অপরাধীদের স্বর্গ ফেনী দুই মাসে ১০ খুন, গ্রেফতার হয়নি খুনিরা

31

 

আবুল খায়ের

 

অপরাধীদের জন্য স্বর্গরাজ্য আর সাধারণ মানুষের জন্য নরক- এরই নাম ফেনী জেলা। এক সময় এ জেলা সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে খ্যাত ছিল। আওয়ামী লীগসহ মহাজোট সরকারের গত ৫ বছরে ‘ফেনী সন্ত্রাসের জনপদ’ শব্দটি মুছে রাজনৈতিক সহাবস্থানে থেকে সাধারণ মানুষের বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন রাজনৈতিক ক্লিমিংম্যান হিসেবে পরিচিত কিছু নেতা। তাদের মধ্যে ছিলেন কতিপয় স্বনামধন্য ও ধনাঢ্য ব্যক্তি। ঐ ৫ বছর মোটামুটি শান্তিতেই কেটে যায়। নতুন করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাসীদের ভয়ঙ্কর রূপ আবারো ফিরে আসে। দুই নেতার মধ্যে শুরু হয় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, দলীয় অবস্থান, বিগত সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্ব। এক বনে দুই ভয়ঙ্কর ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং মাদকের কালো থাবায় সমগ্র ফেনী জেলা সন্ত্রাসীরা গ্রাস করে। ফেনী ফিরে পায় পূর্বের সন্ত্রাসের জনপদের উপাধি। হাত বাড়ালেই মিলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র আর মাদক। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, খুন, গুম, ছিনতাই ও ডাকাতি ঘটতে থাকে অহরহ। গত এপ্রিল থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত প্রায় দুই মাসে ১০টি খুন হয়েছে। ঘটেছে বেশ কিছুসংখ্যক ডাকাতি, ছিনতাই। জড়িতরা কেউ গ্রেফতার হয় না। পুলিশসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর সামনে প্রকাশ্যে খুনি ও সন্ত্রাসীরা ঘুরে বেড়ায়। এ অবস্থা দেখে সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। ফেনীর প্রশাসন খুন, গুম, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ অপরাধ ঠেকাতে চরম ব্যর্থ। গতকাল ফেনীর সুশীল সমাজ, গণ্যমান্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে গতমাসে ফেনীর খুন, গুমসহ সংঘাত অপরাধের বিস্তারিত তুলে ধরেন। রামগঞ্জ থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত ফেনীর সীমান্ত পথ ১৩৬ কিলোমিটার এবং ২০টি বিজিবি আউটপোস্ট রয়েছে। ঐ সীমান্ত পথে ভারত থেকে আসছে মাদক আর অস্ত্রের চালান। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ফেনী শহরে প্রকাশ্যে সশস্ত্র তরুণেরা ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক একরামকে গুলি করে তার গাড়ীতে হত্যা করে। ঐ গাড়িতে গান পাউডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে একরামের লাশ পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়।

গাড়ির চারদিকে অস্ত্র নিয়ে খুনিরা সশস্ত্র পাহারায় ছিল। কেউ এগিয়ে আসতে সাহস পায়নি। খুনিদের এলাকাবাসী দেখেছেন এবং তারা কোন নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থাকেন তা-ও এলাকাবাসী জানেন। এমন তথ্য জানিয়েছেন কয়েক ব্যক্তি। এমন নিষ্ঠুর -হূদয় বিদারক হত্যাকাণ্ডে ফেনীবাসী দিক-বিদিক হারা।

ফেনীতে আওয়ামী লীগের বিগত ৫ বছর শাসনামলে বহুল আলোচিত সন্ত্রাসের এক গডফাদারকে দল থেকে বহিষ্কার করার পর নতুন করে উত্থান হয় তার হাতে ট্রেনিং প্রাপ্ত তারই এক উত্তরসরীর।

গত ১৯ এপ্রিল যুবদল নেতা শহীদুল আলম সুমন তার ব্যক্তিগত কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুহুরীগঞ্জ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে এলে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে মহাসড়কে চলন্ত গাড়ির নিচে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় পুলিশ ১ জনকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার ঘটনার সাথে জড়িত বলে স্বীকার করে।

গত ১৪ এপ্রিল সকালে দেওয়ানগঞ্জ রেল ক্রসিং এলাকা থেকে শহীদুল ইসলাম নামে এক যুবলীগ কর্মীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। হত্যাকারীরা তার দুই চোখ উত্পাটন করে এবং পুরুষাঙ্গ কেটে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় নিহতের পিতা বারাহীপুর এলাকার মকবুল আহম্মদের নাম উল্লেখ করে মামলা করে।

