জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়কে ঘিরে ঢাকায় কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে দাঁড়াতে দেবে না পুলিশ। আগামীকাল আলোচিত এ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সব ধরনের অরাজকতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে থাকবে র‌্যাব-পুলিশ।

এরই মধ্যে সারা দেশে শুরু হয়েছে র‌্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে নজরদারি শুরু করেছে র‌্যাব-পুলিশ। নিয়মিত টহলের কথা বললেও বিএনপির পক্ষ থেকে গণগ্রেফতারের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, আগামীকাল ভোর ৪টা থেকে রাজধানীতে মিছিল, জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। এ ছাড়া জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীতে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে রিজার্ভ পুলিশ নিয়ে রেখেছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত আছে। ওই দিন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করবে। রায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সাজা হতে পারে। এরই মধ্যে বিএনপি অভিযোগ করেছে, গত ২৮ জানুয়ারি থেকে গত সোমবার পর্যন্ত বিএনপির সহস্রাধিক নেতা-কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র বলছে, পুলিশ মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারী দুপুরে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের ৮ ফেব্রুয়ারির পরিস্থিতি নিয়ে নির্দেশনা দেন। র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদসহ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, র‌্যাব সদর দফতর থেকে দেশের সবকটি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ককে ৮ ফেব্রুয়ারি ঘিরে দেওয়া হয়েছে বিশেষ নির্দেশনা।

৮ ফেব্রুয়ারি রায়কে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের নাশকতা রোধে পুলিশের সব ইউনিটকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণা সামনে রেখে সপ্তাহজুড়েই চলছে ধরপাকড়। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকার সাতটি প্রবেশমুখে ১৩টি তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে পুলিশ। গত সোমবার সকাল থেকে যানবাহন থামিয়ে সন্দেহভাজনদের শরীর-ব্যাগ তল্লাশি করা হচ্ছে। শহরের ভিতরেও স্থায়ী তল্লাশি চৌকিগুলোতে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ডিএমপির পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবহনে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখার জন্য পরিবহন ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল চলছে এলিট ফোর্স র‌্যাবেরও।

রায় ঘোষণার আগে ও পরের পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দফতর থেকে ১৮ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা পাওয়ার পর ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা যাতে ঢাকায় আসতে না পারেন, সে জন্য এই তল্লাশি শুরু হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রাথমিকভাবে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তল্লাশি কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ আছে।

এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে জিয়া অরফানেজ মামলার রায় ঘিরে দুই প্রধান দলের নেতাদের কথার লড়াইয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মাঝেও। এই প্রেক্ষাপটে কড়াকড়ি আরোপ করে গতকাল ডিএমপির পক্ষ থেকে এসেছে বিশেষ বার্তা। গণমাধ্যমে পাঠানো ওই ‘বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে’ বলা হয়েছে, ৮ ফেব্রুয়ারি ভোর ৪টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে সব ধরনের ছড়ি বা লাঠি, ছুরি, চাকু বা ধারালো অস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য ও দাহ্য পদার্থ বহন নিষিদ্ধ থাকবে। যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা বসে কোনো ধরনের মিছিল করা যাবে না। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারাধীন একটি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরীতে কোনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নে অপপ্রয়াস হতে পারে মর্মে বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য, ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সূত্রে জানা যায়। শান্তি-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ওই বিজ্ঞপ্তিতে সবার সহযোগিতাও চেয়েছেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। গতকাল সন্ধ্যায় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো কাজ বরদাস্ত করা হবে না। সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ডিএমপি। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবেই রাজধানীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বিএনপির অভিযোগ, সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের হয়রানিসহ গণগ্রেফতার করা হচ্ছে। সরকার বিএনপি নেত্রীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই ‘মিথ্যা’ এই মামলাকে রায় পর্যন্ত টেনে এনেছে। রায় বিপক্ষে গেলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারিও তারা দিয়ে রেখেছে।

সূত্র বলছে, রাজধানীতে নাশকতা সৃষ্টির পেছনে মদদদাতা কিংবা উসকানিদাতা ২১ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ। তালিকা ধরে ইতিমধ্যে হাবীব-উন নবী সোহেলসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সারা দেশে এমন তালিকার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। বিএনপি নেতাদের গতিবিধি নজরদারির মধ্যে রাখা গেলেও জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা বিশেষ একটি অ্যাপস ব্যবহার করছে বলে খবর আছে গোয়েন্দাদের কাছে।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান বলেন, সম্ভাব্য সবকিছুই বিবেচনায় নিয়ে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে র‌্যাব। রাজধানীতে ব্যাটালিয়নগুলোর নিয়মিত ফোর্সের বাইরেও র‌্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কোনো কাজের চেষ্টা করলেই তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস বলেন, বিশেষ স্থাপনা ছাড়াও পুলিশের সব ধরনের চেকপোস্টে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যানবাহনে নিয়মিত যে তল্লাশি করা হয়, রায় ঘিরে তা বাড়ানো হচ্ছে। সার্বিক বিষয়গুলো নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে সহেলী বলেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন অভিযোগে শত শত ব্যক্তি গ্রেফতার হচ্ছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসের অভিযোগ ছাড়াও চুরি, ডাকাতি, অপহরণ মামলার আসামি রয়েছে। পৃথকভাবে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের তালিকা তৈরি করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

সুত্রঃ বিডি প্রতিদিন

শেয়ার করুন
  • 120
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here