অনেক ষড়যন্ত্র চলছে সজাগ থাকুন জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী

20

pm oপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খুনিরা ভেবেছিল স্বাধীন বাংলাদেশ আর থাকবে না। পরাজিত শক্তির এটিই ছিল মূল ষড়যন্ত্র। তবে ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে এখনও অনেক ষড়যন্ত্র চলছে। এ ব্যাপারে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার শুরু হওয়া চলতি দশম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের প্রথমদিনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের মৃত্যুতে আনীত শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে খুনের দায়ে ফাঁসি হওয়া কর্নেল (অব.) ফারুক বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকে খুনের ষড়যন্ত্র করতে জিয়াউর রহমানের কাছে যান। এই হত্যাকাণ্ডে জিয়ার সম্পূর্ণ সমর্থন ছিল, সহযোগিতা ছিল। ফারুকের সেই সাক্ষাতকারের রেকর্ড এখনও রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও অনেকের সমালোচনার বিষয়টি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ যদি কোনো অন্যায় বা অপরাধ করে তাহলে তার বিচার নিশ্চয়ই হবে। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কোনো কোনো পরিবারকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রও চলছে। এ ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বাংলাদেশে কিছু পরিবার ও ব্যক্তিকে মহল বিশেষ টার্গেট করে অপপ্রচার চালায়। অথচ আরও বড় অপরাধ করলেও তাদের বিরুদ্ধে একটি কথাও লেখা হয় না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে সামান্য কিছু ঘটলেও সেটিকে বড় করে দেখায়।

ওসমান পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ওসমান পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের সখ্য সবসময় ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে অনেক পরিবারের আত্মত্যাগ রয়েছে। ওসমান পরিবারও তেমনই একটি পরিবার। এই পরিবারটির সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এই পরিবারে। নাসিম ওসমানের বাবা শামসুজ্জোহা খানকে আমরা ‘জোহা কাকা’ বলে ডাকতাম। ‘৭৫ এর হত্যাকাণ্ডের পর আমরা যখন অসহায় ছিলাম, যখন রাজনৈতিক আশ্রয়ে ভারতে ছিলাম, তখন ‘৭৯ সালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে করে জোহা কাকা আমাদের খবর নেয়ার জন্য দিল্লি গিয়েছিলেন। তখন খুব কম মানুষকেই আমরা পাশে পেয়েছিলাম। দুর্ভাগ্য, এই ওসমান পরিবারটি বারবার আঘাতের শিকার। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের সময়ে, ‘৭১ এ, ‘৭৫ এ, এমনকি এরপর যখন যারা ক্ষমতায় এসেছে, কখনও না কখনও এই পরিবারের ওপর হামলা হয়েছে, আঘাত হয়েছে।

প্রয়াত নাসিম ওসমান সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, নাসিম ছিল অত্যন্ত বিনয়ী ও ভদ্র। ‘৭৫ এর ১৪ আগস্ট ওর বিয়ে হয়। সেদিন শেষরাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর পেয়ে নববধূকে ফেলে রেখে ওই হত্যার প্রতিশোধ নিতে ভারতে চলে যায় নাসিম। ও জাতীয় পার্টি (জাপা) করতো। আমি জিজ্ঞেস করতাম, জাতীয় পার্টি কর কেন? বলতো, না করে তার কোনো উপায় ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নাসিম মাঝে-মধ্যেই আমার কাছে আসতো। আমাকে নানা পরামর্শ দিত, বলতো-এই দোয়া, ওই দোয়া পড়বেন। কিছুদিন আগেও এসেছিল। আমি ওকে খুব সুন্দর একটা কোরআন শরীফ দিয়েছিলাম। খুব খুশি হয়ে বিদায় নিয়েছিল নাসিম। তিনি বলেন, যতক্ষণ বেঁচে আছি আমি নাসিমের ছেলে-মেয়েদের দেখাশোনা করবো। কিছু করার দরকার হলে নিশ্চয়ই করব।

শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতি নাসিমের ভালোবাসা ছিল অগাধ। জাপার সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, নাসিম ছিলেন সাহসী ও ত্যাগী। তার মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাপা। কারণ নারায়ণগঞ্জে আমাদের সংগঠনের কাণ্ডারি ছিলেন তিনি। জাপার কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, নাসিম জাপা করলেও বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে ছিলেন আপোষহীন। রাজনীতি করলে অনেকে অনেক কথা বলেন, কিন্তু নাসিম ছিলেন কূট রাজনীতির শিকার। প্রতিমন্ত্রী ও জাপা নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গা প্রয়াত নাসিমের পরিবারের জন্য গঠনমূলক কিছু করার উদ্যোগ নিতে স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বাজেট অধিবেশন শুরু

বর্তমান সরকার ও চলতি দশম জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন গতকাল বিকাল পাঁচটার কয়েক মিনিট পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হয়। শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে স্পিকার বলেন, বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী ২০১৪-‘১৫ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব পেশ করবেন। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে অধিবেশনকে কার্যকর করতে তিনি সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।

অধিবেশনের প্রথমদিন গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ বেশিরভাগ সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

অধিবেশন চলবে ৩ জুলাই পর্যন্ত

চলতি বাজেট অধিবেশন আগামী ৩ জুলাই পর্যন্ত চলবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল অধিবেশন শুরুর আগে বিকাল চারটায় সংসদ ভবনে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। তবে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে স্পিকার ৩ জুলাইয়ের পরেও অধিবেশন চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এছাড়া বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর মোট ৪৫ ঘণ্টা সাধারণ আলোচনা হবে। বাজেট পাস হবে ২৯ জুন। বৈঠকে কার্যউপদেষ্টা কমিটির সদস্য প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ অন্য সদস্যরা যোগ দেন।

সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন করা হয়েছে। তারা হলেন- আবুল কালাম আজাদ, মীর শওকত হোসেন বাদশা, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, কাজী ফিরোজ রশীদ ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে নামের ক্রমানুসারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তারা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।

শোক প্রস্তাব গৃহীত

দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়নের পর স্পিকার শিরীন শারমিন বর্তমান সংসদের সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য এবং সংসদ সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা ও এক কর্মচারীসহ বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যাদের নামে শোক প্রস্তাব আনা হয়েছে তাদের মধ্যে প্রবীণ সাংবাদিক ও সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম মূসাও রয়েছেন। রেওয়াজ অনুযায়ী বর্তমান সংসদের সদস্য নাসিম ওসমানের ওপর আলোচনার পর শোকপ্রস্তাবগুলো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর তাদের স্মরণে সবাই দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করেন। পরে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া।

অধিবেশন মুলতবি

বর্তমান সংসদের সদস্য নাসিম ওসমানের মৃত্যুতে রেওয়াজ অনুযায়ী শোক প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর দিনের কার্যসূচিতে থাকা প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করে এবং অন্যান্য কার্যসূচি স্থগিত করে অধিবেশন আজ বুধবার বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত মুলতবি করেন স্পিকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here