image_100706

 

হাওয়ার্ড বি. শেফার ও তেরেসিতা সি. শেফার

বাংলাদেশের গত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন দেশটির ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর একটি বড় মাপের ধাক্কা দিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার দাবিতে প্রধান বিরোধী দলের বয়কটের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে, যার অর্ধেকের বেশি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকে দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের এবং এই নির্বাচন ঠেকানোর জন্য চালানো সহিংসতা উভয়ের সমালোচনা করেছে। সমঝোতার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে চাপ প্রয়োগ করে যাবে বলে এই দেশগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে নিকট ভবিষ্যতে এ ধরনের সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। নতুন নির্বাচিত সরকার এবং তাদের প্রধান ‘শত্রু’ বিএনপি যারা একে অন্যকে ভর্ত্সনা করার কাজে ব্যস্ত, বরাবরই সেই শত্রুতা এবং মতভেদ টিকিয়ে রাখবে এমন ধারণা করা যায়। তারা এবং তাদের সমর্থকরা শুভাকাঙ্খী এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ধমক কিংবা সতর্কবাণীর চেয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং চলমান সহিংসতার ফলে দেশের তৈরী পোশাক খাতের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সেটা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।

অবশ্য এটা উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে, ১৯৯৬ সালে বিএনপি এরকম একটি নির্বাচন করেছিল। তবে সেই নির্বাচন পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হতে সহায়তা করেছিল, যারা তিন মাস ক্ষমতায় থেকে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। বিরোধী দল মনে করে, সরকারি দল ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের আয়োজন করলে তাতে কারচুপি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই ভাল বলে মনে করা হয়। কিন্তু ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের একজন সমর্থককে প্রধান উপদেষ্টা করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠান করা বিএনপির পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যতবার নির্বাচন হয়েছে ততবার বিরোধী দল জিতে গেছে।

২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করেন। সংবিধানে ক্ষমতাসীন সরকারই নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করবে বলে একটি বিধান সংযুক্ত করা হয়। যদিও আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে দুই বার ক্ষমতায় এসেছে, তবুও এবার তারা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু বিরোধী দল এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এবং পূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে। কিন্তু শেখ হাসিনা সেই দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানান যার ফলে এই রাজনৈতিক সংকট তৈরী হয়।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে দুটি কারণে রাজনৈতিক বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর একটি হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা এবং অন্যটি হলো ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা। কারণ দেশটির রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর বেশিরভাগ নেতাই এই বিচারের আওতায় রয়েছেন। আর দলটি বিএনপির অন্যতম মিত্র। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন করে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় দেওয়া শুরু হয় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে একজনের রায় কার্যকর হয়। এর ফলে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবির সারাদেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক হামলা চালানো হয়। আর জামায়াতের এই সব সহিংস কর্মকান্ডকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দেয় বিএনপি। তারা জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধের দাবিতে আন্দোলনও করে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি সরকার এবং সংস্থাগুলো সরকার ও বিরোধী দলকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য চাপ দিতে নানা পদক্ষেপ নেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এবং অন্যান্য বিদেশি নেতারা সরকারি এবং ব্যক্তিগতভাবে দেশটি সফর করে সমঝোতায় আসার ওপর জোর দেন। কিন্তু দুটি দলই তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। তবে বহু বছর পর তারা দুইজনে টেলিফোনে আলাপ করেন। কিন্তু এসময় তারা একে অপরকে তিরস্কার করেন। আর এটা গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। ছোট দলগুলোও নানাভাবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে। কিন্তু বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের বাইরে ক্ষমতায় আসার কারোরই ক্ষমতা নেই। ফলে সব আলাপ-আলোচনার ফল হয় শূন্য।

দুই পক্ষই ক্রমান্বয়ে অনমনীয় হয়ে ওঠে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত কথোপকথনে দেখা যায়, অনেক বছর পর শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে সরাসরি আলাপে তারা দুই জন একে-অপরকে শুধু অপমান করতেই সফল হয়েছেন। পরবর্তীতে দুই দলের নিচের সারির নেতাদের মধ্যে কিছু আলাপ-আলোচনা হলেও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের দেয়া সীমিত ক্ষমতার জন্য এসব সংলাপ থেকে কোনো ফল আসেনি।

