মোড়লিপনার কাছে মাথা নোয়াবে না বাংলাদেশ

image_104842

সাবাশ বাংলাদেশ,/ এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/

জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।/

ক্রিকেটের কোনো ঘটনা কল্পনা করে নিশ্চয়ই সুকান্ত ভট্টাচার্য্য অমর এই লাইন ক’টি লেখেননি। কিন্তু গতকাল আইসিসির দুবাই সভার প্রথম দিনশেষে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অবস্থান এবং আইসিসির সিদ্ধান্ত দেখে এই লাইনগুলোর দৃপ্ত উচ্চারণ করার বিকল্প আর কিছু নেই।

যে বিসিবির মাথা নুইয়ে ফেলতে পারে এই আশঙ্কায় ক’দিন আগে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, যে বিসিবি ক্রিকেটের চেয়ে টাকাকে বড় করে দেখে বলেও সমালোচনা হয়েছে; গতকাল মঙ্গলবার ভারতের মতো ক্রিকেট পরাশক্তির দফায় দফায় হুমকি উপেক্ষা করে সেই বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপনই দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে ভারতের সংস্কার প্রস্তাবের বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এবং টেস্ট খেলার অধিকারটা ধরে রেখেছেন।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমই পরিষ্কার বলেছে, আইসিসির এই বাংলাদেশের স্বার্থ ও ক্রিকেটকে ধ্বংস করে ফেলার মতো সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সভা শুরুর আগের দিন থেকেই ভারতীয় ক্রিকেট কর্মকর্তারা প্রলোভন, উপঢৌকনের পথ ধরে বিসিবি সভাপতিকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। তাতে কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনলাইনে বিসিবি সভাপতিকে পরিষ্কার হুমকি দেন ভারতীয় বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসন, ‘আপনারা আমাদের পক্ষে না এলে আমরা এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যাবো না। তখন কী করবেন?’

এই হুমকিতে পাপন যে ভেঙে পড়েননি, তার প্রমাণ গতকাল সকালেই পাওয়া গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড নিয়ে ‘সংস্কার বিরোধী’ যে জোট আত্মপ্রকাশ করেছে, তাতে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। শুধু এটুকুই নয়, আইসিসি সভায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি, সংসদ সদস্য পাপন কঠোরভাবে কথিত সংস্কারের বিরোধিতা করেছেন। সেই সঙ্গে নিজেদের টেস্ট খেলার সুযোগ নষ্ট হয়- এমন কোনো সংস্কারে সই করবে না বলে বাংলাদেশ সকালেই আইসিসিকে চিঠি দেয়। এই খবর নিশ্চিত করেছেন দুবাইতে অবস্থানরত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। এর ফল হিসাবেই দিনশেষে বাংলাদেশের টেস্ট খেলার অধিকার অক্ষুণ্ন্ন রেখেই প্রাথমিকভাবে আইসিসি সংস্কার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। প্রায় একই কথা জানানো হয়েছে বিসিবির পক্ষ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। সেখানে বিসিবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজনকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, ‘আমরা আইসিসিকে পরিষ্কার বলেছি যে, বাংলাদেশের টেস্ট খেলার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং পূর্ণ সদস্য হিসাবে কোনো অধিকার নষ্ট হয়, এমন আইনে সই করবো না। এমন দাবি তোলা একমাত্র দেশ ছিল বিসিবি।’

