অর্থমন্ত্রীর কক্ষে ‘দেশের মালিক’অর্থমন্ত্রীকে ইশারায় ডেকে বললেন ‘আমি এ দেশের মালিক, আমি অসাধারণ’

24

desher malik52b6f162c54c3-Untitled-9

আজ রোববার দুপুর ১২টা। সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে একান্ত বৈঠক চলছে ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেনের। বারান্দায় অপেক্ষায় সাংবাদিকেরা। হঠাত্ ‘ইউ স্টুপিড, গেট লস্ট!’ বলতে বলতে ধমকিয়ে নিজ কক্ষের সামনে থেকে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী শ্মশ্রুমণ্ডিত এক লোককে দূরে সরে চলে যেতে বলেন অর্থমন্ত্রী। অনুমতি না নিয়ে এবং বৈঠক চলাকালীন অর্থমন্ত্রীর কক্ষে গিয়ে নিজেকে ‘দেশের মালিক’ বলে পরিচয় দিচ্ছিলেন তিনি। তখনই বিষয়টি সাংবাদিকদের নজরে আসে।

অর্থমন্ত্রীর কক্ষের পাশে সব সময়ই পুলিশের সদস্যরা থাকেন। আজ দুপুরেও ছিলেন। অর্থমন্ত্রীর এপিএসের কক্ষে পরে তাঁকে আটকে রাখা হয়। তখন সাংবাদিক ও পুলিশের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।

প্রশ্ন : আপনি কে?

উত্তর: আমি দেশের মালিক। সাধারণ কেউ না। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

প্রশ্ন : আপনি সাধারণ কেউ না কেন?

উত্তর: আমি দেশের মালিক, আমি অসাধারণ হব না?

প্রশ্ন: সচিবালয়ে ঢোকার পাস পেলেন কই?

উত্তর: আমার পাস লাগে না। অর্থমন্ত্রী বাইরে এসে যদি বলেন আমি দেশের মালিক না, তাহলে আমি চলে যাব।

প্রশ্ন : আপনি কেন এসেছেন?

উত্তর: দেশের মেশিনটি আছে অর্থমন্ত্রীর কাছে। আমি সেটি নিতে এসেছি।

ঠিকানা জানতে চাইলে অপ্রকৃতিস্থ মনে হওয়া ওই ব্যক্তিটি তাঁর নাম শাকিল বলে জানান। এ ছাড়া তাঁর বাড়ি একবার কিশোরগঞ্জ, আরেকবার কুমিল্লা বলে জবাব দেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই ব্যক্তিকে আজ বিকেলে রাজধানীর শ্যামলীর জাতীয় মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।

লোকটি সম্পর্কে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি তাঁকে চেনেন না। তিনি লোকটিকে ‘ইতর’ হিসেবে অভিহিত করেন।

শুধু বাংলাদেশের মালিকই নন, সমগ্র পৃথিবীর মালিক তিনি! সৌদি আরবের বর্তমান বাদশা আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ আল সউদের পিতা তার বন্ধু। সেই লোকটির জন্য কোথাও কোন জায়গা হচ্ছে না। এহেন ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে কোথায় রাখা যায়, তা নিয়ে চিন্তিত পুলিশ। সমাজসেবা অধিদপ্তর পুলিশকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মানসিক রোগীদের পুনবার্সন কেন্দ্রে কোন সিট খালি নেই। তাই বাধ্য হয়ে সেই লোকটিকে শের-ই বাংলা নগরের মানসিক চিকিত্সা কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য আগারগাঁও থানায় পাঠানো হচ্ছে। সেখানেও কোন জায়গা না হলে, তার জন্য অপেক্ষা করছে ভবঘুরে আইনের ৫৭ ধারা। এ ধারায় গ্রেপ্তার হয়ে শ্রীবাসে যেতে হবে নিজেকে ‘অসাধারণ’ বলে দাবি করা এ তাবত দুনিয়ার মালিককে।

আজ সকাল ১১ টায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেনের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক করছিলেন। মন্ত্রীর রুদ্ধদ্বার কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছিলেন সাংবাদিকরা। বেলা সোয়া ১২ টার দিকে হঠাৎ সেখানে হাজির হয় কলারওয়ালা গেঞ্জি, প্যান্ট পড়া- মুখে দাড়ি, মাথায় টাকওয়ালা মধ্যবয়সী এক লোক। একজন সাংবাদিকের কাছে তার প্রশ্ন, মন্ত্রীর কক্ষ কোনটি। সাংবাদিক, আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন মন্ত্রীর রুম। সঙ্গে পরামর্শ দেন, সেখানে ঢুকার আগে মন্ত্রীর একান্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে নিতে।

