শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) হিসেবে নিয়োগ পাবার পর মন্ত্রণালয়ে সব ধরনের তদবিরে নেমে পড়ে মোতালেব হোসেন। পিও হবার কয়েক মাসের মধ্যে মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রভাব বিস্তার করে ‘তদবির রাজ্য’ বানিয়ে ফেলেন এই মোতালেব। গড়ে তোলে ৬ জনের একটি সিন্ডিকেট। এরপর শুরু করেন স্কুল কলেজ সরকারিকরণের নামে অবৈধভাবে টাকা আদায়, এমপিওভুক্তির নামে ঘুষ, বিভিন্ন কৌশলে শিক্ষকদের কাছ থেকে মাসোহারা নেওয়া, কর্মকর্তাদের বদলি, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োগ বাণিজ্য। এসব থেকে অবৈধভাবে আয় করে তিনি রাজধানীতে বহুতল ভবন বানিয়েছেন। নিজ নামে ও অন্যের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রবিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বছিলা থেকে মোতালেবকে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী নাসির উদ্দিন ও লেকহেড গ্রামার স্কুলের মালিক খালেদ হাসান মতিনকে গুলশান থেকে গ্রেফতার করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্রহণ ও বিতরণ শাখার উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিনকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকাসহ গ্রেফতার করা হয়।

নিজের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা গ্রেফতারের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরেছে বলে এখন তো আমরা নিশ্চিত হলাম। নিশ্চয় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। সেটা কোর্টে প্রমাণ হবে, তার শাস্তি হবে। সেই অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা কখনো কোনো অন্যায়কারী, ঘুষ খাওয়া, দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, বেআইনি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো লোককে প্রশ্রয় দেবো না। ওই অপরাধে অপরাধী হলে চাকরিবিধি অনুসারে যে ব্যবস্থা আছে সেটা নেওয়া হবে’।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, পুলিশ ও ডিবি কাউকে ধরলে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই ধরে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে বলেই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কী অভিযোগ আনা হয়েছে গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে- এর জবাবে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, এখনো এ নিয়ে তদন্ত চলছে, পুলিশ কাজ করছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

এদিকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গোয়েন্দা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) দুর্নীতি ও তদবির বাণিজ্যের কথা স্বীকার করেছেন। তার সঙ্গে তদবির বাণিজ্যে সম্পৃক্ত থাকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৫ কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করেছেন। গোয়েন্দা পুলিশ সেগুলো খতিয়ে দেখছে।

সূত্র জানিয়েছে, মোতালেবের গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠী জেলার নলছিটি উপজেলার মোল্লার হাট ইউনিয়নে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান মোতালেব হোসেন। তার বাবা দেলোয়ার হোসেন ছিলেন কৃষক। চাকরির শুরুতে মোতালেব তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। এরপর পদোন্নতি পেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হন। পরে তাকে মন্ত্রীর পিও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১০ম গ্রেডে সরকারি বেতন হিসেবে তার বেতন ২৮ হাজার ১০০ টাকা। তবে তার অবৈধ আয় ছিল বেসামাল। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি কোটিপতি বনে যান। পশ্চিম ধানমন্ডির বি ব্লকের ৪ নং রোডের ২৬ নম্বর প্লটে সাত তলা বাড়ি নির্মাণ করেন তিনি। বাড়ির মূল্য অন্তত চার কোটি টাকা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হওয়ার কারণে মোতালেবের প্রভাব ছিল সর্বত্র। বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে তিনি নিজেকে শিক্ষামন্ত্রীর পিএস/এপিএস ইত্যাদি পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবগুলো সংস্থায় তার সিন্ডিকেট ছিল। মাঠপর্যায় পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি ছিল। নিজে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হলেও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষমতা ছিল তার। শুধু মন্ত্রণালয় নয়, শিক্ষা ভবনেও কয়েকটি শাখায় তার প্রভাব ছিল বেশি। সরকারি হাইস্কুল শিক্ষকদের বদলি, টেন্ডারসহ বিভিন্ন কাজে জড়িয়েছিলেন তিনি। তার ঘুষ বাণিজ্যের খবর ছিল ওপেন সিক্রেট। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হওয়ায় তার অনিয়মের কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পেতো না কেউ। মোতালেবকে ম্যানেজ করতে পারলেই অনেক কাজ সহজ হয়ে যেতো। আর ম্যানেজ করতে হলে আর্থিক সুবিধা দিতে হতো তাকে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নানা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মোতালেব ও নাসিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর খালেদ হাসান মতিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে জঙ্গিবাদে অর্থায়নের অভিযোগে। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আরো জিজ্ঞাসাবাদ করার পর এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হবে।

শেয়ার করুন
  • 67
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here