আরিফ-রানার নেতৃত্বে হত্যা

17

আদালতে সাবেক র্যাব কর্মকর্তা রানার স্বীকারোক্তি

আবুল খায়ের ও হাবিবুর রহমান বাদল

 

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জন হত্যাকা্লের ঘটনায় র্যাব-১১ এর স্পেশাল প্রিভেনশন কোম্পানি ক্যাম্পের সাবেক ইনচার্জ কমান্ডার এম এম রানা নিজেকে জড়িয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের খাস কামরায় হত্যাকা্লের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুম করা পর্যন্ত পুরো ঘটনা জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন। সাত হত্যা মামলার প্রধান আসামী সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন ও মেজর আরিফ হোসেন হত্যাকা্লের মূল পরিকল্পনায় ছিলেন। এ পরিকল্পনায় পরবর্তীতে র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল তারেক সাইদ ও রানা সম্পৃক্ত হয়েছেন। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৭ এপ্রিল ফতুল্লা স্টেডিয়ামের অদূরে নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডে শিবু মার্কেটের সামনে মেজর আরিফ ও কমান্ডার রানার নেতৃত্বে র্যাবের একটি দল কাউন্সিলর নজরুল ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়। তাদের নেতৃত্বে হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। তবে জবানবন্দী ও তদন্তে নারায়ণগঞ্জের স্মরণকালের বর্বোরোচিত এ হত্যাকান্ডে শামীম ওসমান কিংবা মেয়র সেলিনা হায়াত আইভির জড়িত থাকার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী এক কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এ হত্যাকা্ল নিয়ে বিভিন্ন টকশোতে বিভিন্ন মহল শুধু গালগপ্প ছড়িয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিনের সার্বিক তত্তাবধানে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে সেভেন হত্যাকা্লের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ কারণেই এ মামলার ৩৫ দিনের মাথায় হত্যাকা্লের পূর্ণাঙ্গ রহস্য উদঘাটন ও মোটিভ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সম্ভব হয়। এর আগে পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিনের নরসিংদীর মেয়র লোকমান হত্যাক্লোর তদন্তে তার সততা, আন্তরিকতা ও দূরদর্শীতার কারণে দ্রুত সময়ে রহস্য উদঘাটন, খুনী সনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছিল। তার দ্বিতীয় সফলতা একই কারণে নারায়ণগঞ্জের সেভেন হত্যাকান্ডের বেলায় ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, সাত হত্যাকান্ডে সুষ্ঠুভাবে তদন্তে আন্তরিকতা ও সততার বহিপ্রকাশ ঘটেছে। পুলিশ আন্তরিক হলে এ ধরনের যে কোনো তদন্তের সফল হওয়া সম্ভব। তবে নারায়ণগঞ্জের সেভেন হত্যাকান্ডের মোটিভ ও জড়িতদের বিষয় তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের কাছে এখন আয়নার মতো পরিষ্কার। এ হত্যাকান্ডে যেই জড়িত থাকবে তাকেই গ্রেপ্তার করা হবে। এমন নির্দেশনা সর্বোচ্চ মহল থেকে দেয়া হয়েছে।

রানা জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন যে, সাত হত্যাকা্ল সম্পর্কে র্যাব-১১ এর সাবে অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল তারেক সাইদের নির্দেশনা ছিল। প্রথমেই নূর হোসেনের সঙ্গে মেজর আরিফের সখ্যতা আগ থকেই ছিল। সে কোটি কোটি টাকা র্নূর হোসেনের কাছ থেকে নিয়েছে। পেয়েছেন আরও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। পরবর্তীতে নুর হোসেনের এ সুযোগ সুবিধা গ্রহণকারীদের মধ্যে র্যাবের সাবেক অধিনায়ক তারেক ও রানাও সম্পকৃত হয়েছেন। সুযোগ সুবিধা নিতে নিতে এমন পর্যায় হয়েছে যে র্যাব-১১ নুর হোসেনের কথায় পরিচালিত হতো। যার কারণে নুর হোসেনের পরিকল্পনার এ সেভেন মার্ডারের ঘটনা সহজেই র্যাব কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়ে বলে রানা জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন। সেভেন হত্যাকান্ডে র্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তার নির্দেশনা সম্পর্কে তদন্তকারী সূত্রে জানা যায়, এ বিষয়টি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে যাচাই বাছাই চলছে।

কাউন্সিলার নজরুল ইসলামসহ পাঁজনের অপহরণের ঘটনায় ৬ কোটি টাকা উেকাচ নেয়ার প্রসঙ্গে এমএম রানা জানিয়েছেন, ৬ কোটি টাকার কথা সঠিক না। টাকার পরিমান এক কোটির নীচে। তবে নূর হোসেনের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় মোটা টাকা নেয়া হয়েছে।

আদালত সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ৮টার দিকে কঠোর গোপনীতা ও নিরাপত্তার মধ্যে তাকে নারায়নগঞ্জ আদালতে হাজির করা হয় র্যাবে সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানাকে।

এরপর জবানবন্দি দেয়ার ব্যাপারে চিন্তা করার জন্য তিন ঘন্টা সময় সময় দেয়া হয। পরে সকাল ১১টার দিকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টুেট কে এম মহিউদ্দিনের খাস কামায় কাউন্সিলার নজরুল ইসলাম ও আইনজীবি চন্দন সরকার হত্যা মামলায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি শুরু করেন। শেষ হয় দুপুর ২টার দিকে। বিচারক ২৯ পৃষ্ঠায় এ জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। বিকাল পৌনে চারটার দিকে আদালতের নির্দেশে পাঠানো হয় নারায়নগঞ্জ জেলা কারাগারে।