হঠাৎ করেই লোকটি কাউকে কিছু না বলেই অর্থমন্ত্রীর কক্ষের দরজা খুলে ফেললেন। ভেতরে ঢুকলেন। এদিক-ওদিক তাকালেন। দেখলেন বৈঠক হচ্ছে। পরক্ষণেই দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাইরে এদিক-ওদিক তাকালেন। আবার দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিলেন। ইশারায় ডাকলেন অর্থমন্ত্রীকে। তখনও ভেতরে কানাডার হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন অর্থমন্ত্রী। লোকটির বারবার দরজা খোলা আর বন্ধ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে অর্থমন্ত্রী নিজেই উঠে এলেন দরজার কাছে। জোরে ধমক দিয়ে বললেন, ‘ইউ স্টুপিড। গেট লস্ট।’

অর্থমন্ত্রীর বকা শুনে লোকটি নিজেও চিৎকার করতে থাকলেন। বারবার বলতে থাকলেন, ‘আমি এ দেশের মালিক।’

এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা লোকটিকে তাত্ক্ষণিকভাবে ধরে নিয়ে যান অর্থমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব তানভীর বাশারের কক্ষে। তখন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তার পরিচয় জানতে চাইলে সে বলতে থাকে, ‘আমি এদেশের মালিক। আমি সাধারণ কেউ না। আমি অসাধারণ।’

‘কেন আপনি অসাধারণ’- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তার খোলামেলা জবাব, ‘আমি এদেশের মালিক। আমি কেন অসাধারণ হবো না।’

পাস ছাড়া আপনি সচিবালয়ে ঢুকলেন কেমনে- এ প্রশ্নে তিনি বলেন,  ‘আমার কোন পাস লাগে না। আমি মন্ত্রীর কাছে এসেছি একটি মেশিন নিতে। দেশের মালিকের মেশিনটি অর্থমন্ত্রীর কাছে। সেটি নিতে এসেছি।’

কোথা থেকে এসেছেন, জানতে চাইলে তিনি কখনও নিজ বাড়ি কুমিল্লা, কখনও কিশোরগঞ্জ বলে দাবি করেন। পরে লোকটিকে নিয়ে যান সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মসিউর রহমান।

এতো এতো নিরাপত্তা ভেঙ্গে এভাবে কক্ষে ঢুকে পড়ার কারণে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন কি-না, জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘আমি লোকটিকে চিনি না। সে একজন ইতর। তবে আমি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছি না। কারণ, আল্লাহর মেহেরবানীর কারণেই ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত আমি সুস্থ আছি।’

সন্ধ্যায় অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মসিউর রহমান  বলেন, লোকটির নাম শাকিব। বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদিতে। সে এখনও নিজেকে বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীর মালিক মালিক বলে দাবি করছে। বলছে, সৌদি আরবের বর্তমান বাদশার পিতা তার বন্ধু। এই ক্ষমতাধর লোকটিকে নিয়ে বেকায়দায় পড়েছি। এখনও সে আমার কাছেই আছে। তার জন্য কোথাও কোন জায়গা পাচ্ছি না। সমাজসেবা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করেছিলাম। তাঁরা জানিয়েছে যে, তাদের অধীনে যে মানসিক পুনর্বাসন কেন্দ্র আছে, সেখানে কোন সিট খালি নেই। এতো ক্ষমতাধর, ওজনদার মানুষকে তো আমি কাঁধে নিয়ে ঘুরতে পারব না। তাই আপাতত আগারগাঁও থানায় যোগাযোগ করেছি। তারা নিয়ে যাতে শের-ই বাংলা নগরের মানসিক চিকিত্সা কেন্দ্রে ভর্তি করায়। ওই হাসপাতালেও জায়গা না হলে তাকে ভবঘুরে ও মানসিক রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ৫৭ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হবে।’

মসিউর রহমান জানান, যেটুকু জানা গেছে, মানসিক রোগে আক্রান্ত এ লোকটির বাড়ি নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলায়। তার নাম শাকিব।

সচিবালয়ের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙ্গে তিনি কিভাবে ভেতরে ঢুকলেন- জানতে চাইলে মসিউর রহমান বলেন, গত তিন মাস ধরেই লোকটি সচিবালয়ে ঢুকার চেষ্টা করছে। সচিবালয়ের প্রবেশ পথ সংশ্লিষ্ট ফুটপাতগুলোতে তাকে ঘুরাঘুরি করতে দেখা গেছে। অনেকের কাছেই সে পাস চেয়েছে। রবিবার হয়তো কোন ফাঁক-ফোঁকর পেয়ে সে ভেতরে ঢুকে গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here