আগামী সপ্তাহ থেকে লাগাতার আন্দোলন, কাল খালেদা জিয়া শেষ আল্টিমেটাম দিবেন

23

একাদশ নয়, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নেই সরকারের সঙ্গে সমঝোতার সদিচ্ছা জিইয়ে রেখে টানা আন্দোলনের ছক কষেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল। আন্দোলনের রূপরেখায় থাকছে শুক্রবারসহ লাগাতার অবরোধ, ঘেরাও, গণমিছিল। এই কর্মসূচি শুরু হতে পারে ২৮ ডিসেম্বর থেকে। আগামী ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন থাকবে ‘গণকারফিউ’। ওইদিন ভোটারদের ঘর থেকে বের না হওয়ার আহ্বান জানানো হবে। এর আগে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। আর আন্দোলনের এই ছক রেখেই আগামীকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য রাখবেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। বক্তব্যে তিনি নির্বাচন প্রশ্নে সরকারকে সমঝোতার শেষ আহ্বান জানাবেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান সোহেল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল রবিবার জানানো হয়, দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট ও সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় বিএনপি চেয়ারপারসন তার গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য রাখবেন।

১৮ দলের পঞ্চম দফা অবরোধ শেষ হচ্ছে কাল বিকাল পাঁচটায়। অবরোধ শেষেই বেগম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন। আর এই সংবাদ সম্মেলনটি তিনি করছেন নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের আগের দিন। উল্লেখ্য, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী বুধবার থেকে সারাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দেশবাসীর উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে খালেদা জিয়া সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশেও কিছু কথা বলতে পারেন। কোনো ‘একতরফা ও প্রহসনের’ নির্বাচনে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি সেনাবাহিনীর প্রতি অনুরোধ রাখবেন। এছাড়া বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুধাবন করে জনমতের সঙ্গে সহমত পোষণ করার জন্য তিনি প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রতিও আহ্বান জানাবেন বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, বক্তব্যে নির্বাচন প্রশ্নে এখনও সমঝোতা না হওয়ার জন্য খালেদা জিয়া সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে দায়ী করবেন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের আহ্বানকে গুরুত্ব না দেয়ার জন্য সরকারের সমালোচনা থাকবে তার বক্তব্যে। এছাড়া বিরোধী জোটের চলমান আন্দোলনের সময় যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপকহারে ককটেল নিক্ষেপ ও গুলি করে মানুষ হত্যাসহ নাশকতার জন্যও সরকারকেই দায়ী করবেন বিরোধী দলীয় নেত্রী।

খালেদা জিয়া সরকারকে শেষবারের মতো আল্টিমেটাম দিতে পারেন। ১৮ দলের কয়েক নেতা জানান, এই আল্টিমেটামেও সরকার সাড়া না দিলে আগামী শনিবার থেকে টানা কর্মসূচি শুরু হতে পারে। এই দফার আন্দোলনে শুক্রবারও কর্মসূচি থাকবে। আর শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে বেগম খালেদা জিয়া নিজেই নামবেন রাজপথে।

সূত্রমতে, বেগম জিয়া সরকারকে তিন ইস্যুতে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য চূড়ান্ত আল্টিমেটাম দেবেন। বর্তমান তফসিল বাতিল করে সমঝোতার মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের শেষ আহ্বান জানাবেন তিনি। এ প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে।

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, সামনে কম সময় আছে। আমরা আলোচনার দুয়ার বন্ধ করিনি। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এখনো আলোচনার মাধ্যমে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। তবে সরকার তা না করলে লাগাতার আন্দোলন শুরু হবে। সেই আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়ে আছে।

জানা গেছে, আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। অবরোধে-হরতালের সময় ঢাকায় প্রায় স্বাভাবিক দৃশ্যপটে বেগম জিয়া নাখোশ হলেও বিকল্প চিন্তা করেছেন তিনি। যাতে নেতা-কর্মীরা ঢাকার রাজপথেও নেমে আসে, এমন কর্মসূচিও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ১৮ দলের বাইরে যেসব দল এই নির্বাচন বয়কট করছে, তাদেরকেও পৃথক প্লাটফর্ম থেকে আন্দোলনে নামানোর জন্য যোগাযোগ করা হয়েছে। বেগম জিয়া নিজে এবং লোক মারফত কথা বলেছেন বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে। তারা অনেকে সাড়া দিয়েছেন। তারাও শেষ মুহূর্তে রাজপথে নেমে আসবেন।

এদিকে, বিএনপির সিনিয়র একজন নেতা জানান, বেগম খালেদা জিয়াকে কোনো পরিস্থিতিতে গৃহঅন্তরীণ করা হলে সে পরিস্থিতিতে করণীয়ও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল স্থগিত ও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে গত ২৬ নভেম্বর থেকে অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে ১৮ দল। এর আগে চারদফা অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছে তারা। প্রথম দফায় ২৬ থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত ৭১ ঘণ্টা, এরপর ৩০ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩১ ঘণ্টা, তৃতীয় দফায় ৭ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪৪ ঘণ্টা এবং সর্বশেষ ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টার অবরোধ ডাকা হয়। আর এখন চলছে পঞ্চম দফা অবরোধ। চলবে কাল। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব বড়দিনের কারণে ২৫ ডিসেম্বর ১৮ দলের কোনো কর্মসূচি থাকছে না। ২৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার থাকবে কর্মসূচি।

কারফিউ কি?

কারফিউ হল— চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ। ঘোষিত কারফিউ’র সময়ে সবাইকে ঘরের মধ্যে থাকতে হয়। তবে জরুরী গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন বা কোন ব্যক্তি জরুরী প্রয়োজনে রাস্তায় বের হতে পারবেন। জনপ্রশাসন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কারফিউ দিতে পারে। মন্ত্রণালয় কারফিউ দিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রশাসকদের বলবেন। আর এটা বাস্তবায়ন করে ম্যাজিস্ট্রেট। তবে কোন দেশে জরুরী অবস্থা থাকলে সামরিক আইন প্রশাসক কারফিউ দিতে পারেন। কারফিউ বাস্তবায়নের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। তবে সহযোগিতা চাইলে সেনাবাহিনীও দায়িত্ব পালন করতে পারে। তবে সেনাবাহিনী থাকতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here