আমি ভালো আছি, মা বাবা ভালো নেই। অপহরণকারীদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া শিশু পরাগ

15

poragপরাগ, তুমি কেমন আছ?

আমি ভাল আছি, তবে বাবা-মা ভাল নেই। তারা আমাকে নিয়ে ভীষণ ভাবেন।

কেন ভাবেন?

হয়তো তাদের ধারণা, আমাকে আবার তুলে নিয়ে যেতে পারে।

তুমি এবার কোন্ ক্লাসে পড়ছ, প্রথম শ্রেণী।

এখনও পুলিশ পাহাড়া রয়েছে, হ্যাঁ, আঙ্কেলরা (পুলিশ) সারাক্ষণ আমার খোঁজ-খবর দিচ্ছেন। কথাগুলো বহুল আলোচিত কেরানীগঞ্জের অপহূত শিশু পরাগ মণ্ডলের। পরাগ মণ্ডলের বাবা ঢাকার তাঁতীবাজারের জে কে ইঞ্জিনিয়াররিং ওয়ার্কশপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিমল মণ্ডল বলেন, পুলিশ সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর রাখছে। তারপরও আতঙ্ক কাটছে না। সারাক্ষণ এক অজানা আশঙ্কা মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। তাছাড়া আসামিদের মধ্যে মামুন হোসেন ও আবুল কাশেম জামিনে রয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছে। ফলে এ আশঙ্কার মাত্রাটা দিন দিন আরো বাড়ছে।

কেউ-কোন ধরনের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে কীনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না কেউ-কোন ধরনের হুমকি দিচ্ছে না। কিন্তু দিতে বা কতক্ষণ। মামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, গত সোমবার থেকে আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবার কথা ছিল। কিন্তু ঐ দিন জেল কর্তৃপক্ষ আসামিদের হাজির না করায় শুনানি হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার শুনানির কথা ছিল। কিন্তু চার্জ গঠনের বিরুদ্ধে আসামি মামুনের একটি রিট আবেদন উচ্চ আদালতে তাদের বিচারাধীন রয়েছে। এ কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক সাক্ষ্য শুনানি স্থগিত করেন। আদালত এ সময় জানিয়েছে, হাইকোর্টের আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ স্থগিত থাকবে।

কোর্ট রিপোর্টার জানান, পরাগ মণ্ডল অপহরণ মামলার বিচার শুরুতেই স্থগিত করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য তিনটি ধার্য তারিখে সাক্ষি হয়নি।

গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার-১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য দিতে আদালতে তিনজন সাক্ষির হাজিরা দেন। কারাগারে থাকা আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। এসময় আসামি মামুন মিয়ার পক্ষে তার আইনজীবী সৈয়দ মাহমুদুল আহসান এক সার্টিফিকেট দাখিল করে ট্রাইব্যুনালে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, মামুনের বিরুদ্ধে এ মামলা চলে না মর্মে বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে একটি ফৌজদারি আপিল করা হয়েছে। আংশিক শুনানি হয়েছে। অবশিষ্ট শুনানির জন্য আগামি ৯ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে। এ অবস্থায় হাইকোর্টে শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ মুলতবী রাখা হোক।

ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি আবদুল বারী বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য চারটি তারিখে সাক্ষ্য গ্রহণ করা যায়নি। আজ এক আসামির পক্ষে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ স্থগিত রাখার আবেদন করলেও মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার পক্ষে হাইকোর্টের কোন আদেশ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়নি। এ অবস্থায় সাক্ষ্য নিতে কোন বাধা নেই। শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার আসামিপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত করেন।

এদিকে পরাগ মণ্ডলের নিরাপত্তার ব্যাপারে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানান, ঘটনার পর থেকে পরাগের নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে শুভাড্যা এলাকায় নিয়োজিত পুলিশের টহল টিমকে সেভাবেই নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। তারা সে নির্দেশ মতোই পরাগের দিকে নজর দিচ্ছে। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হবার কিছু নেই।

কেরানীগঞ্জের শুভাড্যা বাংলাবাজার এলাকার এক স্কুলের ছাত্র পরাগ মণ্ডল (সেই সময় ছাত্র ছিল পরাগ)। বাবা-মা, দিদি ও ঠাকুরমাকে নিয়েই তার ছিল ভালবাসার ছোট পৃথিবী। গত ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর সকালে মা ও দিদির সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার পথে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাড্যা পশ্চিমপাড়া কালীবাড়ি এলাকার বাসার সামনে থেকে মানুষরূপী দানবরা মুক্তিপণের দাবিতে তাকে অপহরণ করে। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয়েছিল পরাগের দিদি পিনাকি মণ্ডল, মা লিপি মণ্ডল ও প্রাইভেটকার চালক নজরুল ইসলাম। আর এ অপহরণের মধ্যদিয়ে মণ্ডল পরিবারের এই ছোট সদস্যটি পরিচিতি পায় দেশবাসীর কাছে। পরাগ হয়ে ওঠে প্রতিঘরের আপনজনে। মণ্ডল পরিবারের কষ্টের অংশীদার হয় দেশের ছোট-বড় সবাই। ঘটনার দুইদিন (শ্বাসরুদ্ধকর ৬৫ ঘন্টা) পর অচেতন অবস্থায় পরাগকে কেরানীগঞ্জের আঁটিপাড়া বাজার এলাকার রাস্তার পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়। মায়ের কোলে ফেরে পরাগ। পরিবারের সঙ্গে দেশবাসীও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

চার্জশিট দাখিল ঃ অপরহরণের ঘটনা পরাগ মণ্ডলের ঠাকুরমা সাবিত্রী মণ্ডল বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম প্রধান হোতা সন্ত্রাসী আমীর হোসেনসহ ১২ জনকে আসামি করে ২০১৩ সালের ২১ মার্চ ঢাকার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চাজশিট দাখিল করেন। অপর আসামিরা হচ্ছে— আমীর হোসেন, তার স্ত্রী বিউটি, যুবলীগ নেতা জুয়েল মোল্লা, জাহিদুল হাসান, আলী ওরফে রিফাত, কালা চান, আলফাজ, রিজভী আহমেদ অনিক, আবুল কাশেম, মামুন হোসেন ও আল আমিন। আর একই বছর ২০ অক্টোবর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মামলার প্রধান আসামি আমীর হোসেনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু আইনের ৭, ৮, ৩০ সহ দণ্ডবিধি আইনের ৩০৭ ধারা এবং অপর ১১ জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৭, ৮ ও ৩০ ধারায় অভিযোগ গঠন করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here