নাশকতায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে পরিচয়পত্র বহনের নির্দেশের পর সীতাকুণ্ড উপজেলায় গতকাল সোমবার সকাল থেকে ব্যবসায়ীদের মাঝে পরিচয়পত্র বানানোর হিড়িক পড়েছে। কিন্তু যাদের চিহ্নিত করতে পরিচয়পত্র বহনের নির্দেশ দেয়া হয়, সেই জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরাও পরিচয়পত্র বানিয়ে ব্যবসায়ী সেজে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া নাশকতা রোধে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান গত রোববার সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, চেয়ারম্যান ও সুশীল সমাজের সাথে মতবিনিময় সভা করেন। এ সময় নাশকতায় জড়িত জামায়াত-শিবিরকে চিহ্নিত করতে ব্যবসায়ীদের পরিচয়পত্র বহনের নির্দেশ দেন তিনি।
ব্যবসায়ীরা জানান, পরিচয়পত্র নেয়ার জন্য পৌরসদর ব্যবসায়ী সমিতি গত রোববার সন্ধ্যায় বাজারে মাইকিং করে ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানায়। এ ঘোষণায় গতকাল সোমবার সকাল থেকে বাজারের দোকান মালিক ও কর্মচারীদের মধ্যে পরিচয়পত্র বানানোর হিড়িক পড়ে।
পরিচয়পত্র বানানোর জন্য ব্যবসায়ীরা বাজারের স্টুডিওগুলোতে ছবি তোলা ও পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে সমিতির বরাবরে লিখিতভাবে আবেদন করে। কিন্তু এতে ব্যবসায়ী নয় এমন অনেকেও সমিতির বরাবরে পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মানবতা বিরোধী অপরাধের রায় থেকে শুরু করে ১৮ দলীয় জোটের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা সীতাকুণ্ডে নারকীয় তাণ্ডব ও নৈরাজ্য চালিয়ে আসছে। এতে জড়িত অনেক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় পত্র বানানোর জন্য আবেদন জমা দিয়েছে।
তারা বলেন, ‘নাশকতায় জড়িত জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা যদি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয়পত্র পেয়ে যায় তাহলে তাদের চিহ্নিত করার উপায় হিসেবে ব্যবসায়ীদের পরিচয়পত্র বহনের লক্ষ্য নষ্ট হবে। পুলিশ প্রশাসন তখন কাকে জামায়াত-শিবির হিসেবে চিহ্নিত করবে। এক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা হয়রানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
বাজারের ব্যবসায়ী মো. হারুন বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরকে গ্রেফতারে বাজারের কোনো ব্যবসায়ী যাতে হয়রানির শিকার না হন সে লক্ষ্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ব্যবসায়ীদের পরিচয়পত্র বহনের নির্দেশ দেন। কিন্তু ব্যবসায়ী হিসেবে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা পরিচয়পত্র বানানোর কৌশল নেয়ায় এ লক্ষ্য নষ্ট হতে চলেছে।’
তিনি বলেন, ‘ব্যবসার সাথে জড়িত নয় এমন জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীও পরিচয়পত্র বানাতে গতকাল বাজারে দৌড়ঝাঁপ করেছে। কতিপয় চিহ্নিত জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন জমা করার বিষয়টি বাজার ব্যবসায়ী সমিতি, পুলিশ ও বিজিবিকে অবহিত করা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সীতাকুণ্ড পৌরসদর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বাহার জানান, পরিচয়পত্র গ্রহণের ঘোষণার পর গতকাল সোমবার একদিনে এগারশ’ দোকান মালিক ও কর্মচারী পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন জমা করেছেন। এরমধ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী আবেদন করেছে কি না তা আমার জানা নেই।’ তবে এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘পরিচয়পত্র দেয়ার আগে ব্যাপকভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। শুধু বাজারের প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পরিচয়পত্র দেয়া হচ্ছে।’ জামায়াত-শিবিরের কোনো নেতাকর্মীকে পরিচয় পত্র দেয়া হবে না বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আবেদন যেই করুক, নাশকতায় জড়িত কেউ যদি পরিচয়পত্র নিতে আসে তাহলে তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হবে। এছাড়া দোকান কর্মচারীদের জন্য সংশ্লিষ্ট দোকান মালিকদের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নেয়া হচ্ছে।’
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম বদিউজ্জামান বলেন, ‘মহাসড়কে যানবাহনে আগুন, ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলাকারীদের আটক করতে গিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অনেক নিরীহ লোক আটক হচ্ছে। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন সেজন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী সমিতি যদি অপরাধী কাউকে পরিচয়পত্র দেয় তাহলে সে দায় সমিতিকে নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত ব্যবসায়ীকে যাতে পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়, জামায়াত-শিবির বা অপরাধী কেউ ব্যবসায়ী হিসেবে যাতে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে না পারে এ ব্যাপারে বাজার ব্যবসায়ী সমিতিকে ইতিমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে। আশা করি সমিতি যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পরিচয়পত্র প্রদান করবে।’
উল্লেখ্য, ১৮ দলীয় জোটের ডাকা তিন দফা হরতাল কর্মসূচির সমর্থনে জামায়াত-শিবির সীতাকুণ্ড উপজেলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলরত ৮৭টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ২০০ যানবাহন ভাঙচুর করেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় পুলিশসহ বহু সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে। তাদের তাণ্ডবে সীতাকুণ্ড এখন নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here