J News

শ্রমিক মৃত্যুর গুজবে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড রণক্ষেত্র

রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে সিটি করপোরেশন কর্তৃক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিক সংঘর্ষে এক শ্রমিক নিহত হওয়ার গুজবে গতকাল রবিবার কাওরানবাজার রেল ক্রসিং থেকে সাতরাস্তা মোড় পর্যন্ত গোটা এলাকা অনেকটা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ ও শ্রমিকদের ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির কার্যালয়ে তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শ্রমিকদের লাঠিপেটা ছাড়াও পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও গুলি ছোঁড়ে।

সংঘর্ষে একজন ট্রাক চালক ও একটি পরিবহনের ম্যানেজার আহত হন। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন তারা শংকামুক্ত।

শ্রমিকদের ছোঁড়া ঢিলে আহত হন বেশ কয়েকজন ফটোসাংবাদিক। একটি টেলিভিশন চ্যানেল, পুলিশ ও  সিটি করপোরেশনের মোট ৪টি গাড়ি ভাংচুর করা হয়। রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। সংঘর্ষ শুরু হলে চালক সমিতির কার্যালয়ে কিছু সময় অবস্থান করে পরে তিনি সেখান থেকে চলে যান।

তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর বিকাল পৌনে ৫টার দিকে র্যাব-পুলিশের নিরাপত্তায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন মেয়র আনিসুল হক। তবে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে শ্রমিকদের উদ্দেশে দেয়া এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি উন্নত একটি ট্রাকস্ট্যান্ড নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।

ট্রাকস্ট্যান্ডে অপ্রীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও মেয়র আনিসুল হকের উপস্থিতিতে গতকাল দুপুর ১টার দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোশনের লোকজন ট্রাকস্ট্যান্ডের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের লক্ষ্যে অভিযান শুরু করে। উচ্ছেদের শেষ পর্যায়ে পার্ক করা একটি ট্রাকের সামনের অংশ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় কিছু লোকজন। তারা হটাত্ ইটপাটকেল ছুঁড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং মন্ত্রী ও মেয়রের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও গুলি চালায়। আহত হন ট্রাক চালক জসিম উদ্দিন (৪০) ও রাকিব ট্রান্সপোর্টের ম্যানেজার বদরুদ্দোজা (৫৫)। তাদেরকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

এ সময় এক ট্রাক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। শ্রমিকরা কাভার্ডভ্যান দিয়ে কাওরানবাজার রেলগেট থেকে সাতরাস্তার মোড় পর্যন্ত সড়কটি বন্ধ করে দেয়। তারা সেখানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। তারা ভাংচুর করে চারটি গাড়ি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার বিপ্লব সরকার শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ছোট একটি ঘটনায় ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ একজন উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ঢিল ছুঁড়লে পরিস্থিতি জটিল হয়। পুলিশ গুলি ছোঁড়েনি, কাউকে আটকও করেনি।

এদিকে পুলিশ ও শ্রমিকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে মেয়র অবস্থান নেন বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির অফিসে। এ সময় শ্রমিকরা বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়ন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে ও উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকে।

রাস্তা নয়, টার্মিনালে ট্রাক থাকবে

তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর বের হয়ে বিকাল পৌনে পাঁচটার দিকে শ্রমিকদের উদ্দেশে হ্যান্ডমাইকে বক্তব্য দেন মেয়র আনিসুল হক। তবে এর আগে ট্রাক টার্মিনাল মসজিদের মাইকে শ্রমিকদের শান্ত হওয়ার আহবান জানিয়ে বক্তব্য দেন ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মনির তালুকদার। এরপর বাংলাদেশ ট্রাক, কভার্ডভ্যান ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব বক্তব্য রাখেন।

মেয়র আনিসুল হক শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘রাস্তা নয়, টার্মিনালে ট্রাক থাকবে। আপনারা রাস্তায় চলবেন। আপনাদের গাড়ি চলবে। আমার গাড়ি চলবে না। এখন যেসব ট্রাক রাস্তায় রাখা হচ্ছে তার জন্য ভেতরের জায়গায় টার্মিনাল স্থাপন করা হবে।’

বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন শ্রমিক আহত হওয়ার ব্যাপারে মেয়র বলেন, ‘একটা ছেলেকে ইট মারা হয়েছে। আপনারা অনেকেই তার সাথে কথা বলেছেন। আমি আপনাদের নগরপিতা। আমরা আপনাদের সাহায্য করতে চাই। আপনারাই আমাকে ভোট দিয়ে নগরপিতা বানিয়েছেন। ভয় করলে চলবে না।’ আহত ব্যক্তির চিকিত্সায় সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানান মেয়র।

ঘটনা সম্পর্কে বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান বলেন, ‘আমরা এই উচ্ছেদের পক্ষে। তবে এখানে অনেক পক্ষ জড়িত। যেমন-মালিক, শ্রমিক, চালক। এদের মধ্যে থেকেই কেউ এ হামলা করেছে। এ হামলা তাদের স্বার্থে নয়। এ হামলা হয়েছে ব্যক্তিস্বার্থে। যারা এখানে দখল করে আছে তারাই এ হামলার সঙ্গে জড়িত।’

উল্লেখ্য, গত ১ নভেম্বর রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক ও ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির নেতাদের নিয়ে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন মেয়র আনিসুল হক। এ সময় তিনি ট্রাকস্ট্যান্ড  দখলমুক্ত করতে সংশ্লিষ্টদের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। তবে ওই সময়সীমার মধ্যে নির্দেশ পালন করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে মেয়র ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত ট্রাক-কাভার্ডভ্যান সরাতে মালিকদের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here