জনতার নিউজ

শেকল ছিঁড়ে হাতিটি জলাশয়ে

ভারত থেকে বানের জলে ভেসে আসা হাতিটি শেকল আর দড়ি ছিঁড়ে বাঁধনমুক্ত হয়ে একটি জলাশয়ে নেমে পড়েছে।

শনিবার বেলা ১১টার দিকে বাঁধনমুক্ত হয়ে হাতিটি ওই জলাশয়ে নেমে কেবল শুঁড় বের করে রেখেছে।

ডাঙায় তোলা গেলেই হাতিটিকে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হবে বলে জানান বন অধিদফতরের সাবেক উপপ্রধান বন সংরক্ষক তপন কুমার দেব।

এর আগে বৃহস্পতিবার বুনোহাতিটিকে উদ্ধারের প্রয়োজনে চেতনানাশক ছুড়ে অচেতন করে  জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার কয়ড়া গ্রামে একটি আমগাছে শেকল ও দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।  পর  হাতিটির চেতনা ফিরে। উঠে দাঁড়ায়।  এরপর থেকেই হাতিটি বাঁধনমুক্ত হতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

প্রসঙ্গত, ২৮ জুন কুড়িগ্রামের রৌমারীর সাহেবের আলগা সীমান্তবর্তী ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে ভারত থেকে বানের পানিতে ভেসে আসে বুনোহাতিটি।

ঘটনার পরিক্রমায়

২৮ জুন মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে নদের বুকে কিছু একটা ভাসছে। ভারত থেকে মহিষ ভেসে এসেছে-এমন খবরে ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে ছোট একটা নৌকায় ওই মহিষ ধরতে যায় সাহেবের আলগা চরের আনোয়ার হোসেন, বিনত মোল্লা, সিরাজুল ইসলাম ও সোনাউল্লাহ। কাছে ভিড়তে তাদের দিকে তেড়ে আসে হাতিটি। কোনো রকমে হাতির আক্রমণ থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসেন তারা। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত হাতিটি চরবাগুয়ার চরেই অবস্থান করে। কিন্তু চরে খাবার না থাকায় চর ছাড়ার চেষ্টা করে নদের তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে। সেখান থেকে ভাসতে ভাসতে প্রায় ১০কিলোমিটার দক্ষিণে একই উপজেলার খেড়ুয়ার চর নামক চরে আটকা পড়ে।

খেড়ুয়ার চরে খাবার ছিল না। তবে সারাদিন ওই চরেই অবস্থান করে রাতে স্রোতে ভেসে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে রাজীবপুরের নয়াচর বাজারের পশ্চিমে মধ্যপাড়া নামক চরে কাদায় আটকা পড়ে। এ সময় নয়াচর বাজার এলাকার হাজারো উৎসুখ জনতা ভিড় করে হাতিটি দেখার জন্য। নয়াচর মধ্যপাড়া চরের কাদা পানিতে আটকে যায়। সারাদিন এক স্থানেই দাঁড়িয়ে ছিল হাতিটি। রাতে প্রায় এক কিলোমিটার উজানে চড়াইহাটি নামক চরে ঢোকে।

১-৩১ জুলাই

চড়াইহাটি চরে প্রচুর কাশবন থাকায় খাবার হিসেবে তা বেছে নেয় হাতিটি। এখানে একটানা আটদিন অবস্থান করে হাতিটি। এ চরে কোনো জনবসতি ছিল না। রাতে আবার ছুটে যায় নয়াচর মধ্যপাড়া চরে। খুব ভোরে নয়াচর মধ্যপাড়া চরে হাতিটিকে দেখা যায়। এখানে দুই দিন অবস্থান করে। খাবার না পেয়ে রাতে দক্ষিন বড়বেড় চরের জনবসতি হামলা করে একটি পরিবারের ঘর ভেঙ্গে ফেলে। কয়েকটি গাছও উপড়ে ফেলে। এ সময় মানুষের তাড়া খেয়ে আবার স্রোতে ভেসে যায়।

