এখন পরিবর্তন করা হলে আইনগত জটিলতা দেখা দেবে :বিচারপতি আমীরুল ইতিমধ্যে নির্বাচিতদের এমপি হওয়ার আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে :ড. শাহদীন মালিক

image_89651

 

 

 

 

 

 

 

দশম জাতীয় সংসদের আংশিক নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে। জাতীয় সংসদের একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকার মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৩টি আসনে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ওই ৩৩টি আসনে সরকার দলীয় প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের তফসিল আর পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই।

সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর কোন বিধানেই ঘোষিত তফসিল পরিবর্তনের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। এমনকি নির্বাচন বাতিলেরও এখতিয়ার কারো নেই। ২০০৭ সালে জেনারেল ক্লজেস অব এ্যাক্ট ১৮৯৭ ব্যবহার করে ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করা হয়েছিলো; কিন্তু সেটিও করা হয়েছিলো জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে। যে কারণে ওই আদেশ কোন আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বিচারপতি সৈয়দ আমীরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেছেন, এখন তফসিলের কোন ধরনের পরিবর্তন করা হলে আইনগত জটিলতা দেখা দেবে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র পরিচালক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইতিমধ্যে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের সংসদ সদস্য হওয়ার একটি আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে নতুন করে তফসিল ঘোষিত হলে এই নির্বাচিত ব্যক্তিরা আপত্তি জানালে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হবে।

সংবিধান ও আইনের এই জটিল পরিস্থিতিতেও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই চেষ্টার অংশ হিসেবে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্ডেজ তারানকো ৪ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন। তার সঙ্গে বৈঠকের পরই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী হবে।

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব এমন এক সময়ে বাংলাদেশে এসেছেন যখন চলমান নির্বাচনের প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই সম্পন্ন এবং বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তফসিল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে তিনবার তফসিল পরিবর্তন করা হয়েছিলো। এমনকি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনের সময়ও তিনবার তফসিল পরিবর্তন করা হয়।

কিন্তু এসব পরিবর্তন হয়েছিলো মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনের আগে। অর্থাত্ মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় বর্ধিত করে দেয়া হয়েছিলো; কিন্তু এবার শুধু মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়ই না, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের “১৯(১) যেক্ষেত্রে, অনুচ্ছেদ ১৪-এর অধীন বাছাইয়ের পর, কোন নির্বাচনী এলাকার সদস্য নির্বাচনের জন্য কেবল একজন ব্যক্তি বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অবশিষ্ট থাকেন অথবা যেক্ষেত্রে, অনুচ্ছেদ ১৬-এর অধীন প্রত্যাহারের পর, কেবল একজন ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অবশিষ্ট থাকেন, সেইক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসার গণবিজ্ঞপ্তি দ্বারা উক্ত প্রার্থীকে উক্ত আসনে নির্বাচিত হইয়াছেন বলে ঘোষণা করিবেন।”

আইনের এই বিধান অনুযায়ী ৩৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে তার আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন তফসিলের কোন ধরনের পরিবর্তন করা হলে তাদের এই অধিকারকে ক্ষুণ্ন করবে।

এছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১১(১) ধারায় উল্লেখ রয়েছে “সংসদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে কমিশন, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা, প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকা হইতে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোটারগণকে আহ্বান করিবেন এবং প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকা সম্পর্কে প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকিবে; (ক) একটি তারিখ যখন বা যাহার পূর্বে প্রার্থিগণের মনোনয়পত্র জমা দেয়া যাইবে। এখানে স্পষ্ট করে একটি তারিখ এবং ওই তারিখের পূর্ব সময় পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগের কথা রয়েছে। ফলে একাধিক তারিখ ঘোষণার ক্ষমতা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-এ নেই। সংবিধানের ৭২(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৫ বছর মেয়াদের জন্য একটি সংসদ গঠিত হয় এবং প্রথম বৈঠক হতে এই মেয়াদ গণনা শুরু হয়। ফলে আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সংবিধানের এই বিধানটি নির্দেশনামূলক নয়। এটি বাধ্যতামূলক। এর অন্যথায় সরকার এবং রাষ্ট্র সংবিধানের বাইরে চলে যাবে। যদিও জেনারেল ক্লজেস অব এ্যাক্ট ১৮৯৭-এর ২১ ধারা অনুযায়ী ২০০৭ সালের ঘোষিত তফসিল ও নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিলো। জনস্বার্থ এবং জনশৃঙ্খলার বিবেচনায় তত্কালীন সময়ে এ পদক্ষেপ নেয়ার দাবি করা হয়েছিলো; কিন্তু সেইসময় জরুরি অবস্থা জারি করায় এবং উচ্চ আদালতে রিট করার অধিকার না থাকায় বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়নি। যদিও পরবর্তীকালে এ নিয়ে দায়েরকৃত রিট মামলায় নির্বাচন যথাসময়ে না হওয়াতে সংবিধানের মারাত্মক লংঘন বলে হাইকোর্ট অভিহিত করেছিলো।

এ প্রসঙ্গে বিচারপতি সৈয়দ আমীরুল বলেন, মনোনয়নপত্র দাখিল এবং তা যাচাই-বাছাইয়ের পর নির্বাচনী তফসিল পেছানোর কোন সুযোগ বা অবকাশ নেই। যদি তা করা হয় তাহলে আইনি জটিলতা দেখা দেবে। তিনি বলেন, দশম সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিল ও মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন শুধু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা বাকি রয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশন কিভাবে তফসিল পেছাবে? এ অবস্থায় তফসিল পেছানো বা বাতিল করা হলে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করবে। কারণ যারা ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে তারা তফসিল পেছানোর বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যেতে পারেন।

ড. শাহদীন মালিক বলেন, দশম সংসদ নির্বাচনে যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইতিমধ্যে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের সংসদ সদস্য হওয়ার একটি আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে নতুন করে তফসিল ঘোষিত হলে এ নির্বাচিত প্রার্থীরা আপত্তি জানান তাহলে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হবে। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতি তো আগে কখনো দেখা যায় নি। ফলে আপত্তি জানালে কি ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হবে তা নিরসনে হাইকোর্টের ব্যাখ্যার উপর তাকিয়ে থাকতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান তফসিলে বিএনপির আর নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ নেই। তবে দুই জোটের সমঝোতা হলে যে কোন সংকটই নিরসন সম্ভব।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here