netriনির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে শেষ চেষ্টায় নেমেছে সরকার। সমঝোতা হলে প্রয়োজনে নির্বাচনের তফসিল পুনর্নির্ধারিত হবে। এমনকি উভয় দল চাইলে আবারও সংসদ অধিবেশন বসতে পারে। আর শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হলে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ীই নির্বাচন সম্পন্ন হবে। দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন সম্ভব সরকার তা করে দেখাবে। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমঝোতার লক্ষ্যে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে কোন অবনতি না হয়, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকসহ সোমবার দফায় দফায় বৈঠকে বসেন তিনি। মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের পর অনুষ্ঠিত বৈঠকে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচনকালীন সরকারের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের শুরুতে এক বর্ষীয়ান নেতার তোপের মুখে পড়েন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। দীর্ঘদিন পর মন্ত্রিসভায় এসে প্রথম বৈঠকে তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ফখরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর বৈঠক নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, আসলে এটি কী? জবাবে সৈয়দ আশরাফ বলেন, বৈঠক হয়েছে এটি ঠিক। এমনকি তারা কিছু প্রস্তাবও দিয়েছে। এমন সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি যে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছেন তাও বলেন। তখন মন্ত্রিসভার সদস্যরা অবগত হন যে উভয় সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং উভয়পক্ষ শর্ত দিয়েছে।
অপর এক সূত্র জানায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ নির্বাচনপূর্ব এই সরকারে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকবেন না। নির্বাচন পিছিয়ে দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠিত করতে হবে। তাদের এ জাতীয় শর্তের প্রেক্ষিতে সৈয়দ আশরাফ বলেন, এখন একটা পর্যায়ে চলে এসেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনাকে সরানো সম্ভব নয়। অনেক দেরি করে আপনারা এ প্রস্তাব দিয়েছেন। আগে থেকে প্রস্তাব এলে এটি করা যেতে পারত। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই পদ ছেড়ে দিতেন। তিনি বলেন, আমি আপনার জায়গায় থাকলেও হয়ত একই কথা বলতাম। এটি রাজনৈতিক আলাপ। আসুন এগুলো ছেড়ে যে ফাঁকফোকর রয়েছে তা বন্ধ করি। আলোচনার মাধ্যমে এগুলোর একটি সমাধানে আসা যেতে পারে। জানা গেছে, সৈয়দ আশরাফের এই বক্তব্যের পর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে মির্জা ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকলেও তাঁর একক কোন ক্ষমতা থাকবে না। মন্ত্রিপরিষদ নির্বাহী আদেশে দেশ চালাবে। যে কোন সিদ্ধান্ত মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে বসে নেবে। তাদের এই পাল্টা প্রস্তাবে সমঝোতার একটা সম্ভাবনা দেখছে সরকার।
সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আশা করি বিএনপি নির্বাচনে আসবে। আমরা সব দলের অংশগ্রহণ চাই। আপনারা সবাই সেভাবে কাজ করবেন। বিরোধী দল যাতে নির্বাচনে আসে যার যার দিক থেকে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। এ ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা করবেন। যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে এবং নির্বাচনে ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ ভোট কেন্দ্রে এসে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনই একমাত্র পথ। আমরা প্রমাণ করতে চাই রাজনৈতিক সরকারের অধীনেও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে। আমরা সরকারের দায়িত্ব নিয়ে যে নির্বচানগুলো সম্পন্ন করেছি, তার সবই নিরপেক্ষভাবে করেছি। কোন নির্বাচন নিয়ে কেউ বিতর্ক তুলতে পারেনি। এমনকি প্রথমদিকে দুই-একটি নির্বাচনের দিন সকালে বিএনপি নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে না বলে অভিযোগ তুললেও বিকেলে তা পাল্টে গেছে। আমাদের করা প্রতিটি নির্বাচনের ফল বিএনপি মেনে নিয়েছে। কোন একটি নির্বাচনের ফল তারা প্রত্যাখ্যান পর্যন্ত করেনি। এখন আমরা প্রমাণ করে দেখাব দলীয় সরকারের অধীনেও জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে।
সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক শেষে সিনিয়র নেতাদের নিয়ে আবারও বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বৈঠকেও তিনি সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দেন। জানা গেছে, এই বৈঠকে তিনি বলেন, সমঝোতা হলে তাদের কথা অনুযায়ী নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া যেতে পারে। সে লক্ষ্যে তফসিল পুনর্নির্ধারণও করা হবে। এমনকি প্রয়োজন হলে উভয় দলের সম্মতিতে আবারও সংসদ অধিবেশন বসতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অনেক কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু আলোচনায় আসতে হবে এবং তা হতে হবে গঠনমূলক। তিনি বলেন, আমরা রাজনীতি করি দেশ বাঁচাতে। তাই দেশের মঙ্গলের জন্য আমরা সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছি।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর সমঝোতা না হলে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ীই নির্বাচন সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, যে কোন নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। আসন্ন নির্বাচনে যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত থাকে সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি জনগণকেও সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তফসিল ঘোষণার পর দেশ অচল করে দেবে বিরোধী দলের এমন বক্তব্যের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তৎপর রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতির আলোকে যে কোন সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নির্দেশ মোতাবেক তারা প্রস্তুত রয়েছে।
