■ আবদুল গাফফার চৌধুরী
৪৩ বছর আগের কথা। পাকিস্তানি জমানার শেষ বছর। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাস। সামনেই সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন। শীতের মৌসুম। পূর্ব পাকিস্তানে প্রাকৃতিক ঝড়-বন্যার কোনো আশঙ্কা নেই এই মৌসুমে। আর তখনই ইসরাফিল ফেরেশতা যেন তাঁর প্রচণ্ড প্রলয়ের বাঁশিটি বাজালেন। ভয়াবহ সাইক্লোন আর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলবর্তী জেলাগুলোয় এক রাতে মারা গেল ১০ লাখ মানুষ।

শোকার্ত মানুষের আহাজারিতে সারা দেশের আকাশ-বাতাস ছেয়ে গিয়েছিল। আমি এ সময় ঢাকার অবজারভার হাউসের বাংলা দৈনিক ‘পূর্বদেশে’ সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে সারা দেশের লণ্ডভণ্ড চেহারা দেখে ‘পূর্বদেশের’ শোকসংখ্যায় একটি কবিতা লিখেছিলাম। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় কবিতাটি ছাপা হয়েছিল। এত দীর্ঘকাল পর গোটা কবিতাটি মনে নেই, কিন্তু প্রথম ও শেষের কয়েক লাইন এখনো মনে আছে।

বাঁচতে চাইলে বাঁচবে এমন কথা তো নেই
প্রমাণ পেলে তো হাতে হাতে,
দশ লাখ শিশু-নারী ও পুরুষ আজকে নেই
মরে গেছে তারা এক রাতে।
এই কবিতার শেষের দু লাইন হচ্ছে-
শুধু শোকসভা তারই নাম আজ বাংলাদেশ
হায়রে বাংলা, তোমার শোকের নেইকো শেষ!

৪৩ বছর পর গত বুধবারের (২৪ এপ্রিল) সাভার ট্র্যাজেডির ধ্বংসযজ্ঞ, অগুন্তি মৃতদেহ আর শোকার্ত পরিবার-পরিজনের আহাজারি দেখে নিজের কবিতার কয়েকটি লাইনই আমার মনে পড়েছিল। সেই সঙ্গে মনে এই প্রশ্নটিও জেগেছিল, বাংলাদেশের কপালে নিত্যনিয়ত এত দুর্গতি কেন? প্রকৃতি আর মানুষ একযোগে কেন বাংলাদেশের শত্রুতা করে চলেছে? এই শত্রুতার কি কোনো অবসান নেই?

৪৩ বছর আগে সাইক্লোন আর টাইডাল ওয়েভে এক রাতে ১০ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার কয়েক মাস পরই শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। শুরু হয় পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বর গণহত্যা। তাতে নিহত হয় ৩০ লাখ নর-নারী। তারপর স্বাধীনতার গত ৪২ বছরে প্রকৃতি ও মানুষ দুয়ের হাতেই মানুষ নিধন অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭৪ সালে শুধু অসৎ ব্যবসায়ী ও অসাধু রাজনীতিকদের চক্রান্তে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে মারা গেছে সরকারি হিসাবে এক লাখ মানুষ; বেসরকারি হিসাবে ছয় লাখ। মানুষের অবহেলা ও দুর্নীতির জন্য প্রতি বছর লঞ্চ ও সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয় কয়েক হাজার মানুষের। রাজনৈতিক সন্ত্রাসে, বিশেষ করে এক সময়ের বামসন্ত্রাস ও পরবর্তীকালে জামায়াত, বাংলাভাই ও অন্য মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের হাতে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে বলে একটি বেসরকারি হিসাবে বলা হয়েছে। এই নিহতদের মধ্যে দেশের প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিক ও সাংবাদিক রয়েছেন।

প্রকৃতির হাতে তো বাংলাদেশ নিত্যনিয়ত মার খাচ্ছেই; সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে মানুষের হাতেই দেশের মানুষের অব্যাহত নিগ্রহ ও মৃত্যুবরণ। বিএনপি-জামায়াতের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসের সঙ্গে পুলিশের গুলিবর্ষণ যোগ হয়ে গত কয়েক মাসেও অসংখ্য লোকের মৃত্যু হয়েছে। ধন-সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ একটি বড় যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির সমান। এত মৃত্যু ও ধ্বংসের ধাক্কা না সামলাতেই সাভারের এই মনুষ্য সৃষ্ট ট্র্যাজেডি। যার ক্ষয়ক্ষতি দেশ কত দিনে সামলাবে, তা আমার জানা নেই।

এ পর্যন্ত সাভারের ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় ৪০০-র মতো মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ৭০০-র মতো নর-নারী নিখোঁজ রয়েছে। এত দিনে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে ধরে নেওয়া হলে মৃতের সংখ্যা হাজারে পেঁৗছতে পারে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই হাজারের বেশি নারী-পুরুষ। তাদের অধিকাংশই শরীরের বিভিন্ন অংশ হারিয়ে জীবন্মৃত। অনেকেই হয়তো মারা যাবে। এত বড় ট্র্যাজেডি ঘটার একটি বড় কারণ রানা প্লাজা নামক বহুতল ভবনটিতে ফাটল ধরায় সেটিকে বিপজ্জনক ঘোষণা করার পরও তাতে বিভিন্ন অফিস ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোতে শ্রমিকদের আপত্তি সত্ত্বেও কাজ চালু রাখা। ফলে মানুষের লোভের বলি হলো কয়েক হাজার মানুষ। যার অধিকাংশই কর্মজীবী নারী। এই অপরাধ যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য। একইভাবে এই অপরাধের বিচার ও কঠোর দণ্ড হওয়া উচিত।

দুর্ঘটনা ঘটার পরপর রানা প্লাজার গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির একাধিক মালিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। কিন্তু ভবনের মূল মালিক সোহেল রানা পালিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। তা সত্ত্বেও জাতির এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য প্রচার চালানো হয় যে সোহেল রানা আওয়ামী লীগের লোক। প্রধানমন্ত্রী তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। রানাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে বাম মোর্চা, সিপিবি ও বাসদ ২ মে দেশে হরতাল ডেকে বসে। সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিও একই দিনে হরতাল ডাকে। ‘একেই নাচুনে বুড়ি, তার ওপর ঢোলের বাড়ি!’ বিএনপি হয়তো ভেবেছিল, তাদের ডাকে তো হরতাল হয় না, হয় সন্ত্রাস। এবার বাম মোর্চার কাঁধে চেপে একটা সফল হরতালের নজির তারা দেখাবে। বাম মোর্চা ও সিপিবি-বাসদও সমস্যায় পড়ে গিয়েছিল। হরতাল ডেকে বিএনপি-জামায়াতের খপ্পরে তারা পড়ে গিয়েছিল।

এক্ষণে পলাতক সোহেল রানাকে পুলিশ যথাসময়ে গ্রেপ্তার করতে পারায় বাম মোর্চার মুশকিল আসান হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের আলিঙ্গন তারা এড়াতে পেরেছে। অর্থাৎ হরতাল প্রত্যাহার করে সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। তাদের ভুলটা (অন্যায় নয়) হয়েছিল, পলাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তারের জন্য সরকারকে সময় না দিয়েই হরতাল ডাকা। এটা একটা ট্র্যাজেডির সময় গোঁদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো। সাভার ট্র্যাজেডি দেশের অর্থনীতির ওপর যে বিপর্যয় ডেকে এনেছে, তার ওপর তাড়াহুড়া করে হরতাল ডেকে আরো বিপর্যয় সৃষ্টি করা কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে না। পলাতক অভিযুক্ত বা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে সরকার সক্ষম হয় কি না, তা দেখার জন্য গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে হরতাল ডাকার জন্য বাম মোর্চা তথা সিপিবি-বাসদ দু-একটা দিন অপেক্ষা করলে ভালো করত। বিএনপি-জামায়াত তাহলে জনমতের ভয়ে এত শিগগির হরতাল ডাকার সাহস পেত না।

যা হোক, বামেদের তবু চৈতন্য ফিরেছে, তারা হরতাল প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু বিএনপি এখনো (আমার এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত) তাদের হরতালের ডাক প্রত্যাহার করেনি। সম্ভবত করবে না। যদি করে ভালো। নইলে প্রমাণ হবে, বিপন্ন মানবতার প্রতি দরদের জন্য নয়, রাজনৈতিক গরজে এই হরতাল তারা ডেকেছে। তারা ভাবছে, সাভার ট্র্যাজেডিতে ক্ষুব্ধ মানুষ হরতালের ডাকে এবার তো সাড়া দেবেই। যদি না দেয়, দোসর আছে জামায়াত, ভাঙচুরের সন্ত্রাস দ্বারা জনজীবনে আরো দুর্ভোগ সৃষ্টি করা তো যাবেই।

রানা প্লাজার মালিক ধৃত সোহেল রানা আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের কোনো নেতা-কর্মী কি না আমার জানা নেই। কিন্তু এটা নিয়ে কেন বিতর্ক সৃষ্টি হলো, তা আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির অগম্য। এক শ্রেণীর মিডিয়া সাভার ট্র্যাজেডির মূল হোতাব্যক্তি বা ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার বদলে তাদের আওয়ামী লীগার হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য কেন গলদঘর্ম হয়ে নেমেছে, তার ব্যাখ্যা কে দেবে? আর আওয়ামী লীগের নেতারাই বা কেন সোহেল রানা যে আওয়ামী লীগার (বা যুবলীগার) নয়, তা প্রমাণ করার জন্য এত সরব, তার কারণই বা কে দর্শাবে?

দেশ-বিদেশের অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যেই দুর্বৃত্তদের সন্ধান পাওয়া যায়। তারা চিহ্নিত হলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ব্যক্তির অপরাধের জন্য সমষ্টিগতভাবে কেউ কোনো রাজনৈতক দলকে দায়ী করে না। ব্রিটেনে লেবার পার্টির নেতা ও মন্ত্রী জনস্টোন হাউস ব্যাংকের অর্থ তসরুফ ও নিজের পরিচয় জালিয়াতির যে গুরুতর অপরাধ করেছিলেন, অথবা কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ও মন্ত্রী জন প্রফুমো পতিতা ও বিদেশি গোয়েন্দা চক্রের সঙ্গে জড়িত হওয়ার যে অপরাধ করেছিলেন, তার জন্য লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ পার্টি বা সরকারকে কেউ দোষারোপ করেনি। দুই নেতাকেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর দুদলের সরকারই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

বাংলাদেশে গোলাম আযমসহ যাদের বিচার চলছে, তাদের তো জামায়াত নেতা হিসেবে আটক করা হয়নি। করা হয়েছে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে। কোনো আওয়ামী লীগ নেতাও এই যুদ্ধাপরাধ করে থাকলে তাকেও আওয়ামী লীগার হিসেবে নয়, বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীদের একই ক্যাটাগরিভুক্ত অপরাধী হিসেবে বিচার করতে হবে। সাভার ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রেও সোহেল রানা একজন আওয়ামী লীগার কি না, সে কথা বড় নয়। বড় হলো, তার মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে ও তার সমগোত্রীয় অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

সুতরাং রাজনৈতিক মতলব থেকে যারা তাকে আওয়ামী লীগার বলে প্রচার করতে চাইছে, অর্থাৎ সাভার ট্র্যাজেডির জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করতে চাইছে, তাদের প্রচারণার একটিই জবাব, কেন বিএনপি সরকারের আমলে কি এই ট্র্যাজেডি (হোক ছোট) ঘটেনি? ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম নামে যে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির বাড়ি ধসে পড়ায় অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যু হয়, সেটির মালিক কি বিএনপির এক জাঁদরেল নেতার জামাই ছিলেন না? সেই দুর্ঘটনার দায়দায়িত্বও কি তাহলে বিএনপির ছিল?

সোহেল রানার দলীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া আওয়ামী লীগের মোটেই উচিত হয়নি। তাতে প্রচারণাটিতে তারা আরো সাহায্য জুগিয়েছে। আওয়ামী লীগের তো এই প্রচারণার জবাবে শুধু একটি কথা বলাই যথেষ্ট ছিল, সোহেল রানা আওয়ামী লীগ বা অন্য যেকোনো দলেরই লোক হোক না কেন, তাকে এখন একজন অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই অপরাধের জন্য তার বিচার হবে। এ ক্ষেত্রে তার দলীয় পরিচয় গৌণ।

সোহেল রানার দলীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কই প্রমাণ করে সাভার ট্র্যাজেডির মতো এত বড় জাতীয় দুর্যোগেও দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সুস্থ মানবিক চেতনাবোধের পরিচয় দেখাতে পারেনি। তাদের তুলনায় সাধারণ মানুষ, পেশা-নির্বিশেষে সব বয়সের নর-নারী ত্রাণকার্যে যে ঐক্য ও মানবতাবোধের পরিচয় দেখিয়েছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। রক্তদানের জন্য বিপুল মানুষের স্বেচ্ছায় ছুটে আসা, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ত্রাণকার্যে অংশগ্রহণ তার প্রমাণ।

আমাদের সেনাবাহিনীও এবার এই ট্র্যাজেডি মোকাবিলা করার ব্যাপারে এবং উদ্ধার ও ত্রাণকার্যে যে সাহস দেখিয়েছে, তা নিয়ে দেশের মানুষ গর্ব করতে পারে। সরকার যেমন এই ট্র্যাজেডি মোকাবিলায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে, তেমনি ফায়ার ব্রিগেড থেকে শুরু করে উদ্ধারকার্যে নিযুক্ত বাহিনীগুলোও তাদের আন্তরিকতা ও সাহসের প্রমাণ দিতে দ্বিধা করেনি। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে আহতদের পরিদর্শন করেছেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সম্মিলিতভাবে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here