image_145773
বিএনপি-জামায়াত দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোনে আলোচনার অনুরোধ না রেখে হরতালের নামে সহিংসতার পথ বেঁচে নিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোটের ডাকা হরতালের প্রথম দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশের ওপর হামলা, যানবাহন, অফিস-আদালতে আগুন দিয়েছে হরতালকারীরা। সংঘর্ষে দেশের ৫ জেলায় সহিংসতায় ৫ জন নিহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছে প্রায় ২শ’ জন। নিহতদের মধ্যে যশোরের অভয়নগরে বিএনপি-জামায়াতের মিছিল থেকে ধাওয়া ও হামলা চালিয়ে যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, ফরিদপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে যুবদল কর্মী, পাবনার ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনায় জামায়াত কর্মী এবং পিরোজপুরের জিয়ানগরে হরতালকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে স্বপন শীল (৩৫) নামের যুবলীগের এক কর্মী নিহত হয়েছে। টানা ৩ দিনের হরতালের প্রথম দিন গতকাল ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত হতাহতের এসব ঘটনা ঘটে। রাতে পাবনার ইশ্বরদীসহ বিভিন্ন স্থানে হরতাল চলাকালে আওয়ামী লীগ অফিসে আগুন ও হামলা চালানো হয়। পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও ধাওয়া করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রাতের হরতালে আরও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতার পায়ের রগ কেটে তারা উল্লাস করছে।

পুলিশ ও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, হরতালকারীরা গতকাল ভোর থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তা-ব চালিয়েছে। তারা থেমে থেমে বোমাবাজি ও গাড়িতে আগুন দিয়েছে। সকাল থেকে কড়া নিরাপত্তায় রাজিধানীতে বাস, মিনিবাসসহ বিভিন্ন যান চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে তুলনামূলক কম ছিল। হরতালের কারণে চাকরিজীবীদের ভোগান্তি বাড়ছে। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তবে ঢাকার বাইরে কোন কোন স্থানে হরতালকারীরা ট্রেন চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। অনেক জায়গায় রেললাইন উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। সকাল ৯টার দিকে যশোরের অভয়নগরে নওয়াপাড়া ফেরিঘাট পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় নওয়াপাড়া পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন শিমুলকে (৩৫) কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ওই সময় শিমুল তার নেতাকর্মী নিয়ে হরতালবিরোধী অবস্থানে অংশ নিয়েছিল।

অভয়নগর থানার ওসি কাজী আবদুস সালেক যশোর অফিসকে, শিমুল হত্যাকা-ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিএনপি-জামায়াতের মিছিল থেকে তার ওপর হামলা চালিয়ে তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। গুরুতর হামলার শিকার হয়ে শিমুল ঘটনাস্থলেই মারা যান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল থেকেই যুবলীগ নেতা শিমুল তার লোকজন নিয়ে নওয়াপাড়ায় হরতালবিরোধী মহড়া দেয়। সকাল ৯টার দিকে এ মহড়ার অংশ হিসেবে তারা নওয়াপাড়া ফেরিঘাট পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় অবস্থান করছিল। এ সময় হরতাল সমর্থনে বিএনপি-জামায়াতের একটি মিছিল ওই এলাকায় যায়। এ মিছিল থেকে শিমুলের ওপর হামলা চালানো হয়। যুবলীগ নেতা হলেও শিমুলের বিরুদ্ধে অভয়নগরে একাধিক হত্যাসহ অসংখ্য সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কয়েক মাস আগে শিমুল জেল থেকে ছাড়া পায় বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।

নগরকান্দায় নিহত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা : ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় হরতাল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারুফ হোসেন (২২) নামের এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা নিহত হয়েছে। এলাকাবাসী জানান, হরতালের সমর্থনে গতকাল সকাল সাতটার দিকে নগরকান্দার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করে বিএনপি ও যুবদল কর্মীরা। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশের গুলিতেই ওই যুবদল কর্মী মারা গেছেন বলে বিএনপির দাবি। নিহত মারুফের বাড়ি নগরকান্দা পৌর এলাকার মিনার গ্রামে। তার পিতার নাম রাবু শেখ। এ ঘটনায় নারীসহ আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পাবনার ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনায় জুলফিকার আলী জুলহাস (৪০) নামের জামায়াত কর্মী নিহত হয়েছেন। এলাকাবাসী জানান, গতকাল বেলা ১১টার দিকে সংঘটিত এ ঘটনায় জামায়াত কর্মী নিহত হওয়ার পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শিবিরের ঈশ্বরদী থানা সভাপতি শেখ ফরিদ হোসেন। জুলফিকার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের সরইকান্দি গ্রামের মো. শফির ছেলে। তিনি জামায়াতের একজন সক্রিয় কর্মী বলে দাবি করেছেন উপজেলা জামায়াতের আমির গোলাম রব্বানী খান জুবায়ের।