ডিএনএ আইন ॥ অপরাধী চিহ্নিত করা, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব নিরূপণ কিংবা মৃতদেহ শনাক্ত করার মতো কাজে ডিএনএ পরীক্ষা ও সংরক্ষণের বিষয়টি আইনী কাঠামোর মধ্যে আনতে আইন করার প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ আইন ভাঙলে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদ- এবং ৩ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত খসড়ায়। সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ‘ডি-অক্সি-রাইবোনিউক্লিক এ্যাসিড (ডিএনএ) আইন-২০১৩’ এর খসড়ায় এ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। অবশ্য আপাতত নির্বাচনের আগে আর সংসদ বসার সম্ভাবনা না থাকায় এ আইন পাসের জন্য নির্বাচনের পর নতুন সংসদে তুলতে হবে।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি পরীক্ষাগার থাকলেও এ বিষয়ে কোন আইন ছিল না। কিভাবে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে, এ পরীক্ষার ডেটাবেজ কিভাবে সংরক্ষণ করা হবে, পরীক্ষার পদ্ধতি, পরীক্ষার গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ, ল্যাবরেটরির মান, প্রশাসনিক ব্যবস্থাÑ সব বিষয় একটি কাঠামোয় নিয়ে আসতে এ আইন করা হচ্ছে।
আইনটি পাস হলে কোন ব্যক্তি বা সংস্থা সরকারের অনুমোদন ছাড়া ডিএনএ পরীক্ষা বা সংরক্ষণ করতে পারবে না। এ আইন ভাঙলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদ-ের পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদন ছাড়া ডিএনএ প্রোফাইলিং করলে দুই থেকে পাঁচ বছর কারাদ- এবং ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অনুমোদন ছাড়া ডিএনএর তথ্য প্রকাশ করলে তিন বছরের জেল ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং ডিএনএ নমুনা ধ্বংস, দূষিত বা নষ্ট করলে তিন থেকে সাত বছরের কারাদ- এবং ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ আইনের আওতায় একটি জাতীয় (ন্যাশনাল) তথ্যভা-ার তৈরি করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে সবার ডিএনএ নমুনা ও তথ্যভা-ারে রাখা হবে। এই ডেটাবেজের গোপনীয়তা রক্ষার কথাও প্রস্তাবিত আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া এই তথ্যভা-ারে প্রবেশ করলে দুই বছর কারাদ- এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানারও বিধান রাখা হয়েছে।
এ আইনের আওতায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি অধিদফতর করা হবে। অধিদফতরের আওতায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি হবে, যাতে সদস্য হিসেবে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও থাকবেন। অধিদফতর না হওয়া পর্যন্ত মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সেল গঠন করে কার্যক্রম চালানো হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান। প্রতিটি জীবকোষের নিউক্লিয়াসে থাকে ক্রোমোজোম, যা গঠিত হয় ডি-অক্সি-রাইবোনিউক্লিক এ্যাসিড, প্রোটিন ও রাইবোনিউক্লিক এ্যাসিড দিয়ে। এর মধ্যে ডিএনএকে বলা হয় বংশগতির বাহক। অর্থাৎ জীবদেহের গঠন ও ক্রিয়াকলাপ কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তা এই ডিএনএর জিন বিন্যাসের ওপরই নির্ভর করে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং পরীক্ষাগারে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের সময় সাধারণত ১৬টি নির্দেশক (এসটিআর মার্কার) ব্যবহার করা হয়।
একজন ব্যক্তির ডিএনএর রাসায়নিক বিশ্লেষণ করলে প্রতিটি নির্দেশকের বিপরীতে দুটি করে পৃথক সংখ্যা পাওয়া যায়, যার প্রতিটি ওই ব্যক্তির একেকটি বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে। ১৬টি নির্দেশকের ৩২টি সংখ্যা মিলেই তৈরি হয় ওই ব্যক্তির ডিএনএ রূপরেখা। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে এই রূপরেখা হয় আলাদা। ফলে কোন অপরাধ সংঘটনের স্থানে নমুনা হিসেবে পাওয়া রক্ত, ত্বক, দেহের অংশ এমনকি চুল থেকে ডিএনএ পরীক্ষা করেও অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। আবার দুই ব্যক্তির ডিএনএ রূপরেখা, অর্থাৎ একজনের ডিএনএ পরীক্ষায় পাওয়া ৩২টি সংখ্যার সঙ্গে অন্যজনের সংখ্যা মিলিয়ে দেখলেই বাবা-মা বা আত্মীয়তার সম্পর্ক বলে দিতে পারেন বিজ্ঞানীরা। ধর্ষণের অভিযোগ বা পিতৃত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশে আগে থেকেই পরিচিত। সম্প্রতি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার সাহায্য নেয়া হয়েছে, যদিও কোন ইতিবাচক ফল তারা এখনও দেখাতে পারেনি।
এ ছাড়া তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকা- ও রানা প্লাজা ধসে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তরের জন্যও ডিএনএ পরীক্ষা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং পরীক্ষাগারে। রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, খুলনা ও ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজেও ডিএনএ ল্যাবরেটরি রয়েছে, যেখানে ডিএনএ স্ক্রিনিং করা যায়। এ সব ল্যাবরেটরির কার্যক্রমও ডিএনএ আইনের আওতায় আসবে

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here