জনতার নিউজঃ

সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী আজাদ গ্রেপ্তার

 গ্রেপ্তার হওয়া বিল্লাল ও আজাদ

বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আবুল কালাম আজাদ ও বিল্লালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজাদ এ মামলার প্রধান আসামি সাফাত আহমেদের দেহরক্ষী, বিল্লাল সাফাতের গাড়িচালক। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের একটি আবাসিক হোটেল থেকে বিল্লালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। মহাখালী এলাকা থেকে আজাদকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ভুক্তভোগী তরুণীদের অভিযোগ, ঘটনার সময় বিল্লাল ভিডিও ধারণ করেছে। আজাদ তাদের দিকে অস্ত্র তাক করে রেখেছিল।

র‌্যাব-১০-এর পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর গত রাতে সাংবাদিকদের বলেন, বনানীর ধর্ষণ মামলার চার নম্বর আসামি বিল্লালকে সন্ধ্যা ৬টার দিকে নবাবপুর  রোডের দ্য নিউ ঢাকা বোর্ডিং থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, মামলার পাঁচ নম্বর আসামি আবুল কালাম আজাদ ওরফে রহমত আলীকে মহাখালী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

এ দুজনকে নিয়ে এ মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। গত বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে মামলার প্রধান আসামি সাফাত ও তিন নম্বর আসামি সাদমান সাকিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার দ্বিতীয় আসামি নাঈম আশরাফ এখনো পলাতক রয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর সাফাতকে ছয় দিনের এবং সাদমানকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের ঘটনার আগে অস্ত্র দিয়ে দুই শিক্ষার্থীকে ভয় দেখানোর কথা স্বীকার করেছে সাফাত আহমেদ। গতকাল রিমান্ডের তৃতীয় দিনে এ তথ্য দিয়েছে সে। তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ এখনো সেই অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি। সাফাত জানিয়েছে, অস্ত্রটির মালিক নাঈম। সেটি তাঁর কাছেই আছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

সাফাতকে জিজ্ঞাসাবাদকারী তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের সময় সাফাতের দেহরক্ষী আজাদের কাছে একটি শটগান ছিল। দুই শিক্ষার্থী কথা না শুনলে একপর্যায়ে ওই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় সাফাত ও নাঈমরা। অস্ত্রটির মালিকও নাঈম। অস্ত্রটি তাঁর কাছেই আছে। তবে অস্ত্রটি বৈধ, না অবৈধ সে বিষয়ে সাফাত জিজ্ঞাসাবাদে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

