kayum chy

news

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলেন তিনি। জয়নুলের লোকজ ও প্রতিবাদী ধারার শিল্পরীতি তাকে প্রভাবিত করেছিল, প্রেরণা জুগিয়েছিল। শিল্পগুরু কামরুল হাসানের দীক্ষামন্ত্রে মুগ্ধ ছিলেন। এর সাথে আধুনিক কৌশল ও শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে আলোকদীপ্ত মানুষটি আলোকিত করেছেন এ দেশের চিত্রশিল্পকে। ১৯৩২ থেকে ২০১৪, ৮২ বছরকালের জীবনের অন্তত ৬৫ বছর কাঁটিয়েছেন রং-তুলির সাথে। ক্যানভাসে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন। শৈশব থেকেই কলের গান ও গ্রামোফোনের রেকর্ড শুনতেন। জীবন সায়াহ্নে যেন এর সবগুলোর সম্মিলন ঘটিয়ে রবিবার রাতে চির বিদায় নেন বাংলার শক্তিমান চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। আধুনিক সঙ্গীতের এ যুগে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় ও আলোকজ্জ্বল মঞ্চে ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। যেমনিভাবে ১৯৮৮ সালে জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চ থেকে চিরবিদায় নেন তার শিক্ষক কামরুল হাসান। বিদায়কালে কাইয়ুম চৌধুরী রেখে গেলেন বাংলা ও বাঙালির লোকজ ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি চর্চার প্রেরণার দীপ্তি। সোমবার শেষ বিকালে যখন আজিমপুর গোরস্থানে অমর এ শিল্পীকে সমাহিত করা হয় তখনও যেন সে প্রেরণার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ে তার সহকর্মী, স্বজন, অনুজ এবং শিল্পাঙ্গনের ব্যক্তিদের মাঝে। শিল্পীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ঝরে পড়ে তাদের কন্ঠে-অভিব্যক্তিতে। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নাগরিকরা পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় জানান বাংলায় আধুনিক প্রচ্ছদ শিল্পের প্রবর্তককে।
রবিবার রাত নয়টায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া কাইয়ুম চৌধুরীর মরদেহ রাতে রাখা হয় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে। সেখান থেকে সকাল ১১টা ১০মিনিটে তার মরদেহ আনা হয় দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নেসার হোসেন ও সাবেক ডিন অধ্যাপক আবুল বারাক আলভী, কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী, নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সাংস্কৃিতক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, চিত্রশিল্পী হাশেম খান, অধ্যাপক সমরজিৎ রায়সহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। উপস্থিত নাগরিকদের অশ্রুসিক্ত ও বাকরুদ্ধ অভিব্যক্তি আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে। এ সময় চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নেসার হোসেন বলেন, আমরা শুধু একজন বরেণ্য শিল্পীকে হারালাম না, হারালাম চারুশিল্পের গুরুকে। এই দেশ যতদিন থাকবে ততদিন তাকে স্মরণ করবে জাতি। এবছর বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যদিয়ে শিল্পী জয়নুল আবেদীনের শততম জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে কাইয়ুম চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তার মৃত্যুতে এক্ষেত্রেও শূণ্যতা সৃষ্টি হলো। এটি পূরণ হওয়ার নয়। তাই জয়নুল আবেদীনের শততম জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে যত আয়োজন করা হবে সেগুলো তার নামে উৎসর্গ করা হবে।
সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে সেখান থেকে মরদেহ নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। সেখানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে কাইয়ুম চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান সকল স্তরের নাগরিকরা। দুপুর সোয়া একটা পর্যন্ত পুষ্পার্ঘ্য অর্পনের পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ছায়ানট ও রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পীরা। খ- বক্তব্যে শিল্পগুরুকে স্মরণ করেন বিশিষ্টজনরা।
শহীদ মিনারে কাইয়ুম চৌধুরীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে প্রথমে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পন করা হয়।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হোসেন আর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা জানান তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল জয়নাল আবেদীন। নিজ প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও সংস্থার পক্ষে ও ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মেসবাহ উদ্দিন, বিটিভির মহাপরিচালক আবদুল মান্নান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব, উদীচীর সভাপতি কামাল লোহানী, মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরের ট্রাস্টি ড. গোলাম সারওয়ার, আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, সৈয়দ হাসান ইমাম, মামুুনুর রশিদ, অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ, , জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী, আন্তর্জাতিক লেখক সংগঠন পেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সৈয়দা আইরিন জামান, পথনাট্য পরিষদের মান্নান হীরা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, আলী যাকের, আতাউর রহমান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী, মফিদুল হক, সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, চ্যানেল আই’র ফরিদুর রেজা সাগর, শাইখ সিরাজ, সাংবাদিক শফিক রেহমান প্রমুখ। শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পনশেষে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
কাইয়ুম চৌধুরীর মরদেহে পুষ্পার্ঘ অর্পন এবং শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, শিল্পকলা একাডেমী, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, বেঙ্গও ফাউন্ডেশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ, বাসদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ (জাসদ), গণফোরাম, বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদ, ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতি, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, কন্ঠশীলন, বুলবুল একাডেমী অব ফাইন আর্টস, বার্জার পেইন্টস, প্রথম আলো, সমকাল, সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ বিরোধী জোট, আবৃত্তি পরিষদ, ডক্টরস হেলথ এন্ড এনভায়নমেন্ট, ফেনী সমিতি, গণসঙ্গীত শিল্পী পরিষদ, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, ঢাকা আর্ট সেন্টার, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ও পেশাজীবি সংগঠন শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রকাশ করেন।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনশেষে কাইয়ুম চৌধুরীর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নেয়া হয়। যোহরের নামাজের পর সেখানে তারা জানাযা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অন্যান্যের মধ্যে অংশগ্রহণ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। জানাযাশেষে শিল্পীর মরদেহ তার আজিপুরের বাড়িতে নেয়া হয়। এরপর আজিমপুর ছাপড়া মসজিদে তার দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে আজিমপুর গোরস্থানে শ্বশুর খান সাহেব বদরুদ্দীন আহমেদের কবরে কাইয়ুম চৌধুরীর মরদেহ দাফন করা হয়। চিরদিনের জন্য দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন বাংলার অন্যতম শক্তিমান এ চিত্রশিল্পী।
কাইয়ুম চৌধুরীর ভাগ্নে বজলুল করিম জোবায়ের জানান, আগামী শুক্রবার তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে আজিমপুর ছাপড়া মসজিদে বাদ জুমা মিলাদের আয়োজন করা হবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here