ctgnews

অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সরকারি ও উন্নয়ন সংস্থাসমূহের সমন্বয়হীনতার কারণে চট্টগ্রাম মহানগরী স্থায়ী জলাবদ্ধ রূপ নিতে যাচ্ছে। ১৯৯৫ সালে সিডিএ’র উদ্যোগে বিশ বছর মেয়াদি ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান করা হলেও তার ন্যূনতম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুুমে নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে কেতাবে থাকা মাস্টার প্ল্যান সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা এবং সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়, চট্টগ্রাম মহানগরীতে সামান্য বৃষ্টি

তেই যেমন অনেকাংশ নিমজ্জিত হয়। একইভাবে নগরীর পশ্চিমাংশের বিরাট অংশ প্রায় প্রতিদিনই অপরাহ্ন পর্যন্ত হাঁটু পানিতে ডুবে থাকে। মূলত জোয়ারের কারণে আগ্রাবাদ সিডিএ, আবাসিক এলাকা, এক্সেস রোড, হালিশহর এলাকার অনেকাংশ পানিতে ডুবে যায়।

দীর্ঘকাল বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় উক্ত এলাকা পানিবদ্ধতা থেকে রক্ষার জন্য রাজনৈতিকভাবে বক্তৃতা-বিবৃতি আসলেও বাস্তবে কোন কাজ হয়নি। কয়েক বছর পূূর্বে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন হালিশহর এলাকায় মহেশ খালে একটি স্লুইসগেট তৈরির জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা কার্যকর ফল লাভ করেনি। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় স্লুইসগেট নির্মাণের দায়িত্ব মূলত পানি উন্নয়ন বোর্ডের। অথচ নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা জোয়ারের পানিতে ডুবে গেলেও এ ব্যাপারে তাদের তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। মহেশ খাল ছাড়াও হালিশহর সংলগ্ন সমুদ্র উপকূলে ছোট-বড় কয়েকটি স্লুইসগেট নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার অভাব এবং অর্থপ্রাপ্তি না ঘটায় প্রায় প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে বিরাট এলাকা প্লাবিত হয়। গত ২/৩ বছর ধরে জোয়ারের পানিপ্রবাহ অনেক বেড়ে গেছে। জোয়ারের সময় বৃষ্টি হলে নগরীতে মারাত্মক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। জোয়ার ও বৃষ্টির পানির কারণে নগরীর দক্ষিণ-পূর্বাংশে কর্ণফুলী  নদী সংলগ্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল নিমজ্জিত হয়।

ভৌগোলিক অবস্থানে চট্টগ্রাম মহানগরী সমুদ্র, নদী, সমতল এবং পাহাড়-টিলা নিয়ে গঠিত। সাধারণ হিসেবে নগরীর পানি বিভিন্ন নালা-নর্দমা-খাল বেয়ে কর্ণফুলী নদী ও সমুদ্রে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেভাবে পানি প্রবাহ হয় না। নগরীর শতাধিক খাল ও নালা সম্পূর্ণ ও আংশিক ভরাট এবং দখল হয়ে গেছে। এ সকল এলাকায় গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। তাছাড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৯৫ ভাগ ভবন ও স্থাপনা নক্শা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। একইভাবে অনুমোদনহীন ভবন ও স্থাপনার সংখ্যাও কম নয়। ২০০৮ সালে ইমারত বিধিমালা হলেও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) যথাযথ নিয়ম পালনে উদাসীন। সিডিএ তার সীমাবদ্ধতার কথা বলে পরিকল্পিত নগরায়নের ধারণা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তাছাড়া সিডিএকে তার নিজস্ব কাজের বাইরে অনেক কাজ করতে দেখা যায়। ম্যাজিস্ট্রেট শূন্যতা ও অনুপস্থিতির কথা বলে সিডিএ’র অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সিডিএ নগরীর বহদ্দারহাটসহ কয়েকটি স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ সম্পন্ন ও আংশিক সম্পন্ন করলেও এর যৌক্তিকতা এবং ব্যবহার নিয়ে ‘প্ল্যান ফর চিটাগাং’ প্রকৌশলী ও বুদ্ধিজীবীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে একাধিকবার আপত্তি তোলা হয়েছে। প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার দিয়ে যানবাহন চলাচল না করে নিচের সড়ক দিয়ে চলায় যানজট তেমন একটা কমতে দেখা যাচ্ছে না। আবার কদমতলী ফ্লাইওভার গত কয়েক বছরে ধীরগতিতে কাজ চলায় আশপাশের সড়ক ও নালা-নর্দমা মাটিতে ভরে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। যানজট তো লেগেই আছে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত সিডিএ এবং সিটি কর্পোরেশনের হলেও এ দুটি সংস্থার মধ্যে কোন সমন্বয় নেই দীর্ঘকাল। আবার ওয়াসা, বিদ্যুত্, টিএন্ডটি, স্থানীয় সরকার, সড়ক যোগাযোগসহ অন্য সকল সংস্থার মধ্যে কোন সমন্বয় না থাকায় নগরী অপরিকল্পিতভাবেই এগিয়ে চলছে। গত প্রায় ৭/৮ মাস ধরে ওয়াসা তার পানির পাইপ বসানোর জন্য পুরো নগরীর মূল সড়কের মধ্যদিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। ফলে নগরীতে যানজট ও জলাবদ্ধতা অনেকাংশে প্রলম্বিত হচ্ছে। ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী নগরীতে নতুন করে অন্তত ৪টি নতুন খাল খননের কথা বলা হয়েছে। একইসাথে বেশ কয়েকটি জলাধার নির্মাণসহ নগরীর অবকাঠামোগত কিছু পরিবর্তন এবং পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু গত বিশ বছরে তার একটিও করা হয়নি। ২০১১ সালে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে বহদ্দারহাট এলাকায় একটি খাল খননের পরিকল্পনা নেয়া হলেও এখনও তা অর্থের অভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here