুকূল আবহাওয়া ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। অন্য দিকে, রপ্তানি ও আমদানি ব্যয় দুটোই প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।’

মুহিত বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে—বর্তমানে অনুসৃত রাজস্ব ও মুদ্রা নীতি-কৌশলের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। সেই সাথে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমকে আরো জোরদার করা হবে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা অভিঘাতে আমাদের এগিয়ে চলার পথ নির্বিঘ্ন ছিল না। তা সত্ত্বেও আমরা জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রত্যয় থেকে কখনো সরে দাঁড়াইনি। আমাদের উচ্চাভিলাসী কার্যক্রম এবং অর্থায়ন পরিকল্পনা উচ্চাভিলাসী কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি যে, উচ্চাভিলাসী কার্যক্রম আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি। সংশোধিত বাজেটের ৬৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অপরিমেয় সম্ভাবনার স্বার্থে আমরা চাই একটি অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র। বাংলাদেশের জনগণও প্রতিটি কঠিন সময়ে এই আদর্শে বিশ্বাস রেখে এগিয়ে গেছে এবং সাফল্য অর্জন করেছে। এবারো তার কোনো হেরফের হবে বলে আমি মনে করি না। সেই বিশ্বাসে অটুট রেখে আমি আহ্বান জানাব—আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়ন এবং মঙ্গলের স্বার্থে সব রকম সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে। প্রতিবাদ ও সমালোচনা অবশ্যই হবে, কিন্তু সে জন্য কোনো সহিংস পথ অবলম্বন করা চলবে না। একটি জাগ্রত ও উদ্বুদ্ধ জাতি কোনো মতেই হত্যা এবং ভাঙচুরের রাস্তা সহ্য করবে না।’

মুহিত বলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক এ দেশের মাটি আর মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবসার উত্তরাধিকারী। এসই উত্তরাধিকারের শক্তি নিয়ে দৃঢ় চিত্তে বলতে চাই—বরাবরের মতো জনগণের সুখে-দুঃখে আমরা তাদের পাশে থাকব। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সকল অপতত্পরতা নস্যাত্ করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাব এক সম্ভাবনাময় আগামীর পথে। উত্তর প্রজন্মের জন্য রেখে যাব এমন এক দেশ, যেখানে থাকবে না দরিরদ্র আর বৈষম্য, অনৈক্যের অপছায়া, আর অপশাসনের নিষ্পেষণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here