যেভাবে বিল্লাল গ্রেপ্তার : বিল্লালকে গ্রেপ্তারের পর গত রাতে কারওয়ান বাজার ক্যাম্প অফিসে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে র‌্যাব। ব্রিফিংয়ে র‌্যাব-১০-এর পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর জানান, ঘটনার দিন বিল্লাল ওই দুই শিক্ষার্থীকে গাড়িতে করে হোটেল রেইনট্রিতে সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে নিয়ে যায়। সে সময় বিল্লালের সঙ্গে আজাদও ছিল।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশের পরপরই বিল্লাল আত্মগোপনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সাফাত ও সাদমানের সঙ্গে সেও (বিল্লাল) সিলেটে পালিয়েছিল।  (সোমবার) সকালেই সিলেট থেকে ঢাকায় ফিরে সে ওই হোটেলে ওঠে। এরপর হোটেলে তার পরিচিতদের ডেকে এনে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেয়। আগাম জামিন নিতে হোটেলে বসেই আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিল্লাল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে জানায়, ২৮ মার্চ বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সে সাফাতকে নিয়ে রেইনট্রি হোটেলের অষ্টম তলায় ভাড়া করা রুমে যায়। সাফাতকে হোটেলে রেখে সে গুলশান-২ নম্বর থেকে এক তরুণীকে এবং বনানীর ১১ নম্বর থেকে আরেক তরুণীকে নিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রেইনট্রি হোটেলে সাফাতের কাছে দিয়ে আসে। তারা দুজন সাফাতের বান্ধবী। ওই সময় সে সাফাতের সঙ্গে আবু নাইম নামের আরেক বন্ধুকেও দেখতে পায়। এরপর সে (বিল্লাল) হোটেলের নিচে এসে সোয়া ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। হোটেল থেকে সাফাত তাকে ফোন দিয়ে তার দেহরক্ষী আজাদকে নিয়ে আসতে বলে। সে (বিল্লাল) আজাদকে সঙ্গে নিয়ে দুই শিক্ষার্থীকে তাদের বাসা থেকে নিয়ে গাড়িতে করে রাত সাড়ে ৯টার দিকে রেইনট্রি হোটেলে যায়। পরে সে সবাইকে নিয়ে হোটেল রেইনট্রির টপ ফ্লোরে যায়। এরপর শুরুতে সে যে দুই তরুণীকে নিয়ে এসেছিল তাদের নামিয়ে দিয়ে আসে। পরে বিজয়নগর গিয়ে সাফাতের আরেক বান্ধবীকে নিয়ে এসে তাকেও হোটেলের টপ ফ্লোরে নিয়ে যায়। সেখানে সে সাফাত ও সাদমানের সঙ্গে দুই শিক্ষার্থীকে সুইমিং পুলে দেখে। সেখানে দুই শিক্ষার্থীর আরেক বন্ধুও (পেশায় ডাক্তার) ছিল। এরপর বিল্লাল গাড়ি বাসায় রেখে আবার যখন হোটেলে আসে তখন রাত আনুমানিক ৪টা। তারপর সাফাত তাকে তার রুমে আসতে বলে। সেখানে যাওয়ার পর বিল্লালকে বাথরুমে যেখানে ফলস পার্টিশন দেওয়া সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখে সাফাত। এ সময় এক রুমে সাফাত, অন্য রুমে নাঈম ও সাদমান দুই তরুণীকে ধর্ষণ করে। এরপর পাশের রুম থেকে দুই তরুণীর ওই বন্ধুকে ডেকে এনে তাদের (দুই শিক্ষার্থীকে) গর্ভনিরোধক পিল খাওয়াতে বলে। তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁকে ইয়াবা দিয়ে চালান দেওয়ার ভয় দেখানোসহ মারপিট করতে থাকে সাফাতরা। এ সময় সে (বিল্লাল) পুরো ঘটনা ভিডিও করে। ধর্ষণের সময়ও সে দুই বাথরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করে। পরে মামলার খবর দেখে সাফাত, সাদমান, আজাদকে নিয়ে সে গাড়িতে করে এয়ারপোর্টের দিকে যায়। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে গাজীপুর হয়ে মাওনা দিয়ে সিলেট চলে যায়। সাফাত ও সাদমান সেখানে সাফাতের নানাবাড়িতে থাকে। আজাদসহ সে (বিল্লাল) একটি রিসোর্টে থাকে। পরে আজাদ কোথায় গেছে সে আর বলতে পারে না। সেখান থেকে সে (বিল্লাল) ছাতক যায়। ছাতক থেকে আবার সিলেটে যায়। সিলেট থেকে  (সোমবার) ভোরে ঢাকায় এসে বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে নবাবপুর এলাকায় ওই বোর্ডিংয়ে ওঠে।

বিল্লালের পরিচয় সম্পর্কে র‌্যাব জানায়, বিল্লালের বাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রামের দাড়িডোমা গ্রামে, তার বাবার নাম সিরাজুল ইসলাম। ঢাকায় সে থাকত উত্তর বাড্ডায়।

আজাদ যেভাবে গ্রেপ্তার : ডিবি সূত্র জানায়, তদন্তের এক পর্যায়ে তারা জানতে পারে আজাদ ঢাকাতেই আছে। এরপর অবস্থান নিশ্চিত হয়ে গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে ১০টি গুলিসহ একটি শটগান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অস্ত্রটির লাইসেন্স আছে কি না তা আমরা খতিয়ে  দেখব। ’

ডিবি সূত্র জানায়, ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. শাহজাহান ও সহকারী কমিশনার সাকলাইন এই অভিযান পরিচালনা করেন।