এসব সমঝোতা প্রচেষ্টায় একটি মাত্র গুরুত্বপূর্ণ দেশ ভারত কোনভাবেই অংশগ্রহণ করেনি। প্রথাগতভাবে ভারতীয়রা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ২০১২ সালে খালেদা জিয়ার ভারত সফরের মধ্য দিয়ে বিএনপির সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক ভালো হয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীকে তার সহজবোধ্য সমর্থন সে সম্পর্ককে দুর্বল করে তোলে। সবশেষ বিদেশি সরকার ও জাতিসংঘের পুনঃপ্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুই পক্ষকে বুঝিয়ে সমঝোতায় আনা সম্ভব হয়নি।

নির্বাচনের আগে যা-ই ঘটুক, এই নির্বাচন শেখ হাসিনাকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তাকে এখন বেশ চিন্তামুক্ত মনে হয়। পুলিশ ও আমলারা শেখ হাসিনার সরকারের অনুগত রয়েছে। সেনাবাহিনীও বিশ্বস্ততার সঙ্গে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছে। যে কারণে নির্বাচনে পক্ষপাতহীনভাবে তার নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিলো না। শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি একটি নতুন নির্বাচন দিতে আগ্রহী আছেন, তবে বিরোধীদলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আওয়ামী লীগের কোনো নেতৃত্বই তার এ অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করবে না।

বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়া অনেক বেশি দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন। নির্বাচন ঠেকানোর তীব্র প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। আর এবার জাতীয় সংসদে কোনো রকম প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই বিএনপিকে আরো পাঁচ বছরের রাজনৈতিক ‘নির্বাসনের’ মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ মুহূর্তে রাজপথে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া দলটির জন্য কঠিন হতে পারে। এজন্য তারা ক্রমবর্ধমানভাবে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে প্রস্তুত হতে পারেন। ইতিমধ্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার দলের জোট ভাঙার। আর আওয়ামী লীগ এ দাবিই জানিয়ে আসছে। তবে তিনি নির্বাচনী কাঠামোর প্রধান ইস্যুতে আপোস করতে রাজি হবেন এটা নাও হতে পারে। আবার সদ্য বিজয়ে উদ্দীপ্ত শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় আসার জন্য দলের ভেতর থেকে গুরুতর চাপের মুখেও নাও পড়তে পারেন।

কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকর আগে মনে করছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে এবং সহিংসতা অব্যাহত থাকলে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে। ২০০৬ সালে যেভাবে সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছিলো। তবে যতক্ষণ না মারাত্মকভাবে পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বেসামরিক সরকার অপারগ হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কম।

বর্তমান সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণের কোনো ধরনের আগ্রহ বর্তমান সেনা নেতৃত্ব দেখায়নি। এছাড়া সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর আগে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে সেনা উপস্থিতির বিষয়টি তারা হিসাব-নিকাশ করতে পারে। কারণ এতে তাদের শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই শান্তিরক্ষী মিশন সেনাবাহিনীর আয়ের অন্যতম বড় উত্স। একই সঙ্গে জাতীয় গর্বের বিষয়ও।

গত ২০ বছরে সব সরকারই দেখেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কার্যকারিতা ও জনপ্রিয়তা কমেছে। সংসদীয় মেয়াদের পাঁচ বছরে রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের অসন্তোষ বেড়েছে আর মনে মনে তারা সরকারের প্রতি বিদ্রুপের কথা উচ্চারণ করেছে। চলতি মেয়াদে হাসিনার সরকারকে ঠেলে ফেলা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে তাদের এই চাপ বোধ করতে হবে। আগামী মাসগুলো দেশটির জন্য অনেক কঠিন হতে পারে। আবার রাজনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানের নতুন প্রচেষ্টার সুযোগও চলে আসতে পারে।

লেখক পরিচিতি:

হাওয়ার্ড বি. শেফার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক। পেশাগত জীবনের ৩৬ বছরের অধিকাংশ সময়ই দক্ষিণ এশিয়ায় পার করেছেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমন্ড এ. ওয়ালশ স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের অতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অপর লেখক হাওয়ার্ডের স্ত্রী তেরেসিতা সি. শেফারও ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনীতিক। পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক শীর্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত শেফার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শ্রীলঙ্কায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার বিষয়ে কাজ করা ম্যাকলার্তি এসোসিয়েটসের সিনিয়র এডভাইজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here