abdul gaffar choudhury_33920আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
কবিরা নাকি ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা হন। অন্তত তার প্রমাণ আমরা পাই কবি সিকান্‌দার আবু জাফরের একটি গানে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এই গানটি লিখেছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে ছিল এই গান। ‘এবারের সংগ্রাম চলবেই চলবে’- গানটি এখনো গীত হয়। কবি সিকান্‌দার আবু জাফর ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা ছিলেন বলেই হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম শিগগিরই সফল হতে পারে, কিন্তু শিগগিরই থামবে না। পরাজিত শত্রুর সঙ্গে এই যুদ্ধ বহুকাল চলবে।

কবি কথাটা ভুল বলেননি। একাত্তরের সংগ্রাম শেষ হয়নি; চলছে। ৪২ বছর পরও বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ড, নারী ধর্ষণ, মিনি গণহত্যা চলছে। আমাদের সংগ্রাম চলছেই, চলবে। শুধু একটি পার্থক্য, স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষের শিবির সেদিন যতটা ঐক্যবদ্ধ ছিল; আজকের স্বাধীনতা রক্ষার পক্ষের শিবির ততটা ঐক্যবদ্ধ নয়। আমাদের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি। ‘বুদ্ধিজীবী-বিভীষণ’দের সংখ্যাও বেড়েছে। তবু একটাই ভরসা, একাত্তরে শেখ মুজিব ছিলেন, এবার শেখ হাসিনা আছেন।

শেখ হাসিনার সরকারের অনেক দুর্বলতা ও দুর্নীতি থাকতে পারে। এই সরকার দেশকে প্রত্যাশিত সুশাসন উপহার দিয়ে থাকতে না পারে, যুদ্ধাবস্থায় একটি সরকারের পক্ষে তা দেওয়াও সম্ভব নয়, সেই স্বাধীনতার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনো সরকার সর্বশক্তি নিয়ে দেশের উন্নয়ন বা জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে এগোতে পারেনি। স্বাধীনতার শত্রুপক্ষসহ তাদের বিদেশি পৃষ্ঠপোষকরা চারদিক থেকে এত চক্রান্তের জাল বিস্তার করে রেখেছে, তা থেকে দেশকে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রক্ষা করতেই এই সরকারকে বেশি ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে।

এবারও শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে আক্রান্ত হয়ে ক্রমাগত যুদ্ধাবস্থার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। সেই ভয়াবহ বিডিআর বিদ্রোহ থেকে এ বছর ৫ মের হেফাজতি তাণ্ডব, তারপর বর্তমানের সন্ত্রাস- ক্রমাগত হামলার মুখে এই সরকার যে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকা নয়, দেশের কিছু অভাবিত উন্নয়নের কাজ শেষ করতে পেরেছে, তা বিস্ময়কর।

খারাপ ভালো যা-ই হোক, এই সরকার যদি এই মুহূর্তে ক্ষমতাচ্যুত হয়, তাহলে যে শাসক জোট ক্ষমতায় আসবে, তারা দেশটিকে পাকিস্তানের কলোনি-যুগে ফিরিয়ে নেবে। চাই কি, তার চেয়েও বিভীষিকাময় আধা তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত করবে। যদি তা-ই হয়, তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগবে, ৪২ বছর আগে এত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশটিকে স্বাধীন করার কী প্রয়োজন ছিল? শেখ হাসিনা এখন কি শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য লড়াই করছেন? এই যুদ্ধ কি একাত্তরের অর্জন রক্ষা করারও যুদ্ধ নয়?

