fire‘ওই দ্যাখেন, আমার বোনটার জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার বোন যদি না বাঁচে, তাইলে আমি কিন্তু সব নেতা-নেত্রীর ঘরে ঘরে ঢুইক্যা আগুন জ্বালাইয়া দিব। তারপর আমরা পরিবারের সবাই শাহবাগে গিয়া গায়ে আগুন দিয়া আত্মহত্যা করব।’ চিৎকার করে কথাগুলো বলতে বলতেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন টুকু। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অপু উকিল। মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউর করিডরে গতকাল শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টার দৃশ্য এটি। টুকুর বোন ঢাকা বারের আইনজীবী খোদেজা নাসরিন আক্তার সেলিনা তখন আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
টুকুর পাশে বসে আগে থেকেই বিলাপ করছিলেন পারভীন বেগম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ভাই রাজ্জাকও আছিল ওই বাসটায়, এহনতে আমার ভাইডাও বাঁচব কী মরব বুঝতাছি না, আমনেরা আমার ভাইডারে বাঁচান।’ একটু থেমে পারভীন আবার চিৎকার করে ওঠেন, ‘আমরা ওগো বিচার চাই, সরকারের বিচার দিয়া বাঁচতে পারলেও আল্লার বিচার দিয়া ওরা বাঁচত না।’
পারভীন জানান, তাঁর ভাই রাজ্জাক একটি প্রাইভেট গাড়ির চালক। থাকেন পুরান ঢাকায়। গাড়ির মালিক তাঁকে ডেকে পাঠানোয় ওই বাসটিতে চড়ে তিনি মালিকের বাসায় যাচ্ছিলেন।
অ্যাডভোকেট সেলিনা বা গাড়িচালক রাজ্জাকই নন, গতকাল বার্ন ইউনিটে আইসিইউর লাইভ সাপোর্টে থাকা বেশির ভাগের অবস্থায়ই ছিল প্রায় একই রকম। আর তাঁদের জীবন বাঁচাতে ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন চিকিৎসকরা। বিরোধী জোটের অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় শিশু পার্কের সামনে বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে নিক্ষিপ্ত পেট্রলবোমার আগুনে দগ্ধ হয় চালকসহ ১৮ যাত্রী। এর মধ্যে নাহিদ নামের একজন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যান। গতকাল বিকেলে মারা যান রবিন নামে আরো একজন।
গতকাল হাসপাতালজুড়ে ছিল জ্বলে-পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্বজনদের আবেগঘন বিলাপ-আহাজারী। সবার মুখেই ছিল এ পৈশাচিক হামলাকারীদের বিচারের দাবি আর আক্রান্ত স্বজনদের বাঁচানোর আকুতি। হাসপাতালের নিচতলা-দোতলাসহ অন্যান্য ওয়ার্ডেও দেখা যায় একই ধরনের বিলাপের দৃশ্য।
দুপুর পৌনে ২টায় আইসিইউ থেকে বেরিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক হোসাইন ইমাম জানান, অতিমাত্রায় দগ্ধ রবিন, অ্যাডভোকেট সেলিনা, বাসের চালক মাহাবুব, আরেক যাত্রী জাহাঙ্গীরসহ আরো চার-পাঁচজনের অবস্থা খুবই খারাপ। যখন তখন তাঁদের যে কারো যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে।
বিকেল ৩টায় একই চিকিৎসক বলেন, ‘পারলাম না ভাই। অনেক চেষ্টা করেও বাঁচানো গেল না আগের দিন মারা যাওয়া নাহিদের ভাই রবিনকে। কয়েক মিনিট আগে ওই ছেলেটাও মারা গেল।’
এই খবরে আইসিইউসহ পুরো বার্ন ইউনিট এলাকায় অপেক্ষমাণ অন্য রোগীদের স্বজনসহ সবাই আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ে স্বজনের পরিণতির কথা ভেবে। কেউ কেউ ছুটে যায় স্বজনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে। ব্যস্ততার মধ্যেই চিকিৎসকরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন সাধ্যমতো।
নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা অগ্নিদগ্ধ মাসুমা আক্তারের ভাই একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ডাক্তারদের ওপর। এ সময় আইসিইউতে উপস্থিত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। চিকিৎসকরা সাধ্যমতো চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু আগুনে নাহিদ ও রবিনের ভেতরের অবস্থা এতই খারাপ হয়ে পড়েছিল যে তাদের বাঁচানো যায়নি। একই অবস্থা আরো কয়েকজনের।