ওই রাতেই গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ি নামক চরে অবস্থান নেয়। এখানে খাবার না থাকায় খাবারের খোঁজে জনবসতিতে ঢোকে। কিন্তু হাতি দেখে চরের মানুষ ভয়ে হাতিটিকে তাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হাতিটি মানুষের বাড়িঘরে আক্রমণ করে। এতে ১২ পরিবারের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক পর্যায়ে রাতের অন্ধকার আগুন ও ঢোলের শব্দ করে হাতিটিকে তাড়িয়ে দেয় চরের মানুষ। এরেন্ডাবাড়ি চরের মানুষের তাড়া খেয়ে চরহাগড়া নামক চরে গিয়ে ওঠে। এ চরে জনবসতি ছিল না। কাশবন থাকায় এচরে দুইদিন অবস্থান করে হাতিটি। চরটি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাবাড়ি ইউনিয়নের অধীনে। গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের পাতিল তলা চরে আটকে পড়ে। এখানে কোনো খাবার ছিল না। যে কারণে সারাদিন অবস্থানের পর রাতে ছুটে চলে অন্য চরের দিকে।

বগুড়ার সারিয়াকান্দির হরিরামপুর কাশিয়া বাড়ি নামক চরে গিয়ে ওঠে হাতিটি। রাতের বেলায় জেলেরা হাতিটিকে প্রথমে দেখে ভয় পেয়েছিল। সকালে হাতি দেখার জন্য অসংখ্য নৌকায় উৎসুক জনতা ভিড় করে। চরে কাশবন অন্যদিকে কলাগাছ খাবার পেয়ে শেষ পর্যন্ত হাতিটি ওই চরেই অবস্থান করে। পরে এ চর থেকে ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে কাজিপুর উপজেলার মুনসুর নগর ইউনিয়নের ছিন্নার চরে গিয়ে ওঠে। এরপর হাতিটি খাসরাজবাড়ী ইউনিয়নের গোদারবাগ চর হয়ে আবার ছিন্নার চরের একটি পাটক্ষেতে উঠে আসে।

হাতিটি ছিন্নারচর ছেড়ে যমুনা নদী সাঁতরে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নাটুয়ারপাড়ার ৭৫ নম্বর চরে আশ্রয় নেয়। পরের দিন একই উপজেলার উত্তর দিকে যুক্তিগাছা নতুন চরে অবস্থান নেয়। এখান থেকে গভীর রাতে জামালপুরের সরিষাবাড়ীর সাতপোয়া ইউনিয়নের লোকালয়ে ঢোকে। পরে হাতিটি সাতপোয়া ইউনিয়নের চর রৌহা, নান্দিনা ও ছাতারিয়া এলাকা ঘুরে কামরাবাদ ইউনিয়নের শুয়াকৈর গ্রামে অবস্থান নেয়।

১-১০ আগস্ট

১ আগস্ট থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত হাতিটি সরিষাবাড়ী উপজেলার সাতপোয়া ইউনিয়নের জনবহুল চুনিয়া পটল গ্রাম, মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের দুর্গম ফুলারপাড়া গ্রাম, ঝালোপাড়ার আখক্ষেত, ভাটারা ইউনিয়নের কৃষ্টপুর গ্রাম, কামারবাদ ইউনিয়নের পপুলার জুট মিল এলাকা ঘুরে বেড়ায় জামালপুরের অধীনে এচর ওচর ঘুরে বেড়ায়। চারপাশে বন্যার পানি থাকায় হাতিটিকে অজ্ঞান করা যাচ্ছিল না। এরমধ্যে একটা পোষা হাতি নিয়ে আসা হয় চর ভাটিয়ানী গ্রামে। পোষা হাতির পিঠে চড়ে কর্মকর্তারা ট্যাংকুলাইজার গান দিয়ে বুনো হাতিটিকে অজ্ঞান করতে গেলে বুনো হাতির তাড়া খেয়ে ফিরে আসে পোষা হাতি।

১১ আগস্ট

এই ৪৫ দিনে হাতিটি প্রায় ৮০০ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দেয়। ১১ আগস্ট বৃহস্পতিবার ট্যাংকুলাইজার গান দিয়ে বুনো হাতিটিকে অজ্ঞান করা হলে পানিতে পড়ে যায় হাতিটি। পড়ে স্থানীয়দের সহায়তায় হাতিটিকে লোহার শিকলে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাতিটিকে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে নিয়ে যাওয়া হবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here