সূত্র জানায়, জবাবনন্দিতে এমএম রানা জানান,অপহরণ , হত্যা ও লাফ নদীর পানিয়ে ডুবিয়ে দেয়াসহ যাবতীয় কাজ করেছেন র্যাব-১১ সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নের তারেক সাঈদের নির্দেশে। আর ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার নূর হোসেন। আর মিশন বাস্তবায়নে মূখ্য ভুমিখায় ছিল মেজর আরিফ হোসেন। পাশাপাশি এ নিয়ে র্যাব সদর দফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তারাও বিষয়টি মনিটরিং করেছেন। ফলে তাদের নির্দেশ অমান্য করার উপায় ছিলনা। আগেই তথ্য ছিল কাউন্সিলার নজরুল ইসলাম নারায়নগঞ্জ আদালতে হাজিরা রয়েছে। সে মোতাবেক সকাল থেকেই আদালত এলাকায় সাদা পোশাকে কয়েকজন র্যাব সদস্য নিয়োজিত রাখা হয়েছিল। এবং নজরুল ইসলামের বহনকারী প্রাইভেটকারটি অনুসরন করা হচ্ছিল। আর আগে থেকেই র্যাব গাড়ি নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম লিংক রোডে অবস্থান করছিল। নজরুল ইসলামসহ পাঁচ জনকে মাইক্রোবাসে তোলার মুহুর্তে আইনজীবি চন্দন সরকার বিষয়টি দেখে ফেলে ও মোবাইল ফোনে দৃশটি ধারন করে। বিষয়টি দেখে ফেলে র্যাব সদস্যরা তাকে আটক করে মোবাইলে ধারনকৃত দৃশ্যটি মুছে ফেলে ( ডিলিট করে)। এ সময় চন্দন সরকার নিজের পরিচয় দিয়ে নজরুল ইসলামসহ অন্যদের আটকের কারণ জানতে চান। বিষয়টি র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লে, কর্নেল সাঈদ তারেকে মোবাইল ফোনে জানানো হয়, ‘একজন আইনজীীব ( ল’ ইয়ার ) ঝামেলা করছে’। তিনি এসময় আইনজীবি ও তার চালককে গাড়িতে তুলে নেয়ার ( তাকে পিক আপ কর) নির্দেশ দেন।

সূত্র জানায়, অপরহন হত্যা ও লাশ পানিতে ডুবিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সাবেক র্যাবের আরিফ হোসেন দেয়াই তথ্য জানিয়েছেন। অপহরণ, হত্যাকান্ড ও লাশ ডোবানোর ঘটনায় র্যাবের কর্মকর্তাসহ ৩০ জন অংশ নিয়েছিল। এরা তিনটি গ্রুপে বিভক্ত ছিল। একটি গ্রুপর নজরুল ইসলামকে আদালত থেকে অনুসরন। আর অপহরণে সরাসরি অংশ নেয় ১১-১২ জন। আর লাশ ইঞ্জিন চালিত নৌকায় ট্রলারে তোলা ও ডুবানোর ঘটনায় ছিল ১০/১১ জন। লাশ ডোবানোর আগে নূর হোসেনর আস্তানায় ( কাঁচপুর ব্রিজের কাছে) ।

সূত্র জানায়, এমএম রানা জানান, আদমজীতে অবস্থিত র্যাব-১১ এর প্রধান কার্যালয় দায়িতরত্ব মেজর আরিফ হোসেনের সঙ্গে ছিল নূর হোসেনের ভাল সর্ম্পক। আরিফের মাধ্যমেই নূর হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয়।ঘটনার কয়েকদিন কাউন্সিলার নজরুলকে অপহরন করার কথা আরিফ হোসেনই তাকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এতে আপত্তি করেন। এসময় আরিফ তাকে জানিয়েছিল, র্যাব সদর দফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিষয়টি অবগত আছেন। পরবর্তীতে র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লে, তারেক সাঈদও তাকে ফোন করে বিষয়টি জানান। এরপরই তিনি অপহরণে অংশ নিতে রাজী হয়েছিলেন।

তিনি আরও জানান, লে. কর্নেল সাঈদ তারেক, মেজর আরিফ হোসেন বিভিন্ন সময় নূর হোসেনের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন।

সূত্র জানায়, গাড়ীতে তোলার পর নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে প্রথমে অচেতন হওয়ার স্প্রে করা হয়। যাতে তাত্ক্ষনিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

সূত্র আরও জানায়, জবানবন্দিতে রানা নিজেকে নির্দোশ দাবী করে বলেছেন,’ নির্দেশ ছিল শুধূ নজরুল ইসলামকে অপহরণ করা। আমি তাই করেছি্। কিন্ত তার পরও লে, কর্নেল সাঈদ আমাকে নির্দেশ দেয় পুরো মিশনে থাকতে। হত্যাকান্ডের বিষয়টি জানি ও আমি প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু আমার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিলনা।’

এ দিকে নারায়নগঞ্জ জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, জবানবন্দিতে রানা জানিয়েছেন, হত্যাকান্ডে মোট ২৩ জন জড়িত ছিল। র্যাবের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে ও কতিপয় গডফাদারের সম্বনয় এ হত্যাকান্ড ঘটেছে। তারা তাদের বিস্তারিত পরিচয়ও প্রকাশ করেছে যা এখনই প্রকাশ করা যৌক্তিক হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here