এদিকে লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন না হলেও অগ্নিদগ্ধ বেশ কয়েকজনের শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মারাত্মকভাবে। তাদের মধ্যে রয়েছেন একুশে টেলিভিশনের মুক্ত খবর টিমের সদস্য সুস্মিতা সেন ও তাঁর মা গীতা সেন। চিকিৎসকরা জানান, সুস্মিতার শরীরের ৭ শতাংশ এবং তাঁর মায়ের ১১ শতাংশ পুড়ে গেছে। এ ছাড়া ওই বাসের দগ্ধ যাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম, পুলিশ কনস্টেবল নুরুন্নবী, ঢাকা কলেজের ছাত্র অহিদুর রহমান বাবু, বাস চালকের সহকারী হাফিজুল ইসলাম ও শামীম, রিয়াদ, রাহাজুলসহ আরো তিনজন।
এদিকে কেবল বৃহস্পতিবারের ঘটনা ছাড়াও এর আগে গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির নামে বাস-অটোরিকশাসহ বিভিন্ন পরিবহনে চোরাগোপ্তা বোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগে দগ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে থাকা অনেকেই রয়েছে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে। তাদের মধ্যে কারো কারো অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। আবার যারা শঙ্কামুক্ত হয়েছে তাদের অনেকেরই চিরতরে শারীরিক অক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এসব রোগীর পরিবার-পরিজনের কণ্ঠে বারবারই ঝরে পড়ছিল দেশের রাজনীতির ওপর তীব্র ক্ষোভ। তারা বিচার চায় এসব নারকীয় ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি এই চিকিৎসা ব্যয় সামাল দিতে পারছে না বলেও জানায় কেউ কেউ। গতকাল বার্ন ইউনিটের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানা যায় এমন পরিস্থিতি।
বোমা হামলায় ঝলসে যাওয়া আব্দুর রহিম পথে পথে ফুল বিক্রি করে মা ও ভাইবোনদের নিয়ে সংসার চালাত। গত ১২ নভেম্বর রায়েরবাগে হরতালকারীদের ছোড়া বোমার আগুনে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। গতকালও তাকে দেখা যায় পুরো শরীরের ব্যান্ডেজ পেঁচানো অবস্থায় উপুড় হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে। পাশে বসে থাকা বোন নাসিমার কাছে বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে কান্নার রোল তুলে তিনি বলেন, ‘আমার ভাইডা ফুল বেইচ্যা আমাগো পেট চালাইত। এহনতে আমগো সব শ্যাষ অইগ্যা গ্যাছে গা।’
গত ১০ নভেম্বর লক্ষ্মীবাজারে বোমায় ঝলসে যাওয়া কামাল হোসেনও এখন আছেন বার্ন ইউনিটে। কামাল বলেন, ‘ভাই আপনারা সাবধানে থাহেন, পশুগুলায় কোনো মানুষ বাছে না, যহন-তহন যারে তারে পুড়াইয়া মারতাছে। আর কত দিন যে এ্যামনে চলব খোদাই জানে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অগ্নিদগ্ধ রোগী বলেন, ‘সরকার থেকে নাকি আমাদের সব চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু প্রথম এক-দুই দিন পর সবই আমাদের কিনতে হচ্ছে। কেবল দু-একটা কম দামি ওষুধ ছাড়া বেশি দামি সব ওষুধই বাইরে থেকে আমাদেরই কিনতে হচ্ছে। আগুনে পোড়ার জ্বালা-যন্ত্রণার চেয়েও এই ওষুধ কেনার জ্বালা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কিভাবে যে চলবে বুঝতে পারছি না।’
উল্লেখ্য, বিরোধী জোটের অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় শিশু পার্কের সামনে বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে নিক্ষিপ্ত পেট্রলবোমার আগুনে দগ্ধ হয় চালকসহ ১৮ যাত্রী। এর মধ্যে নাহিদ নামের একজন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যান। গতকাল বিকেলে মারা যান নাহিদের ফুফাতো ভাই রবিন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here