১২ এপ্রিল ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মধুগ্রাম এলাকায় সালেহ্ আহাম্মদের বাড়িতে একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে মো. ছিদ্দিকুর রহমান নামে এক দিনমজুরের গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১১ এপ্রিল ফেনী শহরের রেজিষ্ট্রি অফিস সংলগ্ন ভূঞা বাড়ির সামনে রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্ত্রীর সামনে ব্যবসায়ী কায়সার মাহমুদকে সন্ত্রাসীরা ছুরিকাঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া নিহতের স্ত্রী শাহনাজ নাদিয়া কারাগারে রয়েছেন। ১১ এপ্রিল দাগনভূঞা উপজেলার করিমউল্লাপুর গ্রাম থেকে পুলিশ এক মহিলার লাশ উদ্ধার করে। লাশের পরিচয় মেলেনি। ৯ এপ্রিল দাগনভূঞার করিমউল্লাপুর গ্রামে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে ওসমান গনি ও সাহাবউদ্দিন নামে ২ ব্যক্তি নিহত হন। ৩ এপ্রিল ফেনী-মাইজদী সড়কের কাশেমপুর এলাকায় প্রাইভেট কার ছিনতাই করতে গিয়ে দুর্বৃত্তরা চালক এনামুল হক স্বপনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

৫ মে ফেনী শহরের রাজবাড়ি গেইট এলাকা থেকে শত শত লোকের সামনেই রড ব্যবসায়ী শাহীন ষ্টিলের ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম এর কাছ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। ২৫ মার্চ লেমুয়ার যুবদল নেতা আবুল কালামের মস্তকবিহীন লাশ কালিদাশ পাহাড়িয়া নদী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ এখনো নিহত আবুল কালামের মস্তকটি উদ্ধার করতে পারেনি। ২০ মার্চ বিকাল ৩ টার দিকে র্যাব পরিচয় দিয়ে ফেনী শহর যুবদল নেতা মাহবুবুল রহমান রিপনকে অপহরণ করা হয়। দীর্ঘ ২ মাসেও তার খোজ মেলেনি।

উল্লেখ্য, বিগত বেশ কিছুদিন থেকে ফেনীর এক নেতার সাথে একরামের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে টানাহেঁছড়া চলছিল বলে ফেনীতে ব্যাপক আলোচনা চলছে । সমপ্রতি উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একরাম নিজেই নেতার কাছে এসে অতীতের সব ভুল বুঝাবুঝি নিরসন করে উপজেলা নির্বাচনে তাকে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করলে তিনি তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। কারণ, একরামের সাথে মনকষাকষির সুবাদে তার প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির প্রার্থীর সাথে ঐ নেতার গোপন আঁতাত হয়েছে শুনে একরাম সমঝোতায় চলে আসেন। সমপ্রতি ২টি পত্রিকায় ঐ নেতার বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে একরামের উপর তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। তিনি জানতে পারেন, এ সংবাদের পেছনে একরাম ১৬ আনা জড়িত। স্থানীয় লোকজনের বক্তব্য, বর্তমান আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ও ফেনীতে বিপুল অস্ত্রের ঝনঝনানির কারণে প্রাণভয়ে সাধারণ মানুষ দূরে থাক সাংবাদিকরাও মুখ খুলতে নারাজ। কারণ, যে মুখ খুলবে তাকে হয়তো একরামের মত প্রাণ দিতে হবে, নয়তো গুম হতে হবে। ফুলগাজী ও পরশুরামের বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা যায়, সীমান্তবর্তী ভারত থেকে আসা বিপুল পরিমাণ ফেন্সিডিল, গাঁজা, মদ নিহত উপজেলা চেয়ারম্যান তাদের লোকজন দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান নিহত হওয়ার পিছনে শুধু রাজনৈতিক নয়, মাদক জগতের অর্থ ভাগাভাগির বিরোধও কাজ করেছে বলে সূত্র থেকে জানা যায়।

পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ গত ১১ মে ফেনীতে তার চাকরির তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে বিপুল উত্সাহ উদ্দীপনা নিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। উক্ত সম্মেলনে সাংবাদিকরা বিগত ২ মাসে ১০টি খুন, একটি স্বর্ণ দোকান ডাকাতি ও দুইটি ছিনতাইয়ের ব্যাপারে পুলিশ সুপারকে জিজ্ঞাস করলে তিনি কোন সদউত্তর দিতে পারেননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে তিনি মনে করেন স্বাভাবিক হওয়ার পূর্বে আরো ৭/৮টি খুন হওয়ার আশংকা রয়েছে। কারণ, তিনি মনে করেন কোন মাসে দুই চারটি ডাকাতি হলে পরবর্তী মাসে আরো ডাকাতির সম্ভাবনা থাকে। পুলিশ সুপারের ভবিষ্যত্ বাণী সত্যি হলো একরাম খুনের মাধ্যমে।

পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, ফেনীর সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে যা যা দরকার তা-ই করা হবে। উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে আইজিপি জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here