এডিসি শাহজাহান বলেন, ঘটনার পর থেকে আজাদ বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে ছিল।  (সোমবার) তার এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিল। আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে ওই এলাকায় আগে থেকে অস্থান করে তাকে গ্রেপ্তার করি।

চারজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ : তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাফাত বাঁচার জন্য রিমান্ডে কখনো কখনো মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে সাদমান, বিল্লাল ও আজাদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে। এ জন্য তাদের সবাইকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ইতিমধ্যে সাফাত ও সাদমান রিমান্ডে যেসব তথ্য দিয়েছে তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একাধিক টিম কাজ করছে।

রেইনট্রির সিসিটিভি সার্ভার জব্দ : ধর্ষণের ঘটনাস্থল হোটেল রেইট্রির ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) সব ফুটেজ এখন তদন্তসংশ্লিষ্টদের হাতে। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ওই হোটেলের সব সিসিটিভির ফুটেজ ডিবি ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের যৌথ টিম উদ্ধার করেছে। সে সব ফুটেজ এখন সিআইডির ডিজিটাল ল্যাবে। সিআইডির দুটি টিম ফরেনসিক পরীক্ষাগারে তরুণীদের ব্যবহৃত পোশাক থেকে আসামিদের ডিএনএ শনাক্তকরণ, হোটেলে আসামিদের উপস্থিতি ও বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের ডিজিটাল পরীক্ষা করছে। যদিও ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে রেইনট্রি কর্তৃপক্ষ ফুটেজ সংরক্ষণের কথা বারবার অস্বীকার করেছে।

আপন জুয়েলার্স ও রেইনট্রির কর্তৃপক্ষকে তলব : আপন জুয়েলার্সের মালিকপক্ষ ও রেইনট্রি হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) তলব করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গত রবিবার রাজধানীতে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা মূল্যের সোনা ও হীরা আটক করে শুল্ক গোয়েন্দারা। তাদের ভাষ্য মতে, এগুলো ব্যাখ্যাহীনভাবে আপন জুয়েলার্সের কাছে মজুদ রাখা ছিল। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে দিলদার আহমেদসহ আপন জুয়েলার্সের অন্য মালিকদের এবং অবৈধভাবে মদ রাখার দায়ে রেইনট্রি হোটেলের এমডিকে  বুধবার তলব করা হয়েছে।

গুলশান ২ নম্বর সার্কেলের সুবাস্তু টাওয়ারে আপন জুয়েলার্সের আরেকটি বিক্রয়কেন্দ্রে গতকাল অভিযান চালিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দারা। গত রবিবার গুলশান এলাকায় বিপণিবিতানগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সুবাস্তু টাওয়ারের শোরুমটি তালাবদ্ধ ছিল। পরে সেটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। গতকাল সেখানে অভিযান চালানো হয়।

গতকাল শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান সাংবাদিকদের বলেন, উভয় পক্ষকে বুধবার সকাল ১১টায় শুল্ক গোয়েন্দার কাকরাইলের সদর দপ্তরে কাগজপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়েছে।

ধর্ষণের ঘটনায় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার নির্দেশে তদন্ত সহায়ক চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনার পর বনানী থানায় মামলা গ্রহণে গড়িমসি ও তরুণীদের হয়রানির অভিযোগ বিষয়েও একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। ইতিমধ্যে এ কমিটি বনানী থানার ওসি ফরমান আলীকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

জানতে চাইলে জিজ্ঞাসাবাদের সত্যতা স্বীকার করে বনানী থানার ওসি ফরমান আলী  বলেন, ‘স্যাররা তো আমাকে ঘটনার পর থেকেই দৌড়ের ওপর রেখেছেন। স্যাররা ঘটনার পর থেকে আমাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ’ ওসি ফরমান আলীর বিরুদ্ধে মামলা নিতে বিলম্ব, ২৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগসহ আরো যেসব প্রশ্ন উঠেছে সেসব নিয়েই তাঁকে প্রশ্ন করা হয় বলে তিনি জানান। তবে তাঁর দাবি, যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here