অর্থনৈতিক করিডোর হলে চার দেশই লাভবান হবে কুনমিংয়ে চীন-সাউথ এশিয়া এক্সপো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা

21

বাসস

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অঞ্চলে চীনের চমত্কার যোগাযোগ নীতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি প্রতিবেশী সকল দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সমপ্রসারণ ও সার্বিক বন্ধন জোরদার করবে। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের (বিসিআইএম) বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে এ অঞ্চলের সব দেশ লাভবান হবে।

গতকাল শুক্রবার কুনমিং আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও প্রদর্শনী কেন্দ্রে দ্বিতীয় চীন-দক্ষিণ এশিয়া প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা আরো বলেন, চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এসব উপাদান হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের বন্ধুত্ব এবং দু’দেশের জনগণের অবস্থার উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষাকে অব্যাহতভাবে জোরদার করছে।

এর আগে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেজিয়াংয়ের আমন্ত্রণে ৬ দিনের চীন সফরের শুরুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় এই শহরে পৌঁছেন। কুনমিংয়ে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আজিজুল হক এবং ইউনান প্রদেশের ভাইস গভর্নর মিম লি জিহেং তাঁকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া উপহার দেয়া হয়। বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রীনলেক হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। কুনমিংয়ে তিনি এই হোটেলেই অবস্থান করবেন।

দ্বিতীয় চীন-দক্ষিণ এশিয়া প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, চীন বাংলাদেশকে দারিদ্র্য, সন্ত্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধভাবে সহায়তা করতে পারে। জ্ঞান, শিক্ষা ও বন্ধুত্বের শক্ত বন্ধনের উপর ভিত্তি করে একটা সমৃদ্ধ অঞ্চল গড়ে তোলা আমাদের লক্ষ্য। পারস্পরিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আমরা আমাদের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারি।

শেখ হাসিনা বলেন, এটা উত্সাহব্যঞ্জক যে এ অঞ্চলের সকল দেশ ‘প্রফিট শেয়ারিং’ ধারণার ব্যাপারে গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রভাবে এখানকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং উভয় দিকে বাণিজ্য প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এক্সপোকে ‘চমত্কার আয়োজন’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও চীনের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক সৃষ্টিতে এই উদ্যোগ বার্ষিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, কুনমিংয়ের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশগুলোর জন্য কুনমিং চীনের গেটওয়েতে পরিণত হয়েছে। ‘এক্সপো’ কুনমিংয়ের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক আদান-প্রদানের সম্পর্ককে আজ নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি চীন ও এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় জোরদারে অনুঘটক হয়ে উঠেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আসিয়ান (এএসইএএন) ও সার্কের (এসএএআরসি) মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশের জন্য এবং দুই অর্থনৈতিক ব্লকের জন্য বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখানে রয়েছে ১৬ কোটি লোকের বাজার এবং দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬০ ভাগের বয়স ৪০ বছরের কম। এমন একটি অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তি কেন্দ্র পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি, আকর্ষণীয় বিনিয়োগ পরিবেশ, বেসরকারি খাতের নেতৃত্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার গত ৫ বছরে ৬ শতাংশের বেশি অব্যাহত থাকা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিকাশমান ইতিবাচক সংযোগ ব্যবস্থা বাংলাদেশকে এ অঞ্চলে অন্যতম শক্তি কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা, চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াং ইয়াং, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জামিল আহমেদ, লাওস-এর ভাইস প্রাইম মিনিস্টার সোমসাভেট লেংসাভাদ, শ্রীলংকার ডেপুটি স্পিকার চন্দ্রিমা ভিরাক্কুদি ও সার্কের মহাসচিব অর্জুন বাহাদুর থাপাও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

সরকারি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আগামী নয় জুন বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব পিপল-এ আনুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনার পর তিনি লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে একটি যৌথ ইস্তেহারে স্বাক্ষর করবেন। সফরের সময় তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাত্ করবেন এবং গ্রেট হল অব পিপল-এ চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের চেয়ারম্যান উ ঝেংশেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আগামী ১১ জুন হংকং হয়ে তিনি দেশে ফিরবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, শেখ হাসিনার চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে সোনাদিয়া দ্বীপে সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের সহযোগিতা কামনা। পাশাপাশি ছয়টি বড় প্রকল্পে চীনা সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করা হবে। প্রকল্পগুলো হলো পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত বিদ্যুত্ কেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন, ন্যাশনাল আইসিটি ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ফেস-৩, রাজশাহী ওয়াসা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, কর্নফুলী নদীতে কনস্ট্রাকশন অব মাল্টি-লেন ভিত্তিক টানেল, চট্টগ্রামের কালুরঘাটে কর্নফুলী নদীর ওপর দ্বিতীয় রেল ও সড়ক সেতু নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম-রামু-কক্সবাজার ও রামু-গুনধুম রেলপথ নির্মাণ।

সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার বিভিন্ন ইস্যুতে চীনের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা। চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, রাজনীতি বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া বিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব সহিদুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৭০ সদস্যের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here