পুলিশ জানায়, হরতালের সময় মুলাডুলির রেলওয়ে গেট এলাকায় পিকেটিং করছিল জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এতে বাধা দিলে পিকেটারদের সঙ্গে স্থানীয় আ’লীগ কর্মীদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় উভয়দলের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। এতে জামায়াত কর্মী জুলফিকার গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এছাড়া শিবিরের ঈশ্বরদী থানা সভাপতি শেখ ফরিদ হোসেনসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় ফরিদ হোসেনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পিরোজপুরের জিয়ানগরে হরতালকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে স্বপন শীল (৩৫) নামের যুবলীগের এক কর্মী নিহত হয়েছে। এলাকাবাসী জানান, যুবলীগ কর্মী নিহত হওয়া ছাড়াও চর বলেশ্বর এলাকায় যুবলীগের সমর্থক বাপ্পি মোল্লা (২২) ও তার বাবা আ’লীগের সমর্থক আলাউদ্দিন মোল্লাকে (৫০) কুপিয়ে জখম করেছে হরতালকারীরা। তাদের পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয়রা জানায়, ভোর ৪টার দিকে কয়েকজন হরতাল সমর্থনকারী বালিপাড়া এলাকার সুকুমার শীলের বাড়িতে গিয়ে তার ছেলে স্বপনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বগুড়ায় হরতালের সমর্থনে বিএনপির মিছিল বের হলে প্রতিপক্ষ গ্রুপের হামলায় শাহজাহান নামের একজন নিহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুরে ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের সমর্থনে গাবতলীর তিন মাথা মোড়ে মিছিল বের করে জেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম হেলালের পক্ষের নেতাকর্মীরা। এ সময় হেলালের লোকজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও গাবতলী পৌরসভার মেয়র মোর্শেদ মিল্টনের কর্মীরা। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে গেলে ককটেল বিস্ফোরণ, দোকান ও বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে বেশ ক’জন আহত হয়।

আহতদের উদ্ধার করে গাবতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থা শাহজাহানের মৃত্যু হয়। তিনি গাবতলী উপজেলার নেপালতলী ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য।

সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় হরতাল চলাকালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে সিদ্দিক নামে তাদের একজন নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে বিএনপি। এতে অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছে অন্তত ৩০ জন। সংঘর্ষে বেলা ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আড়াইহাজার উপজেলার বান্টি ও পাঁচরুখী এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এছাড়া সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।

হরতালের ভাঙচুর ও বোমাবাজি : রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা চালিয়েছে পিকেটাররা। হরতাল সমর্থনকারীরা এ সময় বিভিন্ন যানবাহনে ভাঙচুর, আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এদিকে ভোর থেকেই রাজধানীর প্রতিটি সড়কে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র?্যাব সদস্য অবস্থান নেন। এর মধ্যেও হরতালের শুরুতেই যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, তেজগাঁও, আজিমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করে পিকেটাররা। এ সময় তারা বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় এবং গাড়ি ভাঙচুর করে।

ভোর ৪টার দিকে গাবতলী বিআরটিসি বাস ডিপোতে ৬টি দোতলা বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় পিকেটাররা। বিআরটিসির গাবতলী বাস ডিপোর ব্যবস্থাপক আবদুর রহিম জানান, দুর্বৃত্তরা ভোরে দেয়াল টপকে বাসগুলোতে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে মিরপুর বেড়িবাঁধে পাবনা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। ভোর ৫টার দিকে ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের আবাহনী মাঠের কাছে ৭টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

সকাল সোয়া ৬টার দিকে উত্তর যাত্রাবাড়ী বিবির বাগিচা এলাকার ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ অফিসে আগুন দেয় পিকেটাররা।

সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মিরপুর স্টেডিয়াম এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়ি ভাঙচুর ও স্টেডিয়াম লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ার সময় যুবদল ও শিবিরের ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে বলে মিরপুর থানার ওসি সালাউদ্দিন জানিয়েছেন। একই সময়ে রামপুরায় হরতাল সমর্থনে মিছিল করেছে জামায়াত-শিবির। তবে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসার আগেই তারা স্থান ত্যাগ করেন। একই সময়ে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে ২টি রিকশা ও একটি অটোরিকশায় আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় হরতাল সমর্থক জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা।

সকাল ৯টার দিকে টিকাটুলিতে র‌্যাবের কার্যালয়ের পেছন দরজায় ৩টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। র‌্যাব আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও কাউকে আটক করতে পারেনি। দুপুর ১টার দিকে শান্তিনগর মোড়ে পর পর দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা।

সকালে লালমনিরহাটে রেললাইনে উপড়ে ফেলে রেলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে নিয়েছে। এ কারলে দিনভর শত শত মানুষের ভোগান্তির শিকার হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান, অনেকেই টিকিট করে হরতালের কারণে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here