gold
নিজস্ব প্রতিবেদক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাই দুবাইয়ের একটি বিমানের টয়লেট থেকে ২৮০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা সোনার বারের ওজন ৩২ কেজি ৯৪০ গ্রাম। এবারো স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে মূল চোরাচালানি চক্র।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিমান সংস্থাটির ফ্লাইট ৫৮৩ দুবাই থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছায়। বিমান থেকে যাত্রী নামার আগেই গোপন সংবাদ পেয়ে সেখানে হাজির হন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন সদস্যরা। খবর পেয়ে আসেন কাস্টমস কর্মকর্তারাও। এরপর ফ্লাই দুবাইয়ের বিমান থেকে বেলা ১১টায় এপিবিএন ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের যৌথ অভিযানে স্বর্ণের বারগুলো উদ্ধার করা হয়।
স্বর্ণ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিমানবন্দর কাস্টমস কমিশনার জাকিয়া সুলতানা বলেন, ফ্লাই দুবাইয়ের ৫৮৩ বিমানটির গন্তব্য শুধু ঢাকাতেই। তাই এসব সোনা বাংলাদেশের চোরাচালানি চক্রের সদস্যরাই এনেছে। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি বিমানবন্দর পুলিশ। শুল্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, আটক সোনার বাজারমূল্য ১৪ কোটিরও বেশি।
এই ৩৩ কেজি স্বর্ণ আসার খবর প্রথম জানতে পারেন এপিবিএনের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার এহতেশামুল হক। তিনি বলেন, দুবাই থেকে সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফ্লাই দুবাইয়ের বিমানটি ঢাকায় আসে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যদের নিয়ে আমরা বিমানে যাই। তিনি বলেন, আমাদের কাছে খবর ছিল স্বর্ণ নিয়ে আসা যাত্রী বিমানের টয়লেট থেকে দেরিতে বের হবেন। তবে বাথরুমের কাছে গিয়ে দেখতে পাই ব্যক্তিটি নেই। দুই মহিলা যাত্রী বাথরুম থেকে বের হচ্ছেন। তবে তাদের দেখে সন্দেহজনক মনে না হওয়ায় শুল্ক কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা অভিযানে নামি। বিমানটির পেছনের দুটি শৌচাগার থেকে কালো কাপড়ে মোড়ানো ২৮০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।
একটি সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন স্বর্ণ চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুট হয়ে উঠেছে। বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় কাস্টম বিভাগের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা সদস্যদের তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন সূত্র জানায়, গত ৬ জুলাই কুয়েত থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের এক আসনের নিচ থেকে ৯ কোটি টাকা মূল্যের ২৫ কেজি ওজনের ২১৭টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। ১৯ জুলাই সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ৪০০ গ্রাম স্বর্ণের বার, দামি মোবাইলসহ প্রায় কোটি টাকার মালামাল উদ্ধার করা হয়। ২৯ জুলাই দুবাই এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ১৭টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করেন শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা। একই দিন রাত ৯টায় ড্রাগন এয়ারলাইন্সের বিমানের এক যাত্রীর লাগেজ স্ক্যানিং করার সময় উদ্ধার করা হয় ৫২টি স্বর্ণের বার। ১৯ আগস্ট ৮ কেজি স্বর্ণসহ দীপক কুমার আচার্য্য নামে এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করে এপিবিএন। ৩০ আগস্ট ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের মাস্কট-দুবাই-ঢাকার একটি ফ্লাইটে আসা ১৮ কেজি ওজন স্বর্ণের আরো একটি চালান ধরা পড়ে। এ ঘটনায়ও কাউকে আটক করা যায়নি।
শাহজালালে স্মরণকালের আলোচিত ও সবচেয়ে বড় স্বর্ণ চোরাচালান ধরা পড়ে ২৪ জুলাই নেপাল থেকে আসা একটি ফ্লাইটে। বিমানের কার্গো হোলের ভেতরে ১৫টি কাপড়ের ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় ৫৪ কোটি টাকা মূল্যের ১২৪ কেজি ২২১ গ্রাম ওজনের ১০৬৫টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) এমএ মোমিনকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে তদন্ত মাঝপথেই থেমে যায়।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ সময়ই বিমানবন্দরের ‘প্যানেল বক্স’ এরিয়ায় স্বর্ণ ধরা পড়ে। তবে এই এরিয়ায় বিমানের পাইলট ও সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কেউ যেতে পারে না। এছাড়া টয়লেটে যেসব বড় চালান ধরা পড়ে তা বিমানের নিজস্ব লোকজন ছাড়া সম্ভব নয়।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, যাত্রীরা বিমান থেকে নেমে ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ পার হয়ে আসেন এপ্রোন এরিয়ায়। সেখান থেকে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে বোর্ডিং এরিয়া পার হয়ে কনভেয়ার বেল্টে এসে তাদের লাগেজ স্ক্যানিং করা হয়। যাত্রী ছাড়াও উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, কর্মচারীদেরও স্ক্যানারের সম্মুখীন হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা অনেক সময় স্ক্যানিং মেশিনে পরিচিত যাত্রীদের ব্যাগ, লাগেজ ও শরীর স্ক্যানিং করতে দেন না। শুধু তাই নয়, নিরাপত্তা কর্মীরা কারো লাগেজ, ব্যাগ ও শরীর চেক করতে চাইলে তারা তা সার্চ না করেই ফেরত দেন। আর এভাবেই চোরাকারবারিরা সহজেই স্বর্ণ বহন করে কাস্টমের ঝামেলা এড়িয়ে গ্রিন চ্যানেল ও কনকোর্স হল পেরিয়ে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) এক কর্মকর্তা জানান, বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকাতে এপিবিএন সব সময় সজাগ। এ ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। তবে বেশিরভাগ সময় সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতার অভাবেই চালান আটক করা গেলেও জড়িতদের ধরা যায় না। তবে আইনগত বিধি-নিষেধ ও মামলা করা নিয়ে জটিলতার জন্যই এ বিষয়ে আমরা তদন্ত করতে পারি না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুজ্জামান বলেন, আইন অনুযায়ী বিমানবন্দরে ১০ লাখ টাকার ওপরে মালামাল উদ্ধার হলে বিমানবন্দর থানায় মামলা হওয়ার কথা। কিন্তু কাস্টম কর্তৃপক্ষ বরাবরই বিভাগীয় মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ওয়াজেদ আলী বলেন, চালানের সঙ্গে মালিক না পাওয়ায় বিমানবন্দর থানায় মামলা দেয়া হয় না। তবে মালিক পাওয়া গেলে থানায় মামলা করা যায়।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here