Fireএকের পর এক হামলা ও নৃশংসতার শিকার হচ্ছে পুলিশ। কিন্তু হামলা প্রতিরোধ এবং হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে পারছে না পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মাসে ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত ও দুই হাজার ৪৫৭ জন আহত হয়েছেন। সহিংসতায় নিহত হয়েছেন বিজিবির দুজন সদস্যও।
তবে এসব ঘটনায় কতজন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে নেই। সুনির্দিষ্টভাবে আলোচিত কয়েকটি ঘটনা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই। কোনো ক্ষেত্রে হামলার ঘটনার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও হামলাকারীরা শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হয়নি।
সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার রাজশাহী মহানগরে পুলিশ ভ্যানের ভেতরে বোমা হামলায় একজন পুলিশ সদস্য নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন।
এই রাজশাহী নগরেরই শালবন এলাকায় গত ১ এপ্রিল হামলার শিকার হন বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম। চরম নৃশংস সেই হামলায় হেলমেট খুলে মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল তাঁর। গণমাধ্যমে সেই হামলার ছবি দেখে সুস্থ বিবেক কেঁপে উঠেছিল। ঝরনা আক্তার নামের এক সাহসী নারী ওই পুলিশ সদস্যকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করেন। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত দৃশ্যে অন্তত ১৩ জনকে দেখা যায় নিষ্ঠুর সেই হামলা চালাতে। কিন্তু আট মাসেও সব হামলাকারী গ্রেপ্তার হয়নি।
রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ওই হামলার ঘটনায় বোয়ালিয়া থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলাটি এখন তদন্ত করছে রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ওই ঘটনায় সরাসরি জড়িত আসাদুল নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসাদুল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। ছবি দেখে জসীমউদদীন নামে আরও একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে, কিন্তু এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
এই ঘটনার আগে-পরে রাজশাহীতে পুলিশের ওপর হামলার শতাধিক ঘটনা ঘটলেও হামলাকারীরা সুনির্দিষ্টভাবে গ্রেপ্তার হয়নি। যার ফলে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে। ১০ ডিসেম্বর পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ছয় পুলিশকে বেধড়ক মারধর করেন শিবিরের কর্মীরা। পিটিয়ে তাঁরা মতিহার থানার ওসির পা ভেঙে দেন।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে চার পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করেন জামায়াত-শিবিরের সদস্যরা। ওই সময় সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক নাশকতা হয়। সেই নাশকতার ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ থানায় এক হাজার ১৪৬ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৬০ হাজার জনের বিরুদ্ধে ৩২টি মামলা হয়েছে। এই সব মামলায় এখন পর্যন্ত ৩০০ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে পুলিশের ওপর হামলাকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। কোনো মামলারই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রচণ্ড ব্যস্ততার কারণে তাঁরা তদন্তের সুযোগই পাচ্ছেন না। আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, তারপর তদন্ত।
গত ৩ মার্চ বগুড়ার শাহজাহানপুরে থানাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত জামায়াত নেতার কাছ থেকে থানার ওসির ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই দিন শাহজাহানপুর থানা, আওয়ামী লীগ কার্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা হয়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, জামায়াত নেতা ও শাহজাহানপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ইয়াসীন আলীর বাসাতেই এসব হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল। সেই ইয়াসীন আলীর কাছ থেকে শাহজাহানপুর থানার ওসি মাহমুদুর আলম ৩৫ লাখ টাকা বাজারদরের পাঁচ শতক জমি ঘুষ নিয়েছেন বলে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে। এখন ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ওসির বিরুদ্ধেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে পুলিশের রিকুইজিশন করা বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল ফেরদৌস খলিল নিহত এবং কনস্টেবল ফাইজুর রহমান ও বাসচালক বায়েজিদ দগ্ধ হন। ওই ঘটনায় রমনা থানায় পুলিশ বাদী হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ ১৮ জন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার এজাহারে, ঘটনার সঙ্গে এসব নেতা-কর্মীর যোগসূত্র সম্পর্কে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দেওয়া ভাষণের উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৮ দলের নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ, উসকানি ও অর্থায়নে দুই মোটরসাইকেল আরোহী এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। তবে দুই মোটরসাইকেল আরোহী এখনো শনাক্ত হননি।
এ বিষয়ে রমনা থানার ওসি মশিউর রহমান গতকাল বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই।’
জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। আশা করি দেশের সচেতন নাগরিকেরা হামলাকারীদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসবেন। এ ধরনের হামলা পুলিশের মনোবলে এতটুকু চিড় ধরাতে পারবে না।’

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here