আন্দোলনের ঘোষণা আছে প্রস্তুতি নেই বিএনপির

13

pic-03_57910দল গুছিয়ে শিগগিরই আন্দোলন শুরু করা হবে বলে এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতাও গত কয়েক দিনে বক্তৃতা-বিবৃতিতে আন্দোলনে নামার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু দল গোছানো বা আন্দোলন শুরু করার প্রস্তুতিমূলক কোনো প্রকাশ্য তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা অবশ্য দাবি করছেন, পর্দার অন্তরালে কাজ চলছে।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন সফল না হওয়ার কারণ নিরূপণ এবং দলকে পুনর্গঠিত করার পর নতুন করে আন্দোলনে নামার পরিকল্পনার কথা গত কয়েক দিনে কয়েকবার বলেছেন বিএনপিপ্রধান। সর্বশেষ গত শনিবার রাজবাড়ীতে জনসভায় তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, দলের প্রতিটি ইউনিট ঢেলে সাজানোর পর রাজপথে নামবেন তিনি। জনসভায় খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগকে বিদায় করতে হলে আন্দোলনের বিকল্প নেই। আমরা এখন দল গোছাচ্ছি। দল গুছিয়ে উপজেলা নির্বাচনের পরই আমরা একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অতিদ্রুত নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করব।’ এর আগে ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, এই সরকারকে বেশি দিন সময় দেওয়া হবে না।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। ওই বৈঠকে মহানগর কমিটি পুনর্গঠন করা হবে বলে ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। গেল সপ্তাহে খালেদা জিয়া বৈঠক করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাদের সঙ্গে। সেখানেও তিনি জানান, দুটি কমিটি ভেঙে নতুন করে কমিটি করবেন। তাও আটকে আছে। তবে এই দুই কমিটি নিয়ে বেশ কয়েকজন দলীয় নেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও পেশাজীবী নেতা কাজ করছেন বলে জানা গেছে। তাঁরা মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানান দলের সম্পাদক পর্যায়ের এক নেতা। বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে বর্তমান কমিটির সদস্যসচিব আব্দুস সালাম কিছু বলতে রাজি হননি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ দল। এই দল আন্দোলন, সংগ্রাম, নির্বাচন করার মতো প্রস্তুতি সব সময়ই রাখে। তিনি জানান, পর্দার অন্তরালে দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দলে পরিবর্তনের যে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে তা ঠিক। এর প্রয়োজনও আছে। দীর্ঘদিন কাউন্সিল হয় না। কাজেই পুনর্গঠন খুবই দরকার। কারণ সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি সরকারেও নেই, সংসদেও নেই। আবার যে আন্দোলন করা হয়েছে তার ফসল তোলাও সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় ঘর গোছাতে না পারলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই যাকে যেখানে বসানো দরকার, সেটা করতে হবে।’
পর্দার অন্তরালে কী ধরনের কাজ চলছে জানতে চাইলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা বলেন, ‘নতুন কিছু কৌশল নিয়ে কাজ করছেন বিএনপিপ্রধান নিজেই। বিগত সময়ের মতো এবারও রোডমার্চ, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সভা-সমাবেশের মধ্য দিয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ খালেদা জিয়ার। এ ছাড়া দলের ইমেজ সংকট এবং জনমনে বিভ্রান্তিসহ সাবোটাজ সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো আন্দোলনের দিকে আর ঝুঁকবেন না তিনি।’ তবে দলের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী নেতাদের একজন জানান, আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নাগাদ জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন খালেদা জিয়া। আর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্দোলনের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ে আন্দোলন ও সংলাপের প্রস্তুতি চলবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে সরকার যেভাবে দমন-পীড়ন চালিয়েছে তা অকল্পনীয়, বিশেষ করে এত লোককে হত্যা বা গুম করবে- এটা এ দেশের কেউ ভাবতে পারেনি। তাই সরকারবিরোধী আন্দোলনে এবার আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।’
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করে মে মাস পর্যন্ত কাউন্সিল করার সময় বাড়িয়ে নিয়েছে বিএনপি। কেন্দ্রীয় কমিটি ঢেলে সাজাতে হলে এপ্রিলে দলের কাউন্সিল করতে হবে। কাউন্সিল হলে নির্বাহী কমিটিতেও পরিবর্তন আসবে। নির্বাহী কমিটির বেশির ভাগ সদস্যই এখন নিষ্ক্রিয়। আন্দোলনের মাঠেও ছিলেন অনেকে অনুপস্থিত। দলীয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাহী কমিটির শতাধিক সদস্য পদে এবার অনেক নতুন মুখ আসবে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় সদস্যদের বাদ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপিপ্রধান।
দলের একজন সহ-দপ্তর সম্পাদক জানান, কাউন্সিল হলে পরিবর্তন আসবে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদ থেকে শুরু করে স্থায়ী কমিটি, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু হবে জেলা পর্যায় থেকে। সম্ভব হলে গোপন ভোটের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এসব কমিটি ঢেলে সাজানোর পর মাঠ নেতাদের সুপারিশের আলোকে দলের জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হতে পারে।
ওই নেতা আরো জানান, কাকে কাকে বাদ দেওয়া হতে পারে তার একটি তালিকা তৈরির কাজ চলছে। কিছু সংযোজন-বিয়োজনের পর তা দলীয় প্রধানের কাছে দেওয়া হবে। কাউন্সিলের মাধ্যমেই তাঁদের বাদ দেওয়া হবে। কবে কাউন্সিল হচ্ছে জানতে চাইলে ওই নেতা বলেন, এ সপ্তাহেই স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকবেন খালেদা জিয়া। সেখানে কাউন্সিলের তারিখ ঠিক হতে পারে।
একটি সূত্র জানায়, বেশ কিছু দিন ধরে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কয়েকজন নেতা এবং কয়েকটি কমিটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আসছিলেন খালেদা জিয়া, বিশেষ করে ঢাকায় আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায় সবার আগে ঢেলে সাজানো হবে ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গসংগঠনগুলো।
জানা যায়, সারা দেশে বিএনপির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা আছে। এসব জেলা পরিদর্শন, সাংগঠনিক কার্যক্রম দেখভাল, স্থানীয় দুর্বল কমিটিগুলো পুনর্গঠন, অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পরিদর্শন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুপারিশ করাসহ নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সারা দেশে সাংগঠনিক সফরের কর্মসূচিও নিয়েছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে এরই মধ্যে রাজবাড়ী সফর করেছেন খালেদা জিয়া। পর্যায়ক্রমে সিলেট, লক্ষ্মীপুর, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, রাজশাহী, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরাসহ কয়েক ধাপে প্রায় ৩৩টি জেলা সফর করবেন খালেদা জিয়া। এই সফর চলবে এ বছরের শেষ নাগাদ। দলের সিলেট বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন জানান, খালেদা জিয়া সিলেটে যাবেন সপ্তাখানেকের মধ্যে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here