একাত্তরের পরাজিত স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। পেট্রো-ডলারের মদদে বাংলাদেশে শুধু একাধিক জঙ্গি মৌলবাদী গোষ্ঠী তৈরি হয়নি, একটি বশীভূত সুধীসমাজ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীও তৈরি হয়েছে। মিডিয়ায়, সেমিনারে নিরপেক্ষ সেজে তাদের বিভ্রান্তি সৃষ্টি আরো ভয়ংকর। হাসিনা সরকারের অর্থবল কম, প্রচারশক্তি আরো কম। তবু শুধু সাহস ও দেশপ্রেমের জোরে এই সরকার অনেক অনতিক্রম্য সংকট অতিক্রম করেছে এবং এখনো করছে।

একাত্তরের স্বাধীনতার শত্রুশিবির হরতাল-অবরোধের নামে দেশময় বিভীষিকা সৃষ্টি করেও যুদ্ধে জয়ী হতে না পেরে এখন বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের মাত্র একজনের ফাঁসি হতেই পাকিস্তান হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের মিত্র পশ্চিমা দেশ আমেরিকা ও কয়েকটি ইউরোপীয় রাষ্ট্র এবারও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে।

একাত্তর সালের বিশ্ব পরিস্থিতি এখন নেই। পাল্টা সুপারপাওয়ার হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব নেই। নেই ন্যাটোর প্রতিপক্ষ ওয়ারশ-জোট। সমাজতন্ত্রী পূর্ব ইউরোপ নেই। ভারত এখন আমেরিকার বন্ধু। তবু সব মিলিয়ে মনে করা হচ্ছিল, উপমহাদেশের ব্যাপারে ভারতের নিরাপত্তা ও মিত্রতাকে উপেক্ষা করে আমেরিকা নাক গলাবে না। ভারত তার নিজের নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের সহযোগী সেজেছে।

মনে হয়েছিল, ওবামার আমেরিকা এই সত্যটিকে মেনে নেবে। তারা তা মানেনি। সেই পুরনো একাধিপত্যবাদী রোগ ও বলদর্পিতা থেকে একাত্তর সালের মতো ২০১৩ সালেও তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শিবির ও সন্ত্রাসী রাজনীতির পক্ষাবলম্বন করেছে। অথচ মুখে বলছে, তারা টেররিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। বাংলাদেশে এই সন্ত্রাসের হাতে এখন নিত্য যে নারী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটছে তার জন্য জাতিসংঘ বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কণ্ঠে কোনো ক্ষোভ ও দুঃখ নেই। তাদের কান্না যুদ্ধাপরাধী, মানবতার শত্রু কাদের মোল্লার জন্য।

আমেরিকা ও তস্য অনুচর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এই ভূমিকা আজ নতুন নয়। একাত্তর সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বানচাল করার জন্য আমেরিকার নিক্সন প্রশাসন ভারত মহাসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের একটার পর একটা যুদ্ধে আমেরিকার সমরশক্তি ও অর্থনীতিতে প্রচণ্ড ঘা লাগায় এবার বাংলাদেশকে হুমকি প্রদর্শনের জন্য আর সপ্তম নৌবহর পাঠাতে পারেনি, পাঠিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে। ফ্রান্সে দ্য গলের মৃত্যুর পর থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সব কাজে আমেরিকার আজ্ঞাবাহী। আমেরিকা যেসব সংকটে নিজে নাক গলাতে চায় না, সেখানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে কাজে লাগায়। বর্তমানেও বাংলাদেশের ওপর অনৈতিক ও অন্যায্য-অবৈধ চাপ সৃষ্টির জন্য এই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে কাজে লাগাচ্ছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তথা পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শিবিরের বিরুদ্ধে এই একই ভূমিকা নিয়েছিল ২০০১ সালের নির্বাচনের সময়ও। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে হারানোর জন্য (ভারত তখন নিষ্ক্রিয় থাকায়) ইউরোপিয়ান কূটনীতিকদের নিয়ে গঠিত ঢাকার টুয়েসডে ক্লাবের ভূমিকা কি এত শিগগিরই ভুলে যাওয়ার মতো? তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যান মেরি পিটার্স এই টুয়েসডে ক্লাবের নেতৃত্ব গ্রহণ করে কিভাবে তাদের বক্তব্য ও কার্যকলাপ দ্বারা বিএনপি ও জামায়াতের অনুকূলে নির্বাচন প্রভাবিত করার জন্য সব কূটনৈতিক শিষ্টাচার বর্জন করে মাঠে নেমেছিলেন তা মানুষের স্মৃতিপট থেকে এখনো মুছে যায়নি।

এখন কাদের মোল্লার মতো এক মানবতার শত্রুর মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় তারা কাঁদবেন না কেন? ২০০১ সালে আমেরিকা কাদের মোল্লার দল জামায়াতকে এই বলে সার্টিফিকেট দিয়েছিল, ‘জামায়াত হচ্ছে একটি মধ্যপন্থী মুসলিম গণতান্ত্রিক দল।’ তাদের এই সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত দল এবং তাদের বড় মিত্র বিএনপির পক্ষে আমেরিকা তার দোসর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে নিয়ে আবার মাঠে নামবে তাতে বিস্ময়ের কী আছে?

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার ও কমনওয়েলথও গিয়ে মিতালি পাতিয়েছে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এটাও নতুন কিছু নয়। কমনওয়েলথ আজ নয়, বহু দিন থেকে একটি কফি হাউস বা চ্যাটারিং ক্লাব। কমনওয়েলথভুক্ত কোনো সদস্য দেশের সমস্যাতেই ভূমিকা গ্রহণের শক্তি নেই এ সংস্থার। এটি ‘নামের খসম আজিজ মেছের।’ বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হয়ে তারা এলো কী এলো না তা কোনো বিবেচনার বিষয় নয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শিবিরের জন্য এবারের যুদ্ধাবস্থায় সবচেয়ে ভরসার কথা, বিএনপি ও জামায়াতের সন্ত্রাসে দেশের মানুষের ভীত হওয়া সত্ত্বেও তাতে সমর্থন না দেওয়া। বরং সাতক্ষীরা থেকে খবর এসেছে, জনতা সংঘবদ্ধ হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের দলের এক নেতার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে গণ-প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ সত্ত্বেও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মিত্র ভারতের আবার সেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিবিরের পাশে এসে শক্তভাবে দাঁড়ানো। একটি বড় ব্যাপার।

একাত্তরের মতো আমেরিকা তাতে চটেছে। সেবার স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ‘দ্যাট উওম্যান’ বলে গালি দিয়ে অপমান করতে চেয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। এবার একটি সুপারপাওয়ারের ক্রোধের বলি হয়েছেন আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতীয় ডেপুটি কনসাল জেনারেল দেবযানী খোবরাগাদে। তাঁকে যে অভিযোগে গ্রেপ্তার করে নির্যাতনের শিকার করা হয়েছে, তাতে স্পষ্টই বোঝা যায়, এটা বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারত যে ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তাতে দিলি্লকে একটা শিক্ষা দেওয়ার স্পর্ধিত চেষ্টা ওয়াশিংটনের।

দেবযানীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা কূটনৈতিক জগতে সহজেই সাজানো হয়ে থাকে এবং এ ক্ষেত্রেও হয়ে থাকলে বিস্ময়ের কিছু নেই। আর অভিযোগ সত্য হলে তাঁকে কূটনীতিকের মর্যাদাসহ বিচারে সোপর্দ করাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করে যেভাবে প্রকাশ্যে হাতকড়া পরানো হয়েছে, প্রায় নগ্ন করে দেহতল্লাশি করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত মাদকাসক্ত আসামিদের সঙ্গে একই কুঠুরিতে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে তাতেই বোঝা যায় আমেরিকার আসল রাগটা কোথায়?

ভারতও এর শক্ত পাল্টা জবাব দিয়েছে এবং আমেরিকাকে জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বে তার সাম্রাজ্যবাদী দাপটের দিন শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ছোট দেশ হতে পারে। তাকেও এই সাম্রাজ্যবাদী দাপটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। যদি রুখে দাঁড়ায়, তাহলে ১৯৭১ সালে মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে যেমন লেজ গুটিয়ে ভারত মহাসাগর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল, ২০১৩ সালেও তারই প্রতিভু ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বর্তমান বাংলাদেশবিরোধী হুমকি ও চাপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

লন্ডন, ২৩ ডিসেম্বর, সোমবার, ২০১৩

শেয়ার করুন

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here