বাংলাদেশের এই অবস্থান যে কার্যকর হয়েছে, সেটা বোঝা গেছে দিনশেষে আইসিসির পাঠানো ‘সর্বসম্মত’ সিদ্ধান্তগুলো দেখে। সংস্কার প্রস্তাবের বাকি সব অংশ সর্বসম্মতভাবে পাস হলেও বাংলাদেশের স্বার্থ ছিল যে দুটি ব্যাপারে- টেস্টের দু স্তর বাতিল এবং ভবিষ্যত্ সফরসূচি চালু রাখা- এ দুটি প্রস্তাবই আইসিসি মেনে নিয়েছে। ফলে এখন যে সংস্কার দাঁড়ালো, তাতে আর সরাসরি বাংলাদেশের স্বার্থ লঙ্ঘিত হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, এ মাসের মাঝামাঝি হঠাত্ করে আলোচনায় চলে আসে আইসিসির এই সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়টি। আইসিসির এই সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী আইসিসির ভবিষ্যত্ নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংলিশ ক্রিকেট বোর্ডের হাতে। তাদেরই প্রতিনিধি পর্যায়ক্রমে আইসিসির চেয়ারম্যান হবেন। এই তিন বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত এক্সকোই আইসিসির সব প্রস্তাব অনুমোদন-খারিজের অধিকার রাখবে। এই তিন দেশ আইসিসির আয়ের শতকরা ৮০ ভাগ প্রাপ্য হবেন এবং প্রস্তাবিত টেস্ট আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৫ থেকে কমপক্ষে চার বছর আর টেস্ট খেলতে পারবে না।

এক্সকোর ব্যাপারটি মেনে নিয়েছে আইসিসির সব সদস্য। সভাপতি অ্যালান আইস্যাককে উদ্ধৃত করে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেছে, তিন স্থায়ীসদস্যসহ পাঁচ সদস্যের এক্সকো হবে। অর্থের বন্টন সরাসরি ওই তিন দেশের দাবিমত না হলেও তাদের আয় বাড়বে; তবে বাকি বোর্ডগুলো মূল আয়ের সমান ভাগই পাবে। এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি দেশ যোগ্যতা অনুসারে টেস্ট খেলবে। এখানে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না কোনো দলকে বা কোনো দলকে খেলা থেকে বিরত রাখা হবে না।’

টেস্ট স্ট্যাটাস রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে মির্জা ফখরুলের আহ্বান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কষ্টার্জিত টেস্ট স্ট্যাটাস রক্ষায় সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য বিসিবিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রেমী জনগণের অনুভূতির প্রতি মির্জা আলমগীর সহানুভূতি ও একাত্মতা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে তিনি দুইটি প্রস্তাবে বলেন, আসন্ন আইসিসি সভায় বিসিবি’র পক্ষ থেকে সরাসরি ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের প্রস্তাবিত দ্বিস্তর বিশিষ্ট টেস্ট ম্যাচের নামে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পুনরায় বোর্ডের সভা ডেকে এ বিষয়ে লিখিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্তের বিষয় জনসমুক্ষে প্রকাশের পাশাপাশি বিসিবির ওয়েব সাইটেও প্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস রক্ষায় প্রয়োজনে বিসিবিকে ঐ তিন দেশের প্রস্তাবের বিরোধী দেশগুলোকে সাথে নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা দেশগুলোর সমর্থন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

গতকাল বিবৃতিতে ফখরুল বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করছি যে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের কষ্টার্জিত টেস্ট স্ট্যাটাস হুমকির মুখে ফেলতে সমপ্রতি ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে আইসিসিতে দ্বিস্তর বিশিষ্ট টেস্ট ক্রিকেটের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব পাশ হলে বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়েকে আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্থান, নেদারল্যান্ড এবং কেনিয়ার সাথে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ খেলে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে দেশের ক্রিকেট প্রেমিক সাধারণ মানুষ আইসিসিতে ওঠা প্রস্তাব এবং বিসিবিতে নেয়া সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, বিসিবি’র বোর্ড সভায় নেয়া লিখিত সিদ্ধান্ত যা আইসিসিতে উপস্থাপন করা হবে, তা দেশের জনসাধারণের কাছে উপস্থাপন না করে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেয়ায় সমগ্র বাংলাদেশী ক্রিকেট প্রেমিদের মধ্যে তীব্র হতাশা